কাল বৈশাখীর ঝড়ঝঞ্ঝা শুরুর পর থেকে এ বছরও দেশে বজ্রপাতে মানুষ হতাহতের ঘটনা ঘটে চলেছে। বজ্রপাতের হাত থেকে বাঁচার কৌশল সম্পর্কে গণসচেনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মৃত্যুর হার কমানো যেতে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদগণ। তবে এ ব্যাপারে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোন উদ্যোগ এখন পর্যন্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আবহাওয়াবিদদের মতে, সারা দেশে বছরে ঠিক কতজন মানুষ বজ্রপাতে মারা যায়, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। আবহাওয়া অফিসেও বজ্রপাতে মৃত্যুর তথ্য থাকে না। শুধুমাত্র মিডিয়াতে প্রচারিত তথ্য থেকে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর খবর জানা যায়।
আবহাওয়াবিদদের কাছ থেকে জানা যায়, মৌসুমী বায়ু প্রবেশের আগে বাংলাদেশে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে থাকে। কাল বৈশাখীর ঝড় বৃষ্টির সময়ে বেশি বজ্রপাত হয়। সাধারণত মার্চ থেকে শুরু হয়ে মে পর্যন্ত কাল বৈশাখীর ঝড় আঘাত হেনে থাকে। তবে এবার বর্ষাকালেও বজ্রপাতে মানুষ মারা যাচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগে সারাদেশে বজ্রপাতে ২১ জন মারা গেছে। আবহাওয়া বিজ্ঞান অনুযায়ী গ্রীস্মকালে আমাদের দেশে দিনের বেলায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে বাতাস উত্তপ্ত হয়ে উপরে উঠতে থাকে। জলীয় বাষ্পও ঊর্ধ্বাকাশে ধাবিত হতে থাকে। আর মেঘের ভেতর যত বেশি পরিমাণে জলীয় বাষ্প ঢুকবে তত বেশি উলম্ব মেঘের সৃষ্টি হবে। এ সময় ’আপড্রাফ ও ডাউন ড্রাফ’ বাতাস চলতে থাকে। এ থেকে সৃষ্ট মেঘকে বজ্রগর্ভ মেঘ বলা হয়ে থাকে। এ মেঘের উপরের অংশে পজেটিভ এবং নিচের অংশে নেগেটিভ বিদ্যুত্ তৈরি হয়। পজেটিভ ও নেগেটিভ মেঘ থেকে বিদ্যুত্ সঞ্চালন হলে বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। পজেটিভ ও নেগেটিভ মেঘের মিলনে বিদ্যুত্ সঞ্চালনকালে বাতাসের তাপমাত্রা ২০ হাজার ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে ৩০ হাজার ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়ে থাকে। মেঘের ভেতর থাকা অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন গ্যাসের সমপ্রসারণ ঘটে। দুটি গ্যাসের কম্পণে মেঘের গর্জন সৃষ্টি হয়। তারপর পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে বজ । এ প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করেন, আবহাওয়া দপ্তরের সাবেক পরিচালক দেশের বিশিষ্ট আবহাওয়াবিদ ড. সমরেন্দ্র কর্মকার। তার মতে, বজ্রপাতের হাত থেকে বাঁচা খুব কঠিন হলেও আগে থেকে সতর্ক হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেতে পারে।
ড. সমরেন্দ্র বলেন, ঘন কালো ‘বজ গর্ভ’ মেঘের গুরগুর ডাক শুনলেই সাবধান হতে হবে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। পাকা বাড়িতে আশ্রয় নেয়া সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। গাড়ির জানালা বন্ধ করে আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। গাছের নিচে, টেলিফোনের খুঁটি ও বিদ্যুত্ সঞ্চালন লাইনের খাম্বার নিচে দাঁড়ানো মোটেই নিরাপদ নয়। ফাঁকা মাঠের মধ্যে অবস্থান সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। আর পানির সংস্পর্শে মোটেই যাওয়া যাবে না। বজ্রপাতের আওয়াজ শোনার আগেই তা মাটি স্পর্শ করে থাকে। সোজাসুজি মানুষ বা অন্য প্রাণীর গায়ে পড়লে মৃত্যু অবধারিত। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করাও বিপজ্জনক। শুকনো কাঠ দিয়ে ধাক্কা দিতে হবে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত উত্তর, উত্তর পশ্চিম, দক্ষিণ পশ্চিম ও পশ্চিম আকাশে বিদ্যুত্ চমকালে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। এ সময় পূর্ব, উত্তর পূর্ব এবং দক্ষিণ পূর্ব আকাশের বজ্রপাতে মৃত্যুর আশংকা কম থাকে। এ বছর বর্ষাকালে বজ্রপাতের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মৌসুমী বায়ু দেশে প্রবেশের পরও সক্রিয়ভাবে বিস্তার লাভ করতে পারেনি। আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পূবালী ও পশ্চিমী ঝঞ্ঝার মিশ্রণে বজ্র মেঘের সৃষ্টি হচ্ছে। বজ্রপাতের সম্ভাবনা আবহাওয়া বিভাগের রাডারে ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘নাউকাস্টনিং’ পদ্ধতিতে মিডিয়াতে প্রচার করতে হবে। মানুষ তখন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবে। মেঘের গর্জন না থামা পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আবহাওয়াবিদ বলেন, বছরে দু’শতাধিক মানুষ বজ পাতে মারা যায়। কোন কোন বছর এর বেশিও মারা যায় বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, মৌসুমী বায়ু দুর্বল হলে স্থানীয়ভাবে বজ্র মেঘের সৃষ্টি হয়ে বজ্রপাত ঘটায়। আবার মৌসুমী বায়ু বিদায়ের আগে শরত্কালেও বজ্রপাত হয়ে থাকে এবং মানুষ মারা যায়। আবহাওয়াবিদ সানাউল হক বলেন, বজ্রপাতে মৃত্যু হার কমাতে মানুষকে সচেতন করতে পারে একমাত্র মিডিয়া।
