একজন শিরোপাধারী, সাতজন সাবেক এক নম্বরের বিদায়, ইনজুরির কারণে আরো জনা সাতেকের নাম প্রত্যাহার! এছাড়াও বিদায় নিতে হয়েছে ১২ জন বাছাই খেলোয়াড়কে। সবই ঘটলো উইম্বলডনের একই দিনে। গত বুধবার অল ইংল্যান্ড ক্লাবে এ বিপর্যয়গুলোর পর প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সবচাইতে ঘটনাবহুল দিনেই ছিটকে পড়ে টুর্নামেন্টটিকে প্রায় গ্ল্যামার শূন্য করে দেন রজার ফেদেরার ও মারিয়া শারাপোভার মতো ফেভারিটরা। অবশ্য এর মধ্যেও তৃতীয় রাউন্ডে উঠেছেন বৃটিশদের প্রত্যাশা অ্যান্ডি মারে।
ফেদেরারের জন্য দিনের শুরুটাই হয়েছিল অদ্ভুতভাবে। পোশাক পরিচ্ছদ সব ঠিক থাকলেও গোল বাধে তার জুতা নিয়ে। জুতার রং সাদা হলেও নিচে ছিল কমলা রঙের আবরণ! যা কিনা রীতিনীতির ব্যাপারে দারুণ রক্ষণশীল অল ইংল্যান্ড ক্লাবের শতবছরের নিয়ম বিরুদ্ধ। ফলে পুরোপুরি সাদা রঙের নতুন জুতা পরে কোর্টে নামতে হয় ফেদেরারকে।
এরপর রেকর্ড ১৬ বারের গ্র্যান্ড স্ল্যাম চ্যাম্পিয়নটির জন্য দিনের শেষটা ছিল আরো বিস্ময়কর।
কারণ এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোন গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় নেয়ার মতো নজির গড়তে হয় তাকে। তাও আবার র্যাঙ্কিংয়ে ১১৬ নম্বরে থাকা সার্গেই স্টাখেভস্কির কাছে হেরে। ৬-৭(৫-৭), ৭-৬(৭-৫), ৭-৫, ৭-৬(৭-৫) গেমের এই হারের ফলে সুইস এই তারকার টানা ৩৬টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার বিস্ময়কর রেকর্ডেরও পরিসমাপ্তি ঘটলো। ফেদেরার ২০০৩ সালের ২৬ মে ফ্রেঞ্চ ওপেনের দ্বিতীয় রাউন্ডে সর্বশেষ কোন গ্র্যান্ড স্ল্যামের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
রাফায়েল নাদালের পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে একই গ্র্যান্ড স্ল্যামে অষ্টম শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে এবার উইম্বলডনে আসা এই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ম্যাচ শেষে নিজের হতাশা লুকানোর চেষ্টা করেননি মোটেই। সেন্টার কোর্টে দিনের শেষ ম্যাচে এদিনের সবচেয়ে বড় অঘটনের শিকার হওয়ার পর ৩২ বছর বয়সী ফেদেরারের উচ্চারণ, ‘আপনি যেভাবেই বলেন না কেন এটা বিস্ময়কর এবং হতাশাজনক।’ উইম্বলডনের সাতবারের শিরোপাজয়ী এই তারকা এখানেই শেষ মানতে চাইলেন না, ‘আপনাকে সামনে তাকাতেই হবে। তবে এটা নিশ্চিত এটা খুবই কষ্টদায়ক।’
নাদালের প্রথম রাউন্ড থেকে ছিটকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এবারের উইম্বলডনের নক্ষত্রদের পতন শুরু হয়েছিল। ফেদেরারের ব্যাপারটা বাদ দিলে দিনের শুরু আর শেষ মিলিয়ে বুধবার যা ঘটেছে তাতে দিনটি টেনিসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহামারির দিন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ, উইম্বলডনের শত বছরের ইতিহাসে এদিনই ঘটেছে সবচেয়ে বেশি খেলোয়াড়ের নাম প্রত্যাহারের ঘটনা। আগের রেকর্ড (পাঁচজন) ভেঙ্গে এদিন খেলা শুরুর আগে অথবা খেলার মাঝামাঝি নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন মোট সাতজন খেলোয়াড়। এদের মধ্যে আছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভিক্টোরিয়া আজারেঙ্কা, প্রথম রাউন্ডেই নাদালকে হারিয়ে চমকে দেয়া স্টিভ ডেরকিস, পুরুষ এককের ষষ্ঠ এবং দশম বাছাই জো উইলফ্রেড সোঙ্গা এবং মার্টিন চিলিস। আছেন ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ম্যাচে জয়ী জন ইসনারও। প্রায় ১১ ঘন্টার সেই ম্যাচে জিতে টেনিস ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ী করে ফেলা ইসনার এদিন দাঁড়াতে পেরেছেন মাত্র ১৫ মিনিট। এর পর পরই বাম হাঁটুতে চোটের কারণে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন তিনি।
ইনজুরি ছাড়াও একদিনে সাতজন সাবেক এক নম্বরের বিদায়ও প্রতিদিন ঘটে না! অখ্যাত মার্টিন ব্রাউনের কাছে লেটন হিউয়িটের হার দিয়ে এর শুরু। এর পর পরই ইউজিনি বুচার্ডের কাছে সরাসরি ব্যবধানে আনা ইভানোভিচ, পেত্রা চেতকোভাস্কার বিরুদ্ধে ক্যারোলিন ওজনিয়াকি হার আসে প্রায় একই স্টাইলে। কয়েক বছর ধরে দুজনের পারফরম্যান্সের গ্রাফ নিম্নমুখী হওয়ায় তাদের হার হয়তো অঘটন নয়। কিন্তু মিচেলে লার্চার ডি ব্রিটোর বিরুদ্ধে মারিয়া শারাপোভার হারটা অঘটনই। শারাপোভা নিজেকে এক দিক থেকে সৌভাগ্যবান মানতেই পারেন। অন্য অনেকের মতো হারের পাশাপাশি ইনজুরি সমস্যায় পড়তে হয়নি তাকে!
ঘটনাবহুল এই দিনে ঠিক কোন কারণে কোর্ট ফেভারিটরা একের পর এক মুখ থুবড়ে পড়লেন সেটা নিয়ে নিঃসন্দেহ নন স্বয়ং খেলোয়াড়রাই। বহু কষ্টে দ্বিতীয় রাউন্ডের বাধা টপকানো আমেরিকার স্লোয়ান স্টিফেন্স যেমন বললেন, ‘অদ্ভুদ। আমি জানি না এখানে কি চলছে।’ আর টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় বাছাই আজারেঙ্কা বললেন, ‘আমি জানি না কোর্ট নাকি আবহাওয়া; ঠিক কি কারণে এগুলো ঘটছে।’ অন্যদিকে ম্যাচে বেশ কয়েকবারই বড় ধরনের দুর্ঘটনায় মুখোমুখি হওয়া শারাপোভা এর পেছনে দায়ী করলেন হঠাত্ করেই অতিমাত্রায় পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া কোর্টকেই। জন ম্যাকেনরোও উইম্বলডনের সাথে তার ৩৬ বছরের অভিজ্ঞতায় এটিকে অদ্ভুতুড়ে দিন হিসেবে অভিহিত করেন। শেষ পর্যন্ত কারণ যাই হোক না কেন, সবচেয়ে রাজসিক গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্টটা যে এক দিনেই অনেকটা রং হারাল তাতে সন্দেহ নেই ক্রীড়ামোদীদের। তাই দিনটা সম্পর্কে উপযুক্ত মূল্যায়ন করে ক্রোয়েশিয়ান তারকা চিলিস যখন বলেন, ‘টেনিসের জন্য কালো একটা দিন।’
