ইত্তেফাক ও নারায়ণগঞ্জ

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৩, ২১:২৬
দৈনিক ইত্তেফাক এ দেশের সংবাদপত্র জগতের এক অবিস্মরণীয় নাম। জন্মলগ্ন থেকেই ইত্তেফাক (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) এর সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলে আসছে। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচনসহ প্রতিটি সংগ্রামে ইত্তেফাক এদেশের সাধারণ মানুষের পাশে ছিল। ইত্তেফাক জাতীয় প্রয়োজনে সব সময়ই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সামরিক শাসনের অবসানে ও গণমানুষের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। ষাটের দশকে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মুসাফির নামে “রাজনৈতিক মঞ্চ” এবং আহমেদুর রহমানের ভীমরুল নামে “মিঠেকড়া” উপসম্পাদকীয় বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। দৈনিক ইত্তেফাকের সাথে নারায়ণগঞ্জবাসীর সম্পর্ক দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি, সামাজিক উন্নয়ন, নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রতিটা আন্দোলন ও সংগ্রামসহ প্রতিটা দাবি আদায়ের সংবাদ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দৈনিক ইত্তেফাকে ছাপা হত। নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে দৈনিক ইত্তেফাক একটি পরিচিত নাম। প্রতিদিন সকালে নারায়ণগঞ্জবাসী দৈনিক ইত্তেফাক হাতে নিত। ১৯৫১ সালে ইত্তেফাক সাপ্তাহিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পরে ১৯৫৩ সাল থেকে দৈনিক হিসাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায়। বর্তমানে পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সুযোগ্য পুত্র জনাব আনোয়ার হোসেন। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠালগ্নে আওয়ামী লীগের মুখপত্র হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। কিন্তু ইত্তেফাকের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ও গণমানুষের মনের কথা লিখার কারণে ইত্তেফাক ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠে এ দেশের গণমানুষের পত্রিকা। তত্কালীন সময়ে ইত্তেফাক আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সংবাদ ফলাও করে প্রচার করতো। এ কারণে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীরা নিয়মিত ইত্তেফাক পাঠ করতো, অন্যকে পাঠ করতে বলতো। সংগঠনের নেতাকর্মীরা ইত্তেফাকের পাঠকসংখ্যা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পঞ্চাশের দশকেই ইত্তেফাকের নাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ষাটের দশকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসন থেকে মুক্ত করতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। দৈনিক ইত্তেফাক আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সকল সভা-সমাবেশ ও মিছিলের সংবাদ গুরুত্ব সহকারে যথাযথভাবে দৈনিক ইত্তেফাকে ছাপিয়ে জনগণের মাঝে প্রচার করে। আন্দোলন-সংগ্রামের ক্ষেত্রে ঢাকার পরেই ছিল নারায়ণগঞ্জের অবস্থান। আওয়ামী লীগের জন্মস্থানও এই নারায়ণগঞ্জেই। ষাটের দশকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের খবরাখবর ইত্তেফাককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হতো, ঐ সংবাদ পাঠ করে নারায়ণগঞ্জের জনগণ উদ্বুদ্ধ হতো আন্দোলনে শরীক হওয়ার জন্য।ইত্তেফাকের ছোটদের আসর কচি-কাঁচার মেলা নারায়ণগঞ্জে একটি জনপ্রিয় সংগঠন। এই সংগঠনের মাধ্যমে অনেকে নিজেদের লেখা গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ইত্তেফাকে ছাপানোর সুযোগ পেয়েছেন। আমি ষাটের দশকে মাঝামাঝি সময়ে নারায়ণগঞ্জ শহর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বৃহত্তর ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসাবে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িত ছিলাম। ঐ সকল আন্দোলনের সংবাদসমূহ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করত ইত্তেফাক। আর তখন থেকেই আমি আজ অবধি ইত্তেফাকের একজন নিয়মিত পাঠক। ১৯৬৪ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ উক্ত দাঙ্গা বন্ধের জন্য দাঙ্গাবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে। দাঙ্গা বিরোধী ঐ সকল আন্দোলন-সংগ্রামের খবর ইত্তেফাক গুরুত্ব সহকারে প্রচার করে এবং ইত্তেফাক নিজেও এ ব্যাপারে নিবন্ধ প্রকাশ করে। ১৯৬৬সনে বাংলার জনগণ স্বাধিকার আন্দোলন ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের এক পর্যায় ৬৬ র ৮ই মে চাষাড়া টাউন হল ময়দানে ৬ দফার সমর্থনে এক জনসভায় বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন আহম্মেদ সহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। আর ঐ দিন রাতেই ঢাকা থেকেই গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধুসহ আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা। এই খবরটিও ১৯৬৬ সনের ৯ মে ইত্তেফাক বিশেষ ফলাও করে প্রচার করে আর এর সাথে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বও বেড়ে যায়। ৬ দফার দাবিতে ৬৬’র ৭ই জুন হরতাল পালন করতে যেয়ে পুলিশের গুলিতে আদমজীর পাট শ্রমিক মাইনউদ্দীন, হোসিয়ারী শ্রমিক সামসুল হক, স্কুলছাত্র বাবুল মিয়া, মাঠা বিক্রেতা কালিপদ সেনসহ অনেককেই হত্যা করে। ইত্তেফাক ঐ সংবাদ প্রচার করলে সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পরে। ৬৬ র ৬ দফা আন্দোলনের এক পর্যায়ে ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় তত্কালীন সাময়িক সরকার। ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনের ফলে ইত্তেফাক পুনঃপ্রকাশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয় স্বৈরাচারী সামরিক সরকার নারায়ণগঞ্জে দৈনিক ইত্তেফাকের পরিচিতিলাভ ও পাঠক সৃষ্টিতে অবদান রেখেছেন প্রয়াত জননেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এ. কে. এম সামসুজ্জোহা, সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মোরশেদ ফারুকীসহ তত্কালীন নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ইত্তেফাকের নারায়ণগঞ্জের সংবাদদাতা ও প্রতিনিধি হিসেবে স্মৃতিময় বন্দ্যোপাধ্যায়, হাবিবুর রহমান, গোলাম মোরশেদ ফারুকী, গিয়াসউদ্দিন আহম্মেদ ও বর্তমান সংবাদদাতা হাবিবুর রহমান বাদল বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সংগ্রহ করে তা পত্রিকায় যথাযথ স্থানে ছাপিয়ে পাঠকের মাঝে ইত্তেফাকের সুনাম অক্ষুণ্ন রেখেছেন বলে নারায়ণগঞ্জের পাঠক সমাজ মনে করেন। ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ছিলো নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রতি বিশেষ ভালোবাসার টান। এ কারণে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া প্রায় সময় নারায়ণগঞ্জে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। এবং বন্ধুদের সঙ্গে আলাপচারিতায় পত্রিকার প্রচার সংখ্যার ব্যাপারে অবহিত হতেন। ঐ সময়ে তিনি ছাত্রলীগের বিভিন্ন সভা-সমিতিতে প্রধান অতিথি হয়ে আসতেন। ঐ সকল অনুষ্ঠানে ছবিসহ সংবাদ পরদিন পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হতো। ত্ তাছাড়া বিভিন্ন সভা-সমিতিতে ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক শহীদ সিরাজউদ্দিন হোসেন ও আসফউদ্দৌলা রেজা নারায়ণগঞ্জে অনেক অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসে গঠনমূলক বক্তব্য দিয়ে আয়োজকদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন এবং পরদিন অনুষ্ঠানের ছবি ও সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশ করে পাঠকদের সুনাম অর্জন করেছেন। আর এ ভাবেই ইত্তেফাকের উত্থানে নারায়ণগঞ্জবাসীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। গণমানুষের কথা লেখার কারণে এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ করতে হয়েছে। পত্রিকাটি বন্ধ ছিলো কয়েকবার। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ ইত্তেফাক ভবন ধ্বংসসহ ছাপাখানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর নব উদ্দীপনায় ইত্তেফাকের শুভ যাত্রা শুরু হয় যা অদ্যাবধি সঠিক লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। লেখক : প্রশাসক, জেলা পরিষদ, নারায়ণগঞ্জ