২০১৩ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে সকল পাঠ্যপুস্তকের নতুন সংস্করণ ছাপা হয়েছে। এর আগে ১৯৯৬ সালে হয়েছিল। বর্তমান সংস্করণ শিক্ষানীতি অনুসরণ করে বিজ্ঞানশিক্ষায় আগ্রহী করার প্রয়াসে পাঠ্যপুস্তক প্রণীত হয়েছে। বিজ্ঞানের ভিত্তি যদি গণিত হয় তবে গণিতের ভিত্তি জ্যামিতি তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কিন্তু একি! গণিত তথা জ্যামিতি থেকে প্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির যে গণিত বই প্রণীত হয়েছে সেগুলোর এমন কোনো পৃষ্ঠা পাওয়া যাবে না যেখানে একাধিক ভুল নাই। কোনো শিক্ষার্থী জ্যামিতির কোনো পাঠ থেকে একাকী পাঠ গ্রহণ করতে পারবে না। এমনকি সাধারণ কোনো শিক্ষকও সহজভাবে কোনো পাঠদান করতে পারবেন না। কোনো গণিতের ছাত্র এই গণিত পুস্তক রচনা করেছেন এটাও ভাবতে পারি না। গণিত পাঠ্যপুস্তকে বাদ দেওয়ার কিছু নমুনা উল্লেখ করা হলো—
১। গণিত, ষষ্ঠ শ্রেণি, উপপাদ্য-১-এ কোনো প্রস্তাবনা নাই। সমান্তরাল সংক্রান্ত আলোচনায় এলোমেলো আলোচনা করা হয়েছে, সমান্তরালের সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি, যেহেতু এখানে সমান্তরালতা বা চতুর্ভুজ সংক্রান্ত কোনো উপপাদ্য নেই তাই এর আলোচনা এখানে যথার্থ নয়। যদিও পূর্বের সংস্করণে ছিল। (পৃষ্ঠা ৯৯), তবে ব্যবহারিক জ্যামিতির ক্ষেত্রে রুলার ও ত্রিকোণের ব্যবহার যথার্থ।
২। গণিত, সপ্তম শ্রেণি, অষ্টম অধ্যায়-এ সমান্তরাল সংক্রান্ত একটি উপপাদ্যকে সমান্তরালের সংজ্ঞা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে (পৃষ্ঠা ১০৯)। ঠিক উপরে সমান্তরালের তিনটি ধর্ম সিদ্ধান্ত হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তৃতীয় লাইনে স্বীকার করা হয়েছে “সমান্তরাল সরলরেখার এই তিনটি ধর্ম আলাদাভাবে প্রমাণ করা যায় না। এদের যে কোনো একটিকে (সমান্তরাল) রেখার সংজ্ঞা হিসাবে বিবেচনা করে বাকি দুইটি ধর্মকে প্রমাণ করা যায়।” এদের কোনোটিই সরল রেখা বা সমান্তরাল রেখার সংজ্ঞা হতে পারে না। সমান্তরালের সংজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে ১০৯ পৃষ্ঠার শেষ দিকে। সংজ্ঞা: দুইটি সরলরেখার একটি ছেদক দ্বারা উত্পন্ন ও অনুরূপ কোণ জোড়া সমান হলে রেখাদ্বয় সমান্তরাল। এটি আগের সংস্করণের ৫(খ) উপপাদ্য। মনে রাখা দরকার এটি মৌলিক উপপাদ্য এবং অনুরূপ কোণেরও সংজ্ঞা আছে। সমান্তরালের সংজ্ঞা: কোণ (বক্র বা সম) তলে সর্বদা সমান দূরত্বের দুইটি রেখা (সরল বা বক্র) কে সমান্তরাল বা সমান্তরাল রেখা বলে। যা সর্বজন জ্ঞাত ও স্বীকৃত।
সমান্তরাল সংক্রান্ত প্রথম উপপাদ্যটির প্রমাণ প্রচলিত ইংরেজি বা বাংলা এমনকি ইউক্লিড-এও নেই সত্য যা ছিল তা একটি ইউক্লিডীয় স্বতঃসিদ্ধ (একটি সরলরেখার বহিস্থ কোনো বিন্দু দিয়ে কেবল একটি সরলরেখা আঁকা যায়।) এর প্রমাণ। তা সত্ত্বেও বর্তমান ধারণার থেকে উত্তম। কিন্তু আমি দীর্ঘ সাধনায় এটি প্রমাণ করেছি এবং এর প্রমাণ এনসিটিবি ও বাংলাদেশ গণিত সমিতিতে ২০১১ সালে পেশ করা হয়েছে।
গণিত, সপ্তম শ্রেণি, ১১০ পৃষ্ঠায় ১ম বক্সে বর্ণিত কাজ ১। প্রমাণ কর যে, দুইটি সমান্তরাল সরলরেখার একটি ছেদক দ্বারা উত্পন্ন ছেদকের এই পাশের অন্তস্থ কোণদ্বয় পরস্পর সমান। এটি সকল ক্ষেত্রে (ছেদক লম্ব না হলে) কেউ কখনো প্রমাণ করতে পারবেন না। ৩। দশম অধ্যায়ে বর্ণিত উপপাদ্য ১ ও উপপাদ্য ২ ছাড়া নবম অধ্যায়ের উপপাদ্য ১ প্রমাণ করা সম্ভব না। অর্থাত্ বিষয় বিন্যাস সঠিক হয়নি। দশম অধ্যায়ে বর্ণিত সর্বসমতা ও সদৃশতা নবম অধ্যায়ে এবং নবম অধ্যায়ের বর্ণিত ত্রিভুজ দশম অধ্যায় বর্ণিত হলে যথার্থ হতো। ৪। গণিত, শ্রেণি-অষ্টম, অষ্টম অধ্যায়ে আগের সংস্করণের ৫টি উপপাদ্য (দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৮, ১৯ এবং তৃতীয় অধ্যায়ের ২০, ২১ ও ২২) অপসারণ করে ২টি অনুসিদ্ধান্ত ও অনুশীলনী ২-এর কতিপয় অনুসিদ্ধান্ত ও সমস্যাকে উপপাদ্য হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপপাদ্য ও অনুসিদ্ধান্ত কি এক? এটা অসম্ভব হলেও এমনটি ঘটেছে বর্তমান ২০১৩-এর নতুন সংস্করণে । অপসারিত ঐ উপপাদ্যগুলো ছাড়া গণিত, নবম-দশম শ্রেণির চতুর্দশ অধ্যায়ের উপপাদ্যগুলো এবং উচ্চতর গণিত, নবম-দশম শ্রেণি, তৃতীয় অধ্যায়ের উপপাদ্যগুলো প্রমাণ করা অসম্ভব।
যে কোনো বিষয় শিক্ষার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা আছে, গণিত -এ আরো বেশি ধারাবাহিকতা মেনে চলতে হয়, মনে রাখা দরকার যে কেবল মুখস্থ করে কেউ গণিত শিখতে পারে না। কারিকুলামে (Subject and Topics) বিষয়ের ও বিষয়বস্তুর উপস্থাপনের ধারাবাহিকতার নির্দেশনা থাকে। আমরা সবাই জানি, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে গ্রিক পণ্ডিত ইউক্লিড জ্যামিতির ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সূত্রগুলো (উপপাদ্য) বিধিবদ্ধভাবে সুবিন্যস্ত করে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইলিমেন্টস’ রচনা করেন। তাঁর এই তেরো খণ্ডের ইলিমেন্টস গ্রন্থই আধুনিক জ্যামিতি তথা গণিতের ভিত্তিস্বরূপ। অথচ গণিত, অষ্টম শ্রেণি, নবম অধ্যায় পিথাগোরাসের উপপাদ্য যে সকল (শ’খানেক) প্রমাণ আছে তার মধ্যে ইউক্লিডীয় প্রমাণটিই বাস্তবসম্মত এবং ব্যবহারিক দিক দিয়ে তা যথার্থ। অথচ তাঁর এই প্রমাণটি অপসারণ করা হয়েছে, এতে আমাদের দীনতা বেড়েছে বৈ গৌরব বাড়েনি। দুইটি সমকোণী ত্রিভুজ অর্থাত্ ট্রাপিজিয়াম পদ্ধতি রাখা হয়েছে, যেখানে প্রদত্ত সমকোণী ত্রিভুজটি সমদ্বিবাহু হলে বর্ধিত রূপটি আর ট্রাপিজিয়াম হয় না সেটি যখন আয়ত তখন কি আর ট্রাপিজিয়াম? আরো দুটি পদ্ধতি সংযোজন করা হয়েছে। সদৃশকোণী ত্রিভুজের অনুপাত পদ্ধতি সংযোজন করা হয়েছে, তবে পূর্বে এর সম্পর্কে সদৃশতা সম্পর্কে আলোচনা থাকলেও কোনো উপপাদ্য বর্ণিত হয়নি, এমনকি তৃতীয় পদ্ধতিটির কোনো যথার্থ অংকন পদ্ধতি বর্ণিত হয়নি। অর্থাত্ অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এটি মুখস্থ ছাড়া কোনো বোধগম্যতার উপায় নেই। ষষ্ঠ শ্রেণিতে সদৃশতার আলোচনা ও সপ্তম শ্রেণিতে সদৃশতার উপপাদ্য সংযোজন করা হলে যথার্থ হতো।
ঢাকা
