ঘরে-বাইরে অনাদর অবহেলা

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৩, ২১:২৬
পত্রিকায় চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করতে গিয়ে আবেদনপত্রে লিঙ্গ পরিচয়ের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর নির্ধারিত ঘর ছাড়া অন্য কোনো ঘর না থাকায় আবেদন করতে পারেননি মল্লিকা। এবারই প্রথম নয়, প্রায়ই সে এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে থাকেন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সরকারি, বেসরকারি, আন্তর্জাতিক সংস্থা—সবক্ষেত্রেই এই বৈষম্যের শিকার তিনি। কারণ মল্লিকা একজন হিজড়া। আজকাল অনেক প্রতিষ্ঠানই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নারী ও প্রতিবন্ধীদের আবেদন করতে উত্সাহ প্রদান করে। কিন্তু হিজড়া নামে পরিচিত ট্রান্সজেন্ডার বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা এখনো রক্ষণশীল ভূমিকা বজায় রেখেছে। ফলে কর্মসংস্থানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে নানা অসামাজিক ও অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয় হিজড়ারা। একজন হিজড়া শৈশব অবস্থায় সমস্যাটা ধরতে না পারলেও একটু বড় হতেই বুঝতে পারে সাধারণ মানুষের চেয়ে সে একটু আলাদা। শৈশব থেকে কৈশোরে প্রবেশের সময়টাতেই সমস্যাটা প্রকট হয়ে দেখা দেয়। সমবয়সী ছেলে বা মেয়ের চেয়ে তাদের আচার-ব্যবহার ও চলাফেরা একটু ব্যতিক্রম এবং ধীরে ধীরে শারীরিক পরিবর্তন আরো দৃশ্যমান হয়। স্কুলে সহপাঠীরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, শিক্ষকরাও দেখে ভিন্ন দৃষ্টিতে। সহপাঠী এমনকি কখনো কখনো শিক্ষকরাও তার প্রতি বিরূপ আচরণ করেন। ফলে অবধারিতভাবে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় সে। এভাবেই হিজড়া জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ খুব অল্প বয়সে লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ে। বঞ্চনা, অবহেলা আর তীব্র বিদ্রূপের মুখে এক সময় তারা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়। বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের মতো আরো কিছু মানুষের খোঁজ করে এবং এক সময় পেয়েও যায়। অবশেষে ঠাঁই হয় কোনো হিজড়াপল্লীতে। জোট বেঁধে বদ্ধ, অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশে শুরু হয় মানবেতর জীবনযাপন। দেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সম্পর্কে হালনাগাদ পরিসংখ্যান নেই। জাতীয় এইডস ও এসটিডি কর্মসূচির তথ্যানুযায়ী সারাদেশে হিজড়ার সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১৬ হাজারের বেশি নয়। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুসারে এই সংখ্যা ৩০ হাজার থেকে এক লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। শুধু ঢাকা শহরেই হিজড়ার সংখ্যা ১০ হাজারের ওপরে বলে ধারণা করা হয়। আমাদের দেশের মতো হিজড়া জনগোষ্ঠীর বৈষম্যের শিকার পৃথিবীর আর কোথাও নেই। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র-সমাজের সকল ক্ষেত্রেই এই নিদারুণ বৈষম্য বিদ্যমান। পৃথিবীর অনেক দেশেই হিজড়ারা তাদের পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন এবং সমাজের মূলধারা হিসেবেই বিবেচিত হন। কিন্তু আমাদের দেশে হিজড়াদের পরিবারের সদস্যরাও তাদের পরিচয় দিতে চায় না। উত্তরাধিকার বা সম্পত্তির অধিকারে রয়েছে নানা আইনগত প্রতিবন্ধকতা ও বঞ্চনার অসংখ্য কাহিনী। রাষ্ট্রীয়ভাবেও হিজড়ারা অবহেলিত। দেশে সবার জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন হিজড়া জনগোষ্ঠীকে স্পর্শ করতে পারেনি। সরকারের বয়স্কভাতা কার্যক্রমেও নেই বয়স্ক হিজড়ারা। অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মতো তাদের জন্য এখনো পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় হিজড়াদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও পরে তাদের পুরুষ অথবা নারী ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় বঞ্চনার বিষয় হলো, বরাবরের মতো জাতীয় আদমশুমারি ২০১১-এ হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ সদস্যই বাদ পড়েছেন। হিজড়াদের সংগঠন সম্পর্কের নয়া সেতুর সভাপতি জয়া শিকদার বলেন, ‘বর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় হিজড়ারা নানাভাবে বঞ্চনার শিকার। সবচেয়ে বড় বঞ্চনার বিষয় হলো নারী ও পুরুষের বাইরেও আমাদের যে আলাদা অস্তিত্ব থাকতে পারে সেটা স্বীকার না করা। আমরাও তো মানুষ। আমাদেরও মানুষ হিসেবে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।’ অপর্যাপ্ত এবং বিলম্বে হলেও গত অর্থ বছরে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু কর্মসূচি হাতে নেয় সরকার। এর মধ্যে একটি হলো সমাজসেবা অধিদফতরের অধীনে ‘হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন’ কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে হিজড়া শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও কর্মক্ষম হিজড়াদের আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ প্রদান। এরজন্য বরাদ্দ দেয়া হয় মাত্র ৭২ লাখ টাকা। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউসেপ-এর উদ্যোগে ‘ইন্টিগ্রেশন অব ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি ইনটু মেইনস্ট্রিম সোসাইটি’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বরাদ্দের কারণে এসব কর্মসূচিতে খুব অল্প সংখ্যক হিজড়াকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন, ধারাবাহিকতা এবং কার্যকারিতা নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। হিজড়াদের নিয়ে কাজ করছে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, সুস্থ জীবন, বাঁধন হিজড়া সংঘ, লাইট হাউস, দিনের আলো ইত্যাদি বেসরকারি সংগঠন। বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহমেদ বলেন, ‘হিজড়া জনগোষ্ঠী সংখ্যায় খুবই কম হওয়ায় তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা খুব কঠিন কিছু নয়। সরকার হিজড়াদের প্রতি সহানভূতিশীল হলেই এটা সম্ভব। তবে হিজড়াদের সবার আগে প্রয়োজন তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি। কেননা এই স্বীকৃতি না পেলে মানুষ হিসেবেই তাদের স্বীকার করা হয় না।’ তিনি আরো জানান, ভারতে অনেক হিজড়া সংসদ সদস্য পর্যন্ত হয়েছেন। এমনকি ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল দেশ পাকিস্তানেও হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। শুধু শারীরিকভাবে ভিন্নতার কারণে আমাদের সমাজে মানুষ হিসেবে হিজড়াদের সম্মানজনকভাবে জীবনযাপনের অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হলে হিজড়া জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে পারবে। অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় জনমত সৃষ্টিরও তাগিদ দেন তারা।