দৈনিক সমকালের ফরিদপুর ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক গৌতম দাস হত্যা মামলার নয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন এ রায় ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে প্রত্যেক আসামিকে পঞ্চাশ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং অনাদায়ে আরো ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয় আদালত। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৮ বছর পর আট আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে বলা হয়, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষিদের মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মুজিব সড়কের সংস্কার কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিভিন্ন তথ্য রিপোর্ট আকারে যৌথ ও এককভাবে এই নির্ভীক সাংবাদিক বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন। এর প্রেক্ষিতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আসামিরা তাকে হত্যা করে। আসামিরা গৌতমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে এটা প্রমাণিত হলেও সুনির্দিষ্টভাবে কে হত্যা করেছে তার সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপিত না হওয়ায় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির পরিবর্তে যাবজ্জীবন দেয়া হল।
গত এক যুগে দেশের কোন সাংবাদিক হত্যা মামলায় এটিই প্রথম রায়। রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, আসিফ ইমরান, আসিফ ইমতিয়াজ বুলু, কাজী মুরাদ, কামরুল ইসলাম আপন, সিদ্দিকুর রহমান মিয়া, রাজিব হোসেন মনা, আসাদ বিন কাদির, আবু তাহের মো. মোস্তফা ওরফে অ্যাপোলো বিশ্বাস ও তামজিদ হোসেন বাবু। এর মধ্যে এক আসামি অ্যাপোলো পলাতক রয়েছেন। মামলার দশ আসামির মধ্যে একজন আগেই মারা গেছেন।
রায় ঘোষণার সময় আদালতে সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আবু সাঈদ খান ও নিহত সাংবাদিকের চাচাতো ভাই বিশ্বরূপ দাস উপস্থিত ছিলেন। রায়ের পর সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, সাংবাদিক গৌতম হত্যার বিচার হয়েছে। আশা করেছিলাম সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে। কিন্তু যাবজ্জীবন দেয়া হলো। শাস্তিটা লঘু হয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবো। আশা করি উচ্চ আদালত আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করবেন। শামসুর রহমান, বালু, মানিক সাহা, মুকুলসহ যে সব সাংবাদিকের হত্যা মামলা বিচারাধীন, সেগুলোরও দ্রুত ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন তিনি।
এক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিক গৌতমের স্ত্রী দিপালী দাস বলেন, ‘আমি এ রায়ে সন্তুষ্ট নই। ওরাতো কিছুদিন পর টাকা দিয়ে জেল থেকে বের হয়ে যাবে। এত বছর অপেক্ষা করেও সুষ্ঠু বিচার পেলাম না। তিনি আরও বলেন, সাংবাদিক হত্যার সুষ্ঠু বিচার না হলে অনেক স্ত্রী বিধবা হবে, অনেক মায়ের কোল খালি হবে। সেই অবস্থা বন্ধ করার জন্য ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে সমকাল কর্তৃপক্ষকে ঊর্ধ্বতন আদালতে আপিল করার অনুরোধ করেন তিনি।
মামলার বাদী সাংবাদিক হাসানউজ্জামান বলেন, সাংবাদিক হত্যার কোন বিচার এ পর্যন্ত হচ্ছিল না, তারপরও একটি বিচার হয়েছে এটা আশার কথা। তবে এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য ঊর্ধ্বতন আদালতে আপিল করবো। ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, এ রায়ে পুরো ফরিদপুরবাসী ও সাংবাদিক সমাজ হতাশ। আমারা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি আশা করি।
উল্লেখ্য, ফরিদপুর শহরের মুজিব সড়কের সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ কাজের অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করায় ২০০৫ সালের ১৭ নভেম্বর ভোরে সমকালের ফরিদপুর ব্যুরো অফিসে ঢুকে ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক গৌতমকে হত্যা করে তত্কালীন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় সমর্থনপুষ্ট সন্ত্রাসীচক্র।
