প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, কোন অসাংবিধানিক সরকার নয়, দলীয় সরকারের অধীনেই দেশে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আগামী নির্বাচনে পুনর্বার নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণ যাকে ভোট দেবে, তারাই ক্ষমতায় আসবে। গতকাল জাতীয় সংসদে বাজেটের সমাপনী বক্তৃতায় আগামী নির্বাচনে দেশের জনগণের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস রাখার জন্য বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের পথে একবার পা বাড়াতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে হবে। তাই পৃথিবীর অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশে আগামী জাতীয় নির্বাচনও সেভাবেই হবে। আজ যারা তৃতীয় শক্তির নামে ক্ষমতায় আসতে চায়, তারাই ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার প্রবর্তক। যাদের আশায় বিরোধী দলীয় নেত্রী তত্ত্বাবধায়ক চাইছেন, তারা একবার আসতে পারলে আর ক্ষমতাই ছাড়বে না।
বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল দাবি নাকচ করে দিয়ে তিনি আরো বলেন, কোন অসাংবিধানিক সরকার নয়। বিরোধী দলীয় নেত্রী দেশের জনগণের ওপর আস্থা-বিশ্বাস কেন রাখতে পারছেন না? জনগণের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশন এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন। গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থা না থাকলে একটা দেশ কখনো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে না। আগামী নির্বাচনেও বিজয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জনগণের ভোটে আবার আমরা ক্ষমতায় আসবো, এই বাজেট আমরা বাস্তবায়ন করবো। দেশকে আমরা ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবো।
জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রায় এক ঘন্টা ৫৫ মিনিট বক্তব্য রাখেন। সরকারের গত সাড়ে চার বছরের উন্নয়ন-সাফল্যে, বিরোধী দলের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, হেফাজতের কর্মীদের মৃত্যু নিয়ে অপপ্রচার, পদ্মা সেতু নির্মাণ, হলমার্ক-ডেসনিটি-শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিসহ খালেদা জিয়ার বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। গত সাড়ে চার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া নিজ আসনে বসে থেকে প্রধানমন্ত্রীর পুরো বক্তব্য শুনেন।
বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোন প্রেক্ষাপটে আমরা তত্ত্বাবধায়ক কেন দাবি করেছিলাম? বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় তাদের ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রহসনের নির্বাচন, মাগুরার কারচুপির নির্বাচন, রাজধানীর ঢাকা-১০ আসনে মোসাদ্দেক আলী ফালু নির্বাচন করেছিলেন, যেখানে কোন ভোটার লাগেনি। ভোট ডাকাতি আর ভোটার তালিকায় এক কোটি ৩০ লাখ ভুয়া ভোটার থাকার কারণেই আমরা এ দাবিটি করেছিলাম। তখন শুধু ইউপি নির্বাচনে প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। বিএনপির আমলে নির্বাচনের মডেল ছিল- ‘দশটি হুন্ডা, বিশটা গুন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা।’
তিনি বলেন, এখন দেশে সেই অবস্থা আর নেই। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা হয়েছে। আমরা জনগণের ভোটের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করেছি। মহাজোট সরকারের আমলে ৫ হাজার ৬৫৪টি নির্বাচন হয়েছে, প্রত্যেকটা নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। আমাদের মেয়ররা চার সিটি নির্বাচনে ব্যাপক উন্নয়ন করলেও নির্বাচনে আমাদের প্রার্থীরা হেরে গেছেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলেই খালেদা জিয়াসহ বিরোধী দলের সদস্যদের বিজয়ী হয়ে খুশীতে এখন বাকবাকুম অবস্থা। তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনে হেরেছি তাতে কোনো দুঃখ নেই, সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে এতেই আমি খুশী। কিন্তু ১১ দিন পর ঘুম থেকে জেগে উঠে বিরোধী দলীয় নেত্রী বললেন নির্বাচন নাকি সুষ্ঠু হয়নি। কারচুপি নির্বাচন উনি আগে থেকেই ভালই বুঝেন। তবে কী উনি (খালেদা জিয়া) কারচুপি করে চার সিটি নির্বাচনে জিতেছেন? তবে কী তিনি চার সিটির নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচন চান?
বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যাদের আশায় আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি করছেন, তারা একবার আসলে আর ক্ষমতা ছাড়বে না। হয়তো নির্বাচনও দেবে না। তাই পৃথিবীর গণতান্ত্রিক অন্যান্য দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশে সেভাবেই আগামী নির্বাচন হবে। মাইনাস টু ফর্মুলার প্রবক্তারা যেন ক্ষমতায় আসতে না পারে, সেজন্য গণতন্ত্রের পথে পা বাড়াতে হবে। দেশের জনগণ নির্বাচনে যাকে ভোট দেবে, তারাই ক্ষমতায় আসবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে বিএনপির নেতা, তাদের স্ত্রী-মেয়েদের পর্যন্ত যখন গ্রেফতার করলো, তখন খালেদা জিয়া কোন প্রতিবাদ করেননি। আমিই প্রথম প্রতিবাদ করেছি। আর প্রতিবাদের কারণেই চার দিনের মাথায় আমাকে টেনেহিঁচড়ে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করা হলো। বিরোধী দলের অনেকে বলেন যে, তারা ক্ষমতায় নেই। তাই তত্ত্বাবধায়ক আসলে তাদের গ্রেফতার করবে না। কিন্তু গত তত্ত্বাবধায়কের আসার আগে আমি ক্ষমতায় ছিলাম না, কিন্তু আমাকেই প্রথম গ্রেফতার করেছিল। বিরোধী দলের পুত্রদের মুচলেকা দিয়ে বিদেশে পাঠিয়েছিল। সেই মুচলেকার কপি প্রদর্শন করে তিনি বলেন, তৃতীয় শক্তি যারা ক্ষমতায় আসতে চায়, তারাই মাইনাস টু ফর্মুলার প্রবর্তক। ব্যারিস্টার মওদুদের প্রতি ইঙ্গিত করে খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনার পাশে যিনি বসে আছেন, তার কিন্তু তালের ঠিক নেই। এর আগেও আপনাকে টা টা দিয়ে এরশাদের কাছে গিয়েছিলো।’
জিএসপি সুবিধা বন্ধ প্রসঙ্গে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্যে অসত্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিএসপি সুবিধা বন্ধ করার জন্য বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়াশিংটন টাইমস’ নামক একটি পত্রিকা নিবন্ধ লিখেছিলেন, যে পত্রিকাটির মালিক একজন ইহুদি। গত ১ ফেব্রুয়ারি সেই পত্রিকায় খালেদা জিয়া শুধু আমার বিরুদ্ধে নয়, গোটা জাতির বিরুদ্ধে আর্টিক্যাল লিখেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে উনি (খালেদা জিয়া) আমার বিরুদ্ধে লিখেছেন ভাল কথা। কারণ ক্ষমতায় থাকতে ২১ আগস্ট ওনার ছেলেকে দিয়ে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দেশের মানুষ কী অপরাধ করেছে? দেশ কী অপরাধ করেছে?
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ওই আর্টিক্যাল লিখে শুধু জিএসপি সুবিধা বন্ধ নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের লোকজনের যাতায়াত বন্ধের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাত্ তিনি বাংলাদেশের সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন আর্টিক্যাল লিখে। এটা তিনি কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারবেন না। কারণ ওই নিবন্ধের নিচে স্পষ্ট ভাষায় লেখা রয়েছে ‘বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া’। তিনি বলেন, একজন বিরোধী দলের নেতা হয়ে নিজের দেশের মানুষের অর্থনীতিতে প্রতিবন্ধকতা, জিএসপি সুবিধা বন্ধ এবং দেশের মানুষের যাতায়াত বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নিবন্ধ লিখতে পারেন, এর থেকে দুঃখ ও লজ্জাজনক আর কী হতে পারে। খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আপনি (খালেদা জিয়া) না লিখলে তবে কে লিখেছে? আপনার নামে লেখা হলো কেন? ইন্টারনেট সার্চ করলেও যে কেউ লেখাটি পেয়ে যাবে। ওই আর্টিকালে তার লেখা বক্তব্য আর আজকে সংসদে দেয়া বক্তব্যের ভাষার মধ্যেও অনেক মিল রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বন্ধ হলো কেন? ৯১-৯৬ পর্যন্ত বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন চিনি জালিয়াতি করার কারণে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বন্ধ করে দিয়েছিল। ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আমরা অস্ত্র ছাড়া সব পণ্যে জিএসপি সুবিধা আদায় করি। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০০৭ সাল থেকে জিএসপি সুবিধা বন্ধ করে দেয়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসছিল। আমরাতো এতোদিন তা ঠেকিয়ে রেখেছিলাম। বিএনপি-জামায়াত আমলে শ্রমিকরা কোন ন্যূনতম মজুরি পর্যন্ত পায়নি। আমরা ক্ষমতায় এসে ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতসহ সবকিছু করেছি। কিন্তু কেন জিএসপি সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত হলো তা দেশবাসী ভাল করেই জানেন।
হেফাজত সম্পর্কে বিরোধী দলীয় নেত্রীর বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামের নামে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ৪ মে বিরোধী দলীয় নেত্রী শাপলা চত্ব্বরে সমাবেশ করলেন। এর আগে আমি তাকে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছি। আলোচনার আহ্বানের জবাবে উনি (খালেদা জিয়া) আমাকে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিলেন। পরদিন হেফাজত নেতারা শান্তিপূর্ণ অবস্থান করে চলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু বিরোধী দলীয় নেত্রী হেফাজতকে অবস্থান নিতে বললেন। হেফাজতের প্রধান আল্লামা শফিকে সমাবেশে আসতে দেয়া হলো না। বললেন, সরকার পতন না হওয়া পর্যন্ত কেউ উঠবে না। দুশ গরু রান্না করে খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতিসহ সবকিছুই দেয়া হলো। তিনি ঢাকাবাসীকে আহ্বান জানালেও কেউই সাড়া দেননি।
তিনি বলেন, এর আগে বায়তুল মোকাররম মসজিদে হামলা, জায়নামাজে আগুন, খতিবকে বয়ান করতে বাধা দেয়া হলো। ছোট ছোট হকার জায়নামাজ, পবিত্র কোরআন শরিফসহ ধর্মীয় গ্রন্থ বিক্রি করতো। সেখানে প্রকাশ্য নির্বিচারে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো, সোনার দোকানে লুট, করাত দিয়ে গাছ কাটা, আইল্যান্ড পর্যন্ত ভেঙ্গে দেয়া হলো। ছোট ছোট কোমলমতি মাদ্রাসার শিশুদের আনা হয়েছিল। আমরা তাদের নিরাপদে নিজ নিজ বাসায় যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি।
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, হেফাজতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে সরকার পতন করতে চেয়েছিল বিএনপি-জামায়াত। সেই আশা পূরণ হয়নি বলেই বিরোধী দলের এতো দুঃখ। এ অভিযানটি সরাসরি প্রচার করা হয়েছে। এ নিয়ে বিরোধী দল তথ্য সন্ত্রাস চালাচ্ছে। শাপলা চত্বরে পুলিশকে হত্যা করেছে, চারটি লাশ সেখানে পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হেফাজতের অভিযানকে বিকৃতভাবে মা-বোনদের কাছে উপস্থাপন করেছে বিরোধী দল। পবিত্র কোরআন শরিফ কারা পুড়িয়েছে ভিডিও ফুটেজে আছে। ক্ষুদ্র দোকানিরাও বলেছে, শিবিররা এ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
বিএনপি-জামায়াত জোটের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে সারাদেশে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগড়ায় পোঁছে গেলে দেশের মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দেবে- এই ভয়ে ক্ষমতায় এসেই তারা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দেয়। আমরা ক্ষমতায় থাকতে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে রেখে এসেছিলাম। পরবর্তীতে ক্ষমতা গ্রহণের সময় পেলাম ৩০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যে ঘাটতি। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোটের পাঁচ বছরে আমরা কী পেয়েছিলাম? আমাকে হত্যার জন্য ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আইভি রহমানসহ ২২ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হলো। আমাদের অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপিকে হত্যা করলো। সারাদেশে ৫শ স্থানে বোমা হামলা বাংলা ভাইসহ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য ছিল তাদের ৫ বছরের শাসনমলে। তাদের আমলে মানুষ শুধু খাম্বা ছাড়া আর কিছুই পায়নি। নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য হাজার হাজার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে হত্যা, নির্যাতন, মা-বোনদের ইজ্জত হরণ করা হয়েছিল। কেউ কোন ব্যবসা করতে পারেনি, হাওয়া ভবনের পাওনা না মিটিয়ে কেউ কিছু করতে পারেনি। গাজীপুরের খোয়াব ভবন নামে বালাখানার কথাও কেউ ভুলেনি।
বিরোধী দলীয় নেত্রীর অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াতের আমলে রিমান্ডের নামে বীভত্স্য নির্যাতনের কথা দেশবাসী ভুলে যায়নি। সাবের হোসেন চৌধুরীকে প্লেট চুরির মামলা দিয়ে নির্যাতন করার কথা কী বিরোধী দলীয় নেত্রী ভুলে গেছেন। ওই ৫ বছরে আওয়ামী লীগের কোন নেতা-কর্মী ঘরে থাকতে পারেনি।
হলমার্ক-ডেসনিটি সম্পর্কে বিরোধী দলীয় নেত্রীর অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর যেসব অর্থনৈতিক খাতে বিশ্ঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, ক্ষমতায় এসেই সেখানে হস্তক্ষেপ করে আমরা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছি। আর এটা করেছি বলেই হলমার্ক-ডেসটিনি ধরা পড়েছে। হলমার্কের মালিক তো হাওয়া ভবনের লোক, জিয়া পরিষদের লোক। উনার লোক ধরা পড়েছেন বলেই তারা এতো হৈ চৈ করছেন। আমরা চোর ধরে যেন চোর বনে গেলাম- উনাদের অবস্থা দেখে সেটাই মনে হচ্ছে। খেলাপী ঋণ সম্পর্কে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে অবাধে ব্যাংক থেকে ঋণ দিয়ে দল গঠন করার জন্যই বাংলাদেশে এই ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি চালু হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকতে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দুই পুত্র, ভাই, ছেলের বন্ধুসহ বড় বড় নেতারা রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংক থেকে খাম্বা, ড্যান্ডি ডায়িংসহ বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠানের নামে ৯৮০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর শোধ করেনি। ব্যাংক থেকে তাদের নেয়া এতো ঋণের টাকা কোথায় গেল? সব গেছে তো ওই শেয়ার বাজারে।
তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যারা অনিয়ম করেছে যেখানেই অনিয়ম হয়েছে, সেখানেই আমরা হস্তক্ষেপ করেছি। জড়িতদের আমরা গ্রেফতার করে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি। আর্থিকখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। হলমার্কের হাওয়া ভবনের লোক হাতেনাতে ধরা পড়ায় বিরোধী দলের মনে এতো দুঃখ লাগলে আমার করার কিছুই নেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসলে এসব অপরাধীরা কোনদিনই ধরা পড়তো না। ভাঙ্গা স্যুটকেস- ছেঁড়া গেঞ্জী থেকে বিরোধী দলীয় নেত্রী ও তার পুত্রদের এতো বিপুল পরিমাণ সম্পদ কোথা থেকে এলো? খালেদা জিয়ার অতি প্রিয় ফালু-বাদলকে ধরলেও শেয়ারবাজারের সব কেলেঙ্কারির ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
বাজেট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। ঋণের ওপর নির্ভর না করে বিশ্ব দরবারে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোই আমাদের লক্ষ্য। এ লক্ষ্য পূরণে চমত্কার বাজেট প্রণয়নে অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেটি ২৪ বছর জাতির পিতার নেতৃত্বে সংগ্রাম ও যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর গণতন্ত্র তিরোহিত হলো, আসলো সামরিক জান্তার শাসন। এরপর থেকে দেশ আর সামনের দিকে যায়নি, শুধুই পিছিয়েছে।
আমার দেশ সম্পাদক খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে জ্বালানি উপদেষ্টা ছিলেন। এক ফোঁটা বিদ্যুত্ উত্পাদন না করলেও মাহমুদুর রহমান পত্রিকার মালিক হলেন। এই পত্রিকায় কাবা শরিফের গিলাপ পরিবর্তনের ছবি জালিয়াতি করে দেখানো হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিবাদে কাবা শরিফে আলেমদের মানববন্ধন। হাইতিতে ভূমিকম্পে নিহতদের ছবি দেখিয়ে বলা হলো মতিঝিলে নাকি আড়াই হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্সটাউনের আত্মহত্যার লাশের ছবিও দেখানো হলো শাপলা চত্বরের লাশের ছবি হিসেবে। তথ্য সন্ত্রাস কাকে বলে। এসব ছবি দেখিয়ে চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মা-বোনদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। গাজীপুরের নির্বাচনেও তাই করা হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত ধর্মের নামে এসব দুইনম্বরি করেছে।
আমাদের নাস্তিক বলে গালি দেয়া হয়। আমরা নাস্তিক হলে আস্তিক তবে কে? বিএনপির কোন সদস্য আমার দাদা-দাদী সম্পর্কে অসভ্য কথা বলেছিলেন। আমার পূবপুরুষ সবাই বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এদেশে মদ-জুয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন; কিন্তু সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে মদ-জুয়ার লাইসেন্স দেন। বায়তুল মোকাররমের জায়গা বরাদ্দ দেন বঙ্গবন্ধু। বিএনপি-জামায়াত ৫ বছর ক্ষমতায় থেকে ওই মসজিদে একটি ইটও ফেলেনি। অথচ ধর্মের কথা বলে। এবার ক্ষমতায় এসে বায়তুল মোকাররমকে নতুনভাবে সাজিয়েছি। যারা মক্কার গিলাপ পরিবর্তন নিয়ে বিভ্রান্ত ছড়ায় তারা নাস্তিক, নাকি আমরা আস্তিক। তিনি বলেন, হেফাজতকে অরাজনৈতিক দল বলেছে। আমরা কখনো অবমাননা করিনি। আল্লামা শফীকে প্লেনে করে পৌঁছে দিয়েছি। আমরা দেশকে তালেবান বা আফগানিস্তান বানাতে দিতে পারি না। কারা ইসলাম ধর্মের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে তার বিচারের ভার দেশবাসীর উপর।
পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৯৬ সালে জাপানে সফরে গিয়ে পদ্মা ও রূপসা সেতুর ব্যাপারে প্রস্তাব দেই। সেতুর কাজও শুরু হয়। পরে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে তা বন্ধ করে দেয়। এবার আবার উদ্যোগ নেই। ২০০৫ সালে বিএনপির দুর্নীতির কারণে বিশ্ব ব্যাংক যোগাযোগ সেতু ও বিদ্যুত্ খাতে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। ড. ইউনূসের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি একটি ব্যাংকের এমডি পদে থাকবেন কি না, পদ্মা সেতুর অর্থায়নে এমন শর্তের কাছে আমরা মাথানত করিনি। একজনের ব্যাংকের এমডি পদ নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হবে, আমি তা হতে দিতে পারি না।
তিনি বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে যেখানে কোন টাকাই ছাড় দেয়া হয়নি সেখানে দুর্নীতি হয় কীভাবে? দুর্নীতি কোথায় হয়েছে তা দেখাতে বিশ্ব ব্যাংককে আমি চ্যালেঞ্জ করলে পরে তারা অবস্থান বদলিয়ে বললো দুর্নীতি হয়নি, দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছিল। তিনি বলেন, এ প্রকল্প নিয়ে আমার পরিবারকে হেয় করতে অনেক চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু পারেনি। নিজস্ব অর্থায়নে আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। মূল পদ্মা সেতু নির্মাণে আমরা দরপত্রও আহ্বান করে দিয়েছি। নিজস্ব অর্থায়নে একটি সরকার এতবড় একটি প্রকল্প গ্রহণ করায় প্রমাণ হয় আমরা অর্থনীতিকে কত মজবুত রেখেছি। কারোর কাছে মাথানত না করার কারণে হয়তো আমাকে রক্তও দিতে হতে পারে; কিন্তু মরবো তবুও আমার দেশের মানুষের মাথা কোনভাবেই নিচু হতে দেব না।
সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের নেতার দুর্নীতির অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রবাদ আছে- ‘চোরের মায়ের বড় গলা’। দুর্নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই তদন্ত করে ধরিয়ে দিয়েছে যে বিরোধী দলীয় নেত্রীর পুত্ররা কীভাবে দুর্নীতি করেছে। দুর্নীতির অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। এক পুত্রের পাচারকৃত টাকা আমরা বাংলাদেশে ফেরত এনেছি। আরেক পুত্রের পাচারকৃত অর্থও আমরা ফেরত আনবো। বিরোধী দলের নেতারা ভাল করেই জানেন, কারা দুর্নীতি করেছে। মনে রাখতে হবে- অর্থ ও প্রেম লুকিয়ে রাখা যায় না।
তিনি বলেন, দুর্নীতি হলে দেশের এতো উন্নয়ন হতো না। বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও জিডিপি ধরে রেখেছি, বিশ্বের মধ্যে পঞ্চম স্থান অর্জন করেছি। বিদেশি বিনিয়োগে বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। ৯০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। ৫ লাখ মানুষ নিম্ন আয় থেকে মধ্যম আয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের সাড়ে চার বছরের উন্নয়ন ও সাফল্যগুলো তুলে ধরে বলেন, আমরা ২৮ কোটি বই বিনামূল্যে ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে তুলে দিয়েছি। ২৬ হাজার ২শ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেছি। বিদ্যুত্ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার সময় সারাদেশে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার। পাঁচ বছর বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় ছিলো- এক মেগাওয়াট বিদ্যুত্ও কেন উত্পাদন করতে পারেনি? অথচ চাহিদা বেড়েছিল কয়েকগুণ। আমরা ক্ষমতায় এসে বিদ্যুত্ উত্পাদনের ফলেই ৬০ শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুত্ সুবিধা পাচ্ছে। ৩০ লাখ গ্রাহক নতুন বিদ্যুতের সংযোগ পেয়েছে। আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত-শিবির নির্বিচারে বাসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারছে। ট্রেনে পর্যন্ত আগুন দিচ্ছে। হাতিরঝিল প্রকল্প দৃষ্টিনন্দন করেছি। বিএনপি এসে সঙ্কট সৃষ্টি করে, আমরা ক্ষমতায় এসে তার সমাধান করি। তিনি বিদ্যুত্ ও পানি অপচয় না করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যখনই ক্ষমতায় আসি সামরিক বাহিনীর তখনই উন্নয়ন হয়। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর জন্য অনেক কাজ করেছি। সমুদ্রসীমা আমরা অর্জন করেছি। বিএনপি দুইবার ক্ষমতায় ছিল, সমুদ্রসীমা অর্জনে কোন কাজ করেনি। আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের আদালতে যে মামলা চলছে সেখানে বিজয়ী হয়ে সমুদ্রসীমায় আরেকটি বাংলাদেশ আমরা দেশবাসীকে উপহার দেব। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তা অর্জিত হবে না। আমরা সশস্ত্র বাহিনীকে ক্ষমতা দখলের জন্য ব্যবহার করি না, যেভাবে বিরোধী দলীয় নেত্রী সেনাবাহিনীকে ‘জাগো, আসো’ বলে আহ্বান জানান। আমরা তা করি না। আমরা সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছি। আমরা ফেনীতে বিরোধী দলীয় নেত্রীর জন্য ৪৫ একর জায়গা ভারত থেকে আদায় করে এনে দিয়েছি।
বিডিআর বিদ্রোহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিডিআর বিদ্রোহ আমরা দমন করেছি। ১৮ হাজার ২২০ জনের বিচার শেষ হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের দায়ে ৮৫০ জনের বিচার কাজ চলছে। এই বিদ্রোহের বিচার কাজ যখন চলছে, তখন ওই হত্যাকারীর আইনজীবী কারা? বিএনপি ও জামায়াতের আইনজীবীরা হত্যাকারীর পক্ষে দাঁড়িয়ে বিচারকার্যকে বিলম্বিত করছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এই বিদ্রোহের কয়েক ঘণ্টা আগে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে লুকিয়ে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন কেন? কীভাবে জানলেন বিদ্রোহ হবে? কোথায় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন? তিনি বলেন, আমরা ক্ষমতায় আসলে দেশের জন্য পুরস্কার আনি, আর বিএনপি আসলে আনে তিরস্কার। আমরা জঙ্গী-সন্ত্রাস দূর করার দৃঢ় পদক্ষেপে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ আজ প্রশংসিত হচ্ছে। সারাবিশ্ব আজ স্বীকার করছে, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোলমডেল।
সংসদে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের নেত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিরোধী দলকে আমরা ডেপুটি স্পীকার পদ দিতে চেয়েছিলাম; কিন্তু বিরোধী দলীয় নেত্রী ওই সময় কোন নাম প্রস্তাব করেননি। সেজন্যই করা যায়নি। সংসদে যে অশ্লীল বক্তব্য দেয়া হয়েছে, তা ভবিষ্যতে না হয় সেজন্য সবাইকে অনুরোধ জানাবো। যেসব ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তা ভদ্র সমাজে ব্যবহার হতে পারে না। সংসদে নোংরামি ভাষা ব্যবহার হোক সেটা আমরাও চাই না। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার কাজেই যেন সংসদ ব্যবহার হয় সেটাই চাই।
