জাতীয় ইস্যুই প্রাধান্য পাচ্ছে

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৩, ২২:৫২
স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রাধান্য পাচ্ছে জাতীয় ইস্যু। মেয়র প্রার্থীদের প্রচারণা এবং স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোটারদের আলোচনায়ও ঘুরে ফিরে এই বিষয়টিই বারবার উঠে আসছে। জাতীয় ইস্যুর প্রভাবে চাপা পড়ছে স্থানীয় বিষয়গুলো। ১৪ ও ১৮ দল সমর্থিত প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থীর নিজ এলাকায় বৈষম্যও অন্যতম ইস্যু হিসেবে কাজ করছে। এর সঙ্গে নির্বাচনী মাঠের মূল দুই খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত যোগ্যতা, দক্ষতা, অতীত উন্নয়ন ও নানা অনিয়মের তথ্যও ভোটারদের মুখে মুখে। গতকাল বৃহস্পতিবার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে বুঝা গেল, শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে ছাপিয়ে জাতীয় ইস্যুই হবে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক। খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফলাফলের কিছুটা প্রভাব গাজীপুরেও অনুভূত হচ্ছে। তবে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর জেলার পাঁচটি আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়ী হওয়ায় এখানে সামগ্রিক হিসাব-নিকাশ একটু ভিন্ন। তাছাড়া এ সরকারের হাতেই গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠিত হওয়ায় ভোটারদের কাছে বাড়তি আবেদন রয়েছে ক্ষমতাসীনদের। অবশ্য এসব রাজনৈতিক রসায়নের বাইরে এখানে যে বিষয়টি অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে তা হলো, মূল দুই মেয়র প্রার্থীর নিজ ‘এলাকা ইজম’। ১৮ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক মান্নান, বিএনপি নেতারা এবং গাজীপুর শহর ও আশপাশের ভোটারদের কেউ কেউ বলছেন, ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান টঙ্গী পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়র ছিলেন দীর্ঘদিন। যার কারণে টঙ্গীতেই তার কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ ছিল। এর বাইরের এলাকার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা কম। ভোটের হিসাবে এর প্রভাব পড়তে পারে। বিএনপি এই দাবিও করছে যে, প্রতিমন্ত্রী থাকার সুবাদে মান্নান পুরো জেলায় পরিচিত। তবে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা এলাকা ইজমকে তেমন গুরুত্ব দিতে নারাজ। অবশ্য বিষয়টিকে একেবারে গুরুত্ব না দিয়ে উড়িয়ে দেননি আওয়ামী লীগ দলীয় স্থানীয় এমপি জাহিদ আহসান রাসেল। তিনি গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘একথা অস্বীকার করবো না যে, আমাদের প্রার্থীর মূল কর্মকাণ্ড টঙ্গী কেন্দ্রিক ছিল। তবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বেশিরভাগ ভোটার টঙ্গীর। তাছাড়া আজমত উল্লাহ দীর্ঘদিন মেয়র থাকার কারণে পুরো গাজীপুরেই তার কম-বেশি পরিচিতি রয়েছে।’ এদিকে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের এবং বিএনসিহ ১৮ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা টিম ভাগ ও পালা করে নিজেদের জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগ করতে প্রতিদিনই গাজীপুর ছুটছেন। পথসভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে ভোট প্রার্থনা করছেন তারা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের বক্তব্যে বর্তমান সরকারের উন্নয়নচিত্র, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির ইস্যু, বিগত বিএনপি সরকারের অনিয়ম-ব্যর্থতা তুলে ধরার পাশাপাশি ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খানের ব্যক্তিগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। পক্ষান্তরে বিএনপি নেতারা ফলাও করে প্রচার করছেন শেয়ারবাজার, পদ্মা সেতু, হলমার্ক, ডেসটিনি ইস্যুসহ বর্তমান সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা, হেফাজতে ইসলামের ঘটনা, ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এবং ১৮ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নানের ব্যক্তিগত ইমেজ ও প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে এলাকায় উন্নয়নের কথা। তবে সাধারণ ভোটাররা জাতীয় ইস্যুগুলোর সঙ্গে স্থানীয় বিষয়গুলোরও হিসাব কষছেন। বেশিরভাগ ভোটারই কোনো প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে সুনির্দিষ্ট করে মুখ খুলছেন না, নিরবতা পালন করছেন তারা। সবারই অপেক্ষা ৬ জুলাইয়ের জন্য। ঐদিন ভোটেই তারা তাদের বিচারের রায় জানিয়ে দেবেন। বিএনপি সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে অধ্যাপক মান্নানের বিরুদ্ধে হজ্বের টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পাওয়া এবং দীর্ঘদিন এলাকার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগে না থাকার বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসছেন প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ। অন্যদিকে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমকে ভোটের লড়াই থেকে সরে যেতে সরকার বাধ্য করেছে, সর্বত্র এমন অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে বিএনপি। এর সঙ্গে হেফাজতের ঘটনাকেও ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করছেন অধ্যাপক মান্নানের পক্ষের প্রচারকরা। ১৪ দল ও ১৮ দলের নেতা-কর্মীরা কথা বলছেন যার যার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে। তবে সাধারণ ভোটাররা হিসাব-নিকাশ করছেন নিজ বুদ্ধি-বিবেচনায়। গাজীপুর শহরের রাজবাড়ি রোডের আল মদিনা অফসেট প্রেসের মালিক নাসিমুজ্জামান রানা জানান, নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই এটা যেন ‘জাতীয় নির্বাচন’-এর মতো হয়ে উঠেছে। বাস্তবতা হচ্ছে এখানে সরাসরি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের লড়াই শুরু হয়েছে। আরো খোলাসা করে বললে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। রানার ভাষ্য, ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান ও ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এম.এ মান্নান- কারো বিরুদ্ধেই মোটা দাগের কোনো অভিযোগ নেই, দুই জনের ভাবমূর্তিই কম-বেশি ইতিবাচক। তবে ফ্যাক্টর হচ্ছে জাতীয় ইস্যু ও জাতীয় রাজনীতি। স্থানীয় ব্যবসায়ী নাসিমুজ্জামান রানার বক্তব্যের প্রমাণ মেলে ১৪ ও ১৮ দলের প্রচারণায়ও। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে গাজীপুর সদরে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আজমত উল্লাহর নির্বাচনী প্রচারণার সমন্বয় কাজ করছেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদার ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আলম সিদ্দিকী। লিয়াকত সিকদার ইত্তেফাককে বলেন, ‘বলতে দ্বিধা নেই এখানে জাতীয় ইস্যু নিয়েই বেশি কথা হচ্ছে। বিএনপি সরকারের ব্যর্থতার কথা প্রচার করছে। পাল্টা জবাবে আমরাও সরকারের উন্নয়নগুলো ভোটারদের কাছে তুলে ধরছি।’ এর আগে দুপুর ২টার দিকে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আ.স.ম হান্নান শাহ, বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান ও সাবেক এমপি ফজলুল হক মিলন ১৮ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নানের নির্বাচনী প্রচারণার দৈনন্দিন কর্মপরিকল্পনা ঠিক করছেন। এসময় ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে হান্নান শাহ বলেন, ভোটাররা বর্তমান সরকারের গত সাড়ে চার বছরের ব্যর্থতার জবাব দেবে। গত ৫ মে রাজধানীতে হেফাজতের ঘটনাকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এ সরকার গুলি ও জুলুমের যে শাসন কায়েম করেছে, গাজীপুরের মানুষও ব্যালটের মাধ্যমে এর প্রতিবাদ জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।’ আজমত উল্লাহর সমর্থনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে জাহাঙ্গীর আলমের সরে দাঁড়ানো নিয়ে সৃষ্ট ঘটনার কথা এখনও স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোটারদের মাঝে আলোচিত হচ্ছে। তবে দিন যত গড়াচ্ছে ততো এই বিষয়টি গুরুত্বহীন হয়ে উঠছে। বিএনপি নেতা হান্নান শাহ বলেন, উপরে আজমত উল্লাহকে সমর্থন দিলেও জাহাঙ্গীরের কর্মী-সমর্থকদের ভেতরে সরকারের প্রতি ক্ষোভ কাজ করছে। তিনি দাবি করেন, জাহাঙ্গীরের আত্মীয়-স্বজন তাকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছেন ‘জাহাঙ্গীরকে একরকম অপহরণ করে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়েছে।’ তার এই বক্তব্যের জবাবে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদার ইত্তেফাককে বলেন, ‘এই প্রচারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, হাস্যকর ও নোংরামি’। জাহাঙ্গীরের বিষয় ছাড়াও এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) সমর্থন নিয়েও টানাটানি রয়েছে দু’পক্ষের মধ্যে। বিএনপি দাবি করছে, জাপার স্থানীয় নেতা-কর্মীরা মান্নানের জন্য কাজ করছেন। তবে জাহিদ আহসান রাসেল এমপি ইত্তেফাককে জানান, ‘জাপার সমর্থন নিয়ে শুরুতে কিছু সমস্যা ছিল। তবে বুধবার রাতে তিনি স্থানীয় জাপা নেতাদের সঙ্গে বসেছেন, গতরাতেও তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। জাপার নেতা-কর্মীরা এখন আজম উল্লাহর পক্ষেই কাজ করছেন।’