একদিকে প্রকৃতির নির্মমতা, অপরদিকে বেঁচে থাকার সোনালী স্বপ্নের হাতছানি। নদী ভাঙ্গনের করাল গ্রাস থেকে বাঁচার প্রত্যাশায় ধুধু মরুভুমির ন্যায় বালির পথ পেরিয়ে চলে নতুন ঠিকানার আশায়। কিন্তু প্রমত্তা যমুনা সেখানেও হানা দিয়ে এদেরকে করছে সর্বহারা। পাড় ভাঙ্গে- চর ডুবে আর প্রতিনিয়তই অভাব আর সীমাহীন দারিদ্রতার কবলে ক্ষুধা’র হাহাকার আর নানা রোগ-শোকে জীবনকে দূর্বিসহ করলেও, তবুও থেমে থাকে না এদের জীবন। প্রতিনিয়ত ভাঙ্গন-প্লাবন এবং জীবন সংগ্রামের সাথে অবিরত সংগ্রামরত যমুনা চরের নারীরা জীবনের কাছে হার মানতে নারাজ।
প্রবল ভাঙ্গন, ভুমিক্ষয়, বার বার বন্যা, ঝড়, ক্ষুধা-বঞ্চনা আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত উত্তর জনপদের সহস্রাধিক চরাঞ্চলের দশ লক্ষাধিক অসহায় নারীরা প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করছে। বিশেষ করে প্রতি বছর উজানের পাহাড়ী ঢলে যমুনা- ব্রক্ষপুত্র-তিস্তা- ভয়ঙ্করী রুপ ধারন করে। বিস্তীর্ন চরাঞ্চলের হাজার হাজার ঘরবাড়ি, শষ্যক্ষেত বানের পানিতে তলিয়ে যায়। চর ডুবে, পাড় ভাঙ্গে। কর্ম ও আয় রোজগারহীন দরিদ্র ভূমিহীন হাজার হাজার নারী’র জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিশেষ করে প্রতিবছরের আশ্বিন-কার্তিক মাসে চরাঞ্চলে কাজের অভাবে শুরু হয় মঙ্গা। এ সময় না নৌকা চলাচল, না মাছ ধরা, থাকে না কোন ক্ষেতের ফসল অথবা দিনমজুরের কাজ। এ কারনে তখন অকাল লেগে যায়। তখন কাজের সন্ধানে অনেকে শহরে আসে। নিরুপায় অনেকেই ঘরের টিন, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী, বিক্রি করে কিছুদিন সংসার চালায়। ভুমিহীন নিঃস্ব দিন মজুররা কচু-ঘেচু খেয়ে মানবেতর জীবন কাটায়। অনেকে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটায় দীর্ঘদিনের অনাহার ও অপুষ্টিজনিত কারনে রোগাক্রান্ত হয়ে অনেক নারী শিশু ও বয়স্ক লোক অকাল মৃত্যু বরন করে। নদীভাঙ্গনে বারংবার বসতবাড়ী স্থানান্তর এদের এখন নিত্য সঙ্গী। তবুও চরের মায়া ত্যাগ করে অন্যত্র যেতে চায় না । প্রতিদিনের প্রতি ইঞ্চি ভাঙ্গনে নিঃস্ব করছে হাজার হাজার চরবাসীকে। তবুও চরের মাটি কামরে পড়ে আছে এরা।
ভাঙ্গনঃ প্রতি বছরই প্রবল নদী ভাঙ্গনের কবলে উত্তর জনপদের হাজার হাজার পরিবার সম্পুর্ন গৃহহীন হয়ে পড়েছে। শত শত কোটি টাকার সরকারী বেসরকারী স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, বাঁধ, স্লাব, ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আষাঢ়-শ্রাবনেই ভাঙ্গে বেশী। সমপ্রতি পদ্মা, ব্রক্ষপুত্র, যমুনার পরিবর্তিত গতিপথ চর এলাকায় বসবাসকারীদের জন্য এখন মারাত্মক হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে।
একবার কার্তিক-অগ্রাহায়নে অন্যবার চৈত্র-বৈশাখে। তবে চৈত্রের প্রচন্ড সুর্যতাপে বিস্তীর্ন ধু ধু বালু প্রাস্তরের অসহনীয় উত্তাপে এদের জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। বৃষ্টিহীন প্রচন্ড খরতাপে মাটি ফাটে ও রস শুকিয়ে যায়, নদী শুকিয়ে যায়, শারীরিক অসুস্থ্যতা বৃদ্ধি পায় এবং গাছ-পালা ও শস্য ক্ষেত বিবর্ন হয়ে পড়ে।
শৈত্য প্রবাহ ঃ দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত অসহায় দিনমজুর পরিবারগুলোর শীতবস্ত্র ক্রয়েরও সামর্থ্য থাকে না। উনুন ও নাড়ার আগুন জালিয়েও তারা দল বেঁধে তাপ পোহায়। শীতবস্ত্রের অভাবে এরা অসহায় জীবন কাটায়। শৈত্যপ্রবাহে মাঘের শীতে বাঘে কাপে অথচ এদের দিকে কোরো কোন নজর নেই।
ঝুলিঝড়- ঘুর্নি ও বাইকুড়ানীর মত ধুলিঝড় যমুনা চরাঞ্চলের নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য। বিশেষ করে চৈত্র্যের ধুলিঝড় এদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে।
পারিবারিক বঞ্চনাঃ পারিবারিক জীবনে যমুনাচরের নারীদের সামাজিক-পারিবারিক অধিকার বলে কিছু নেই। স্বামী পুরুষরা নিত্য তাদের উপর নিপীড়ন নির্যাতন চালালেও তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনোই উপায় নেই। নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে চরের অনেক নারীই আত্মহননের পথ বেছে নেন।
চিকিত্সা ও স্বাস্থ্যঃ- যমুনাচরের নারীরা রোগে-শোকে আক্রান্ত হলে সুচিকিত্সা পান না বললেই চলে। প্রয়োজনীয় খাদ্য, পুষ্টিহীনতা আর সু-চিকিত্সার অভাবেই চরের নারীরা নানারকম রোগ্য-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। চরের নারীরা যতটুকু দৈহিক পরিশ্রম করে সে তুলনায় তাদের খাবারের প্রাপ্তি খুবই কম। এ অঞ্চলের শতকরা প্রায় পঁচানব্বই ভাগ নারীই পুষ্টিহীনতায় নির্মম শিকার। বেশির ভাগ নারীর স্বাস্থ্য সচেতন নয়। আর্থিক অসঙ্গতির কারণে অনেকেই কবিরাজ বা চিকিত্সকের দ্বারস্থ পর্যন্ত হতে চান না। বিভিন্ন চর ঘুরে দেখা গেছে, অনেক স্থানেই একটি দাতব্য চিকিত্সালয় পর্যন্ত নেই। আর এ কারণেই এখানকার নারীদের চিকিত্সা নিতে হলে আসতে হয় সদর হাসপতালে। তবে নারীদের সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে হয় গর্ভকালীন সময়ে। এসব চরে ঘুরে জানা গেছে, চিকিত্সার অভাবে প্রসবকালীন সময়ে প্রতিবছরই অনেক নারী ও শিশুর অকাল মৃত্যু ঘটে।
