দূতাবাসে এমআরপি পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৩, ২১:০১
সৌদিতে আসার আগে সরকার আমাকে একটি বৈধ পাসপোর্ট দিয়েছে। সেই পাসপোর্ট পেতেও অনেক বিড়ম্বনা সইতে হয়েছে। সহজে তো আর হাতে আসেনি, পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়ে যাচাই-বাছাই করার পরই পাসপোর্ট তৈরি হয়েছে। তারপর পেশা পরিবর্তনের খেলায় মত্ত হয়ে চারবার আমার পাসপোর্ট বানিয়েছে রিক্রুটিং এজেন্টের বদমাশ কর্মচারীরা। প্রতিবারই আমার কাছ থেকে টাকা কেটেছে। যার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ তারা নিশ্চয়ই আমার ভিসায় উল্লেখিত পেশা সম্পর্কে অবগত ছিল এবং ইচ্ছে করেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে টাকা মারার জন্যে কাজটি করেছিল। উপায়ও ছিল না, কারণ বিদেশে আসাটা নির্ভর করে তাদের ওপরই। একটু নয়-ছয় হলেই ভিসাটা বিক্রি করে দেবে অন্য কারো কাছে। আমার ভিসাটা বিক্রি করে দিয়েছিল প্রায়, যদি না ওপর থেকে ঠেলা না পড়তো। তারপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র, ভ্রমণ বীমা ও সৌদি দূতাবাসের ভিসা অনুমোদন পাওয়ার পরই এই দেশে আসতে পেরেছি। সেই অনুযায়ী এই দেশের সরকার আমাকে কাজের বৈধতা দিয়েছে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ অবধি অবস্থান করার অনুমতি দিয়েছে। আমার সম্পূর্ণ পরিচয় বহন করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত পাসপোর্ট। সেই পাসপোর্ট ছিল হাতে লেখা। তাকে আরো সংক্ষিপ্ত, যুগোপযোগী, সহজতর, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও চালু করা হয়েছে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি)। আক্ষরিক অর্থে যা দ্রুত প্রস্তুত করা সম্ভব এবং হওয়ার কথা। তারপরেও যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনাপূর্বক হস্তান্তর করতে একটু সময় লাগতে পারে। তবে সেটা হতে হবে যৌক্তিক। যেমন দেশে যারা নতুন পাসপোর্ট করতে যায়, তাদের পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়। আবেদনপত্রের সঙ্গে ছবি দিতে হয়, জম্ম-নিবন্ধন লাগে কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমরা যারা বিদেশে আছি, আমাদের তো এত কিছু লাগার কথা নয়। আমরা তো এক্ষেত্রে নিরানব্বই ভাগ এগিয়ে, সকল ভেরিফিকেশনের ঊর্ধ্বে। কারণ আমাদের কাছে সব ধরনের বৈধতা রয়েছে। তথ্য-উপাত্ত সমৃদ্ধ সরকার অনুমোদিত পাসপোর্ট রয়েছে। এমআরপি বানানোর ক্ষেত্রে আমাদের কোনো কিছুই প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। শুধু ইন্টারনেট থেকে ফর্ম নামিয়ে পূরণ করে সদ্যতোলা ছবিসহ পুরানো পাসপোর্ট সংযোগ করে জমা দিলেই চলে, সঙ্গে রেসিডেন্সিয়াল পারমিট প্রমাণের লক্ষ্যে ইকামা সংযোগ করা যেতে পারে। ছবি এবং সিগনেচার স্ক্যান করে বসিয়ে দিলেই হয়, সরাসরি স্ন্যাপ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। দুটোর বিশেষত্ব একই। তবে প্রতারণামুক্ত রাখার জন্যে সশরীরে উপস্থিত থেকে আবেদনপত্র জমা দেওয়ার বিধান থাকতে পারে। যা ইন্ডিয়ান দূতাবাসে করা হয় এবং তারা এক সপ্তাহের মধ্যেই এমআরপি হাতে পেয়ে যায়। বাংলাদেশ দূতাবাসেই যত সব নতুন নতুন পদ্ধতি দেখা যায়, আজগুবি সব উদ্ভট যুক্তি প্রদর্শন করে এবং এদেশে বসবাসরত অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত সহজ-সরল শ্রমজীবী মানুষগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায় করে। জম্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র যদি না দেখাতে পারে তবে তারা ব্যবস্থা করে দেবে বলে চল্লিশ-পঞ্চাশ রিয়াল প্রত্যেক আবেদনকারীর কাছ থেকে আদায় করে নেয়। আবেদনপত্র পূরণ করে দেওয়ার জন্যও দূতাবাসের অভ্যন্তরে দালালরূপী কিছু কর্মচারী রয়েছে, যারা দশ-বিশ রিয়ালের বিনিময়ে পূরণ করে দেয়। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তারা বলে পুরানো পাসপোর্টের তথ্যাবলি চলবে না। তার মানে কী ? তাদের কথায় মনে হয় একজন মানুষের জম্ম তারিখ, স্থায়ী ঠিকানা, বাবা-মায়ের নামধাম প্রতি বছরই পরিবর্তন হয়! অন্যদিকে তাদের কথা না মেনেও উপায় থাকে না। কারণ প্রয়োজনটা আমার। পুরনো পাসপোর্ট রিনিউ কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টের বিপরীতে নতুন পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রে আগে কখনোই রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে যাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল না। প্রত্যেক শহরে মাসে অত্যন্ত একবার অস্থায়ী অফিসের মাধ্যমে আবেদনপত্র দাখিল করা যেতো। রিনিউ পাসপোর্ট এক ঘণ্টার মধ্যেই পাওয়া যেতো, আর নতুন পাসপোর্টের ক্ষেত্রে হয়তো একমাস সময় লাগতো। অর্থাত্ পরের তারিখেই দিয়ে দেয়া হতো। এখন এমআরপি করার জন্য বাধ্যতামূলক রিয়াদে যেতে হয়। এত বড় একটা দেশ, সৌদির এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে বাংলাদেশি নাগরিকের বসবাস নেই। রিয়াদে যাওয়াটাও সময় সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং কারো কারো ক্ষেত্রে হাজারো মাইল পাড়ি দেওয়ার মতো। সেখানে গিয়ে বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়স্বজন কেউ থাকলে তার কাছে ওঠা যায়। অন্যথায় হোটেলে রাত কাটাতে হয়। তারপর আবার গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। সব মিলিয়ে দুই-তিন দিনের ঝক্কি। অথচ পুরো বিষয়টা হাতে লেখা পাসপোর্টের চেয়েও সহজ। চল্লিশ দিন পরে ডেলিভারি দেওয়া হোক তাতে কোনো সমস্যা নেই, তাও আবার রিয়াদ থেকে আনতে হয়। তার মানে একজন ব্যক্তিকে দুই দুইবার রিয়াদ যেতে হচ্ছে। দুইবার করে ছুটি নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে রিয়াদে যাওয়া কি সবার পক্ষে সম্ভব ? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি এইসব ভেবে দেখেছেন? তাছাড়া এখানে জটিলতার কিছুই নেই। তারা আগের মতো যে কোনো শহর থেকেই আবেদনপত্র সংগ্রহ করে নিতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশ থেকে প্রস্তুত হয়ে আসে, সেহেতু পরবর্তী যে কোনো তারিখে তা বিতরণ করা যেতে পারে। অন্যান্য দেশ যদি পারে তবে বাংলাদেশের দূতাবাস কেন অস্থায়ী অফিসের মাধ্যমে আবেদনপত্র নিতে পারবে না? ডিজিটালাইজ পৃথিবীতে বর্তমানে যে কোনো পদ্ধতি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুধু আমাদের দেশে কাজে এত মন্থরতা কেন? নাকি সঠিক শিক্ষা ও দক্ষ কর্মচারীর অভাব ? তাহলে বর্তমান শিক্ষায় শিক্ষিত ডিজিটাল যুগের ছেলেমেয়েদের নিয়োগ দিলেই হয়! বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তিগত বিষয়ে অভিজ্ঞ ছেলেমেয়ের অভাব নেই। শুধু অভাব অভিজ্ঞ কর্মীর, যারা দুর্নীতির আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে দখল করে রেখেছে সিটগুলো। তা না হলে কেন সহজ বিষয়টাকে জটিল আকারে প্রদর্শন করা হয়? দূতাবাস প্রবাসীদের সমস্যার সহজ সমাধান দেওয়ার জন্য গঠিত রয়েছে, জটিল করার জন্য নয়। কম্পিউটার ভুল করে, অপারেটর নয়— এই ভুল তথ্যটাই তাদের মাথায় সব সময় ঘুরপাক খায়। যতদিন পর্যন্ত এই ভুল তথ্য তাদের মাথায় থাকবে ততদিন তারা জনগণকে ধোঁকা দিতেই থাকবে। ডিজিটালের দোহাই দিয়ে এই ধরনের প্রতারণা বন্ধ করা উচিত। আশা করি বিষয়টা কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় থাকবে। সৌদিআরব