দলীয় সরকারের নির্বাচনে যাব না :খালেদা জিয়া

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৩, ২৩:১৬
জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া আবারও ঘোষণা দিয়েছেন যে, তার দল কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে না। তিনি বলেন, দেশের মানুষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। কিন্তু সরকার সেই পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ও তখনকার মিত্র জামায়াত-জাতীয় পার্টি যেসব কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের নামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, সেই কারণগুলো এখন আরো প্রকট। মূল সমস্যা হলো আস্থার সংকট। তিনি বলেন, এই সংকট থাকা অবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগ নিজেদের গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক দাবি করলেও বরাবরই তারা সংবিধানবিরোধী হস্তক্ষেপ ও অবৈধ ক্ষমতাকে সমর্থন জানিয়েছে। স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল বিকাল ৩টা ৫৫ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন খালেদা জিয়া। মাঝে আছরের নামাজের জন্য ৩০ মিনিটের বিরতি দেয়া হয়। নামাজের আগে ও পরে মিলিয়ে মোট ১ ঘন্টা ৫০ মিনিট বক্তব্য দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ বক্তৃতায় বিরোধী দলীয় নেতা সামপ্রতিক রানা প্লাজা দুর্ঘটনাসহ পোশাক শিল্পের নানা সংকট, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার ও সেটার সঙ্গে তার নিজের সংশ্লিষ্টতা, হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পরিচালিত অভিযান, গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সরকারের বৈরী আচরণ, গণমাধ্যমের ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা, বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের আচরণ, মানবাধিকার পরিস্থিতি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, প্রশাসনে দলীয়করণ ও বৈষম্য, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক, আগামী নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি এবং সংসদে উত্থাপিত ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে কথা বলেন। বেগম খালেদা জিয়া বক্তব্য শুরু করেন ভাষা আন্দোলন, বিভিন্ন জাতীয় সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি এদেশের বীর জনগণ ও জাতীয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা। ‘শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন’ করে তিনি বলেন, আমাদের জাতিসত্তার বিকাশ ও জাতীয় জাগরণের ক্ষেত্রে ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে তারা গৌরবময় অবদান রেখেছেন। খালেদা জিয়া বলেন, আমরা কাউকে খাটো করে দেখতে চাই না। সকলকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে চাই। প্রত্যেকের সাফল্য ও ব্যর্থতা মূল্যায়নের ভার ছেড়ে দিতে চাই ইতিহাসের ওপর। ‘স্বাধীনতার মহান ঘোষক, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা’ জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, তিনিই এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন, যে গণতন্ত্র ছিল আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের এক পরম লক্ষ্য। একদলীয় বাকশাল শাসন চালু করে সেই গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছিলো। জনগণের মৌলিক অধিকার, বাক-ব্যক্তি-সংবাদমাধ্যম ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছিলো। বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার কারণেই আজ সংসদে আমরা বিরোধীদল হিসাবে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছি। দেশের জনগণকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণ দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে ১৯৯১ সালে আমাদের নির্বাচিত করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। সে কারণে আমরা দেশে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনের সুযোগ পেয়েছিলাম এবং সংসদ হয়ে উঠেছিলো জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। খালেদা জিয়া বলেন, বিভিন্ন প্রতিকূলতা ও বাধা-বিঘ্ন সত্ত্বেও এদেশে সংসদীয় রীতিনীতি অনুশীলনের একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু দু:খজনকভাবে এবারের মতো পরিবেশ আগে কখনো সৃষ্টি হয়নি। এখন এই সংসদে যে ভঙ্গি ও ভাষা ব্যবহার শুরু হয়েছে, তা আমাদের জন্য চরম লজ্জার বিষয়। সরকারি দলের দায়িত্বশীল সদস্যরা, মন্ত্রীবর্গ, এমনকি সংসদ নেতা পর্যন্ত বিরোধীদল ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় যেসব নোংরা ইঙ্গিত করে আসছেন, তাতে রুচিশীল মানুষ মর্মাহত। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের, আমার নিজের ও আমার পরিবারের সদস্য এবং বিরোধীদলের নেতাদের সম্পর্কে যেসব উক্তি করা হয়েছে, তা শোনারও অযোগ্য। এ ধরনের বক্তব্য শুনে আমরা অভ্যস্ত নই। এসব কুিসত বক্তব্যের জবাব দেয়া আমার রুচিবোধ ও পারিবারিক শিক্ষার বিরোধী। সে কারণেই আমরা এবারের এই সংসদ কার্যক্রমে অংশ নিতে বিব্রত ও লজ্জাবোধ করি। আমরা তাদের শুধু একটি কথা বলতে চাই, নীরবতা ও উপেক্ষাই হচ্ছে নোংরামির উত্কৃষ্ট জবাব। জাতীয় সংসদে যে ধরনের ভাষা ব্যবহার হচ্ছে, তাতে রাজনীতিবিদদের নাগরিকরা কী চোখে দেখছেন, নতুন প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে কী শিখছে এবং তরুণ সংসদ সদস্যরা কী ধরনের ভাষায় কথা বলতে উত্সাহিত হচ্ছেন, সেটা আমাদের তলিয়ে দেখা দরকার। আমরা যদি গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে চাই, সংসদীয় রীতিনীতি অক্ষুণ্ন রাখতে চাই, তাহলে এই সংসদের পরিবেশ এতোটা কলুষিত কেন হলো—সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করতেই হবে। কেবল দুইদিকের নবীন সদস্যদের দোষারোপ করে, তাদের ভর্ত্সনা করে এবং শুধু তাদের কথা এক্সপাঞ্জ করে কোনো লাভ হবে না। দেশের পোশাক শিল্প এবং সাম্প্রতিক রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্ট দুর্ঘটনার উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, যাদের শ্রমে-ঘামে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে, তাদের জীবনে এতবড় দুর্যোগ আর কখনো আসেনি। এ ধরনের ধারাবাহিক কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য জিএসপি সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই সমস্যার নিরসন করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা। এ ক্ষেত্রে মালিক, কর্মজীবী, সরকার ও ক্রেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক নিশ্চিত করা। জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষার নামে এই কঠোর সিদ্ধান্ত প্রকৃতপক্ষে তাদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তিনি বলেন, জিএসপি সুবিধা অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হয়ে সরকার এখন বলছে, আমি নাকি চিঠি দিয়ে জিএসপি সুবিধা বন্ধ করেছি। আমার পক্ষে এ ধরনের কোনো চিঠি দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। কেউ কেউ বিদেশি একটি পত্রিকায় আমার নামে প্রচারিত একটি লেখার কথা বলেছেন। আমি এমন কোনো লেখা পাঠাইনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমার যতবার দেখা হয়েছে ততবারই আমি জিএসপি সুবিধা বহাল রাখা এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাককে এই সুবিধার আওতায় আনার সুপারিশ করেছি। আমি আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টসসহ সকল রফতানি পণ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার জন্য আবারও জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, নিজেদের ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের উপর চাপিয়ে লাভ নেই। দেশবাসী জানেন, বাংলাদেশে সাহায্য বন্ধ করার আবেদন জানিয়ে কারা বিদেশে চিঠি লিখেছে। কারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে বিদেশে জাতীয় স্বার্থবিরোধী প্রচারণা চালিয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। কাজেই আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলীর দিকে দুনিয়ার কেউই চোখ বন্ধ করে থাকে না। বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, শাপলা চত্বর থেকে আলেম-ওলামাদের বিতাড়িত করতে গত ৫ মে দিবাগত গভীর রাতে যে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়, তা আমাদের জাতীয় জীবনে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। পুরো ঘটনাটির উদ্দেশ্য, প্রকৃতি ও ক্ষয়ক্ষতি এখনও রহস্যের অন্ধকারে ঢাকা। সরকারের ভূমিকায় জনমনে সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরো ঘনীভূত হয়েছে। আলেম সমাজের তরফ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে যে, আলো নিভিয়ে রাতের অন্ধকারে তাদের উপর বর্বরোচিত গণহত্যা চালানো হয়েছে। তারা অভিযানের যে বিবরণ দিচ্ছেন ও হতাহতের যে সংখ্যা উল্লেখ করছেন, তাতে শিউরে উঠতে হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে সৃষ্ট গভীর বেদনাবোধ নিরসনের কোনো চেষ্টা সরকার করছে না। বরং প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতারা নানা ধরনের উপহাস-পরিহাস ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেই চলেছেন। এর পরিণাম কখনো শুভ হতে পারে না। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে বিভিন্ন ব্লগ ও ওয়েব সাইটে ইসলাম, আল্লাহ ও মহানবী (সা:) সম্পর্কে একশ্রেণীর বিপথগামী লোক কুরুচিপূর্ণ কুত্সা রটনা করে, যা পৃথিবীর কোথাও বরদাশ্ত করা হয় না। কিন্তু এ সরকার সে বিষয়ে কিছুই করেনি। এই ধর্মদ্রোহী ব্লগারদের কেউ কেউ শাহবাগের মঞ্চে নেতৃত্ব দিতে থাকে। এতে মানুষের মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি হয় যে, সরকার ধর্মদ্রোহী ব্লগারদের পক্ষ নিয়েছে। সরকারের সমর্থন ও আস্কারাতেই এই ধর্মদ্রোহীরা মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে আহত করার সুযোগ পাচ্ছে। এই পটভূমিতেই আলেমদের সমন্বয়ে গঠিত হেফাজতে ইসলাম শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরু করে। তাদের শাপলা সমাবেশের দু’দিন আগে গত ৩ মে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, হেফাজতের ১৩ দফা দাবির অনেকগুলো বাস্তবায়ন করা আছে। বাকি দাবিগুলোর মধ্যে যেগুলো যৌক্তিক, সেগুলো নিয়েও আলোচনা হবে। এরপর হঠাত্ করে কী ঘটলো তা আজও রহস্যই হয়ে আছে। কেন সেদিন সরকারি দলের ক্যাডারদের আগে থেকেই জড়ো করা হয়েছিল? শাপলা চত্বরে হেফাজতের মূল সমাবেশ শান্তিপূর্ণ হলেও আশপাশের এলাকায় কেন সংঘর্ষ ও নাশকতামূলক তত্পরতা চলে? কেন সেখানে পবিত্র কোরআন শরীফসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ পোড়ানো হয়? তিনি বলেন, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের পদ-পদবীধারী বেশ কয়েকজনকে এসব সন্ত্রাসী তত্পরতায় নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তাদের হামলার চিত্র বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকেও প্রকাশিত হয়েছে। অথচ ৫ মে বিকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ এক সংবাদ সম্মেলনে ওইসব সন্ত্রাসী তত্পরতার জন্য হেফাজতে ইসলামকেই দায়ী করেন। তিনি তাদেরকে ‘রাজাকার-আলবদরের নতুন প্রজন্ম’ বলে উল্লেখ করে অবিলম্বে ঢাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন। অন্যথায় হেফাজতে ইসলামকে গর্তে ঢুকিয়ে দেয়ার হুমকি দেন তিনি। সৈয়দ আশরাফ বলেন, হেফাজতকে দমন করতে আওয়ামী লীগই যথেষ্ট। এরপর শাপলা চত্বরে অবস্থানরত নিরস্ত্র আলেম-ওলামার উপর গভীর রাতে যৌথবাহিনী দিয়ে অভিযান চালানো হয়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে, সেদিন দেড় লক্ষাধিক গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ বলেছে যে, ওই অভিযানে এ পর্যন্ত ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বিদেশি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও অভিযানে অনেকের হতাহত হবার খবর প্রচার হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভয়াবহ সব ভিডিও চিত্র দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, আহত ও নিহতের সংখ্যা যাই হোক না কেন, এই ঘটনায় সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। কারণ শাপলা চত্বরের অভিযান সরাসরি সম্প্রচারের কারণে সরকার তাত্ক্ষণিকভাবে দুটি টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়। তারা এমন ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে যে, দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো শাপলা অভিযানের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়। ওই অভিযানের পর অনেকেই এখনও ফিরে যাননি। অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। মসজিদ, মাদ্রাসাগুলোতে এক ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। এই ঘটনায় আমাদের জাতীয় জীবনে যে বিরাট ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে তার নিরসন ঘটাতে না পারলে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অথচ দুঃখের বিষয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনও আলেম, ওলামা এবং মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের মামলা দিয়ে অহেতুক হয়রানি করা হচ্ছে। আমরা এই অপরিণামদর্শিতার আশু অবসান চাই। ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক অর্জনের জন্য খালেদা জিয়া অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, দেশে তিনি যেভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন, তা সত্যিই দুঃখজনক। তার মেধা-শ্রমে-ঘামে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকও আজ হুমকির মুখে। সরকার নিয়োজিত কমিশন নোবেল জয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংককে ভেঙে ১৯ টুকরা করার সুপারিশ করেছে। আমরা এতে স্তম্ভিত। গ্রামীণ ব্যাংক ধ্বংসের প্রতিশোধমূলক চক্রান্ত বন্ধের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষ এধরনের হীন কার্যকলাপ মেনে নেবে না। তিনি ড. ইউনূসের সমর্থনে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থানের অঙ্গিকার করে বলেন, জাতির জন্য যারা সম্মান বয়ে আনেন সেই কৃতি সন্তানেরা যেন দেশেও মর্যাদা পান, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। না হলে দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। বিরোধী দলের ওপর সরকারের নিপীড়নের অভিযোগ করে তিনি বলেন, বিএনপির প্রধান কার্যালয়ে যে ধ্বংসলীলা চালানো হয়, যেভাবে দলের সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতাকে আটক করে নিয়ে যায়, তা দেশের ইতিহাসে চরম বর্বরতার এক নজির হয়ে থাকবে। একদিকে মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী দলের নেতাদের বারবার গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি দলের লোকেরা প্রকাশ্যে খুন-সন্ত্রাস করলেও তাদের গ্রেফাতর করা হচ্ছে না। উল্টো দলীয় লোক হওয়ার কারণে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদেরকে পর্যন্ত ক্ষমা করে জেল থেকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। অর্থাত্ বাংলাদেশের আইন এখন আর স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। দেশ থেকে সুশাসন আজ সম্পূর্ণভাবে নির্বাসিত হয়েছে। তিনি বলেন, এ সরকার বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে চায়। আন্তর্জাতিক সংবাদ-মাধ্যমেও এসব নগ্ন হামালার খবর বহুলভাবে প্রচারিত হয়েছে। গত কয়েকমাসে পুলিশের গুলিতে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। সরকারি দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় বিরোধীদলীয় অসংখ্য ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে। কেবল গ্রেফতার ও জেলজুলুমই নয়, গ্রেফতারকৃত বন্দীদের রিমান্ডে নিয়ে অকথ্য ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালান হচ্ছে। খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হচ্ছে। আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে, কোন্ ধরনের দুর্ধর্ষ ফৌজদারি অপরাধীদের বিরুদ্ধে ডাণ্ডাবেড়ির বিধান প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। কিন্তু সরকারি নির্দেশে সমস্ত সভ্যতার সীমা লংঘন করে সম্মানিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে চরমভাবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। নির্যাতন-নিপীড়ন, গুপ্তহত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ, দখল, দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস আজ সারা বাংলাদেশকেই এক উপদ্রুত জনপদে পরিণত করেছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ শাসক দলের সহযোগী সংগঠনগুলো আজ মানুষের সামনে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। দুর্নীতি আজ সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কষাঘাতে মানুষ জর্জরিত। কোথাও শান্তিও স্বস্তি নেই। তাই সুযোগ পেলেই জনসাধারণ তাদের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। সিটি করপোরেশনের চারটি সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে দেয়া গণরায় তারই প্রমাণ। মনে রাখা উচিত ক্ষমতা কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতার ফেরে কেউ যেন এভাবে নিগৃহীত না হন সে দিকে আমাদের সবার যত্নবান হতে হবে। বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকায় জনমনে চরম নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিযেছে। অধিকারের হিসাব অনুযায়ী বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীসহ গত সাড়ে চার বছরে দেশে ৮৭ জন গুমের শিকার হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি। এসব গুমের ঘটনা ৭২-৭৫ সালে রক্ষীবাহিনী ও বিশেষ টিমের হাতে হাজার হাজার দেশপ্রেমিক যুবক ও রাজনৈতিক কর্মীর গুপ্তহত্যার কথাই মনে করিয়ে দেয়। বর্তমান সরকারের আমলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও অব্যাহত গতিতে চলছে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী গত কয়েক বছরে কয়েকশ’ মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশে ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’ নামে একটি বিষয়ের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কোথাও কোন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে পুলিশ কিছু লোকের নাম দিয়ে বাকি হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা লোককে আসামি করে মামলা দায়ের করে। এরপর গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এটা এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফহুইপ জয়নাল আবদিন ফারুককে দৈহিক নির্যাতন করার কারণেই একজন পুলিশ অফিসারকে মেডেল দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই সে কথা বলেছেন। এধরনের ঘটনায় পুলিশ অন্যায় আচরণে উত্সাহী হবে, এটাই স্বাভাবিক। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এখন সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকতা শৃঙ্খলিত। সাংবাদিকদের উপরে সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী গত সাড়ে চার বছরে সারাদেশে সহস্রাধিক সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন ১৬ জন সাংবাদিক। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য আজও উদঘাটিত হয়নি। ‘আমার দেশ’ পত্রিকার ছাপাখানা সিলগালা করে বন্ধ করে দেয়া হয়। পত্রিকাটির কর্মরত সাংবাদিক-কর্মচারীরা অনিশ্চিত জীবন-যাপন করছেন। সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকেও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। সরকারের দমনপীড়ন ও দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বলেই তার উপর এই নির্যাতন। স্কাইপি কেলেঙ্কারি ফাঁস করে দিয়ে বিচারের নামে প্রহসনের চিত্র তুলে ধরার কারণেই পত্রিকাটি সরকারি রোষাণলের শিকার হয়েছে। অথচ এই কেলেঙ্কারির দায় নিয়ে একজন বিচারক আইসিটি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। দেশের জাতীয় দৈনিক সমূহের সম্পাদকবৃন্দ বিবৃতি দিয়ে আমার দেশের পুনঃপ্রকাশ এবং সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবি করেছেন। আমরাও তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করি। দিগন্ত, ইসলামিক টিভি, চ্যানেল ওয়ান পুনরায় চালু করে দেয়া এবং যমুনা টিভি চালুর অনুমতি দেয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহবান জানান। তিনি অভিযোগ করেন, অদৃশ্য হাতে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদ ও টক-শো । টকশো’র আলোচক হিসাবে কারা অংশ নেবে তার তালিকাও সরকারের বিশেষ সংস্থা থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। অনেক জনপ্রিয় আলোচককে কালো তালিকাভূক্ত করা হচ্ছে। তাদেরকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। কেউ কেউ হামলার শিকারও হচ্ছে। টকশোগুলোতে যারা সরকারের সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও তাদের সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন। বলেছেন, তারা নাকি মধ্যরাতের ‘সিধেল চোর’। প্রধানমন্ত্রীর মুখে এ ধরনের উক্তি শোভা পায় না। এই অসহিষ্ণুতা গণতন্ত্রে চলতে পারে না। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই প্রশাসনে যে দলীয়করণ হয়েছে তা নজিরবিহীন। এ পর্যন্ত ১৮৮০ জন সরকারি কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে। শতাধিক ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হবে বলে পত্রিকায় সংবাদ বের হয়েছে। ৫ জনকে ইতিমধ্যে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় প্রশাসনকে একচেটিয়াভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে রাখাই এসবের উদ্দেশ্য। এ পর্যন্ত বিভিন্ন পদে ৮ শতাধিক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এসব অনিয়ম, অবিচার, অন্যায় সবই করা হচ্ছে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে। প্রশাসনে বর্তমানে মেধা, জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা পদোন্নতির মাপকাঠি নয়। একদিকে দলবাজ ও অদক্ষ কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, অপর দিকে মেধাবী, দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হচ্ছে। ফলে প্রশাসন হয়ে পড়েছে অদক্ষ ও অকার্যকর। বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে দলীয় ব্যক্তিদের হাতে। এর ফলে রাষ্ট্র তার নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলেছে এবং সুশাসন চলে গেছে নির্বাসনে। তিনি বলেন, সকল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই। তবে তা হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থে এবং ভারসাম্যপূর্ণ লেনদেনের ভিত্তিতে। সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বেসামরিক বাংলাদেশিদের হত্যা ও নির্যাতন এই সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়; কিন্তু সরকারের দুর্বল ভারত-নীতির কারণে এই সীমান্ত হত্যা এখনো বন্ধ হয়নি। আইন ও সালিস কেন্দ্র জানিয়েছে, কেবল ২০১২ সালে ভারতীয় বিএসএফ-এর হাতে ৩১৯ জন বাংলাদেশি নিহত এবং নির্যাতিত হয়েছেন। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের দাবিদার বর্তমান সরকার এসব নির্মম ঘটনা বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। ভারত সরকার নারায়ণগঞ্জে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ৪৬ একর ভূমিতে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্দেশ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টেন্ডার আহ্বান করেছে। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে বলা হয় যে, বিষয়টি সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকার আদৌ অবহিত ছিল না। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন ইস্যুর আজও কোন ফয়সালা হয়নি। আরো উদ্বেগের বিষয়, তিস্তার পানি নিয়ে ভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক স্থগিত করে দিয়েছে। অথচ অতিসম্প্রতি বাংলাদেশকে করিডর হিসেবে ব্যবহার করে ভারত ১০ হাজার টন চাল ত্রিপুরা রাজ্যে নেয়ার ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়েছে। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে যৌথ সমীক্ষা চালানোর কথা থাকলেও তা হচ্ছে কি না আমরা জানি না। এসব বিষয়ে সরকারের বক্তব্য দেশবাসী জানতে চায়। খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ হতে চললো। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বার্থে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই। আমরা বার বার বলেছি, একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচন হলে সকল দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। দেশের মানুষের দাবিও তাই। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী দেশের ৯০ ভাগ মানুষ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন চায়; কিন্তু সরকার সেই পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ ও তাদের তখনকার সহযোগী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি মিলে যে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল তার প্রমাণ সে সময়কার সংবাদপত্র। তারা যেসব কারণে সেই পরিস্থিতি তৈরি করেছিল সেই কারণগুলো এখন আরো প্রকট হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে ভোলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপ-নির্বাচনে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যেভাবে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে বিএনপি প্রার্থীদের বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছিল সেটি একটি কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত। বর্তমান সরকার ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের অপকর্মকে অজুহাত হিসাবে দেখিয়ে নির্দলীয় সরকারের যৌক্তিকতা পাশ কাটাতে চায়; কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, ওটা ছিলো সম্পূর্ণ অবৈধ একটি অসাংবিধানিক সরকার, কোনক্রমেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না। বরঞ্চ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই অসাংবিধানিক সরকারকে তাদের আন্দোলনের ফসল বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নিজদেরকে গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক দাবি করলেও বরাবরই তারা সংবিধান বিরোধী হস্তক্ষেপকে অভিনন্দন ও সমর্থন জানিয়েছে। তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আজ যে রাজনৈতিক সংকট ঘণীভূত হয়ে উঠেছে তার উত্পত্তি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে। অথচ সুপ্রিমকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ক মামলায় যে ৮ জন এমিকাস কিউরি নিয়োগ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ৭ জনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সুধী সমাজের মতামত আহ্বান কালে এরা সবাই এক বাক্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিধান বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। এই কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দিয়েছিলো; কিন্তু হঠাত্ করেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা একতরফাভাবে এই বিধান সংবিধান থেকে তুলে দেয়। সুতরাং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ইস্যুর নিরসন এই সরকারকেই করতে হবে। আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট, আমরা কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেব না। যুক্তিহীন ও গায়ের জোরের কথায় সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। সংসদে প্রস্তাবিত ২০১২-১৩ অর্থ বছরের বাজেট প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, বিদায়ী অর্থ বছরে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি মোটেই সন্তোষজনক ছিল না। বেসরকারি বিনিয়োগ যে হ্রাস পেয়েছে তার অন্যতম প্রমাণ হলো বেসরকারি খাতে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ হারে ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি— অর্জিত হয়েছে মাত্র ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায়, চালু উদ্যোগ ও নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগ মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। তিনি বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন বাধাগ্রস্ত হবার বড় কারণ হচ্ছে, ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারে ব্যাপক লুটপাট এবং চরম অব্যবস্থাপনা। শেয়ার মার্কেট ধসের কারণে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পথের ভিখারী হয়েছে এবং এদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। খালেদা জিয়া বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে দক্ষ পেশাদার লোকদের পরিবর্তে অনভিজ্ঞ ও দলীয় লোক নিয়োগ দেয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর শৃংখলা ভেঙ্গে পড়েছে এবং দুর্নীতি ও লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ইউনি-পে-টু-ইউ এবং সর্বশেষে বেসিক ব্যাংকে এমন সব মহাদুর্নীতি ধরা পড়েছে, যা আর্থিক খাতের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের ললাটে কলঙ্কতিলক এঁকে দিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক, জাইকা, এডিবি, আইডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশ যেভাবে সম্মানজনক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নজির সৃষ্টি করেছিল সে সব আজ সরকারের অব্যবস্থাপনা, আনাড়িপনা, অযোগ্যতা, পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি, লুটপাট ও অপশাসনের ফলে সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে বসেছে। তিনি বলেন, বাজেট কতটা বাস্তবায়িত হবে এবং জনগণ কতটা সুফল পাবে, সেটা নির্ভর করে সরকারের সততা, যোগ্যতা, দক্ষতা, আন্তরিকতা, শাসন প্রক্রিয়া ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। বর্তমান সরকারের দেয়া আগের পাঁচটি বাজেটে দেশ ও জনগণের কতটা উন্নতি অগ্রগতি হয়েছে তা দেশবাসী তাদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়েই অনুধাবন করতে পারছেন। গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো ভুলভ্রান্তি হলে তা নিরসন করতে হয় আরো বেশি গণতন্ত্র দেয়ার মাধ্যমেই। গণতন্ত্রকে সংকুচিত করে নয়। সহনশীলতা, মুক্তি ও স্বাধীনতাই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। এই তিনটির অভাব হলে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে। গণতন্ত্রের বাহনে সরকার ও বিরোধী দল দুইটি চাকার মতো কাজ করে। এর কোনো একটি বিকল হলে গণতন্ত্র সচল থাকতে পারে না। বিরোধী দল সমালোচনা ও জবাবদিহি করে সরকারকে গণমুখী সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ হিসাবে আমরা কেউই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নই। আমাদের অতীতের সবকিছুই নির্ভুল ও নিখাদ নয়। আমরা যদি কেবল অতীত চর্চা করতে থাকি তাহলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে হলে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের নিরসন আজ সময়ের দাবি। এজন্য গণতন্ত্রকে সংহত করতে হবে। শান্তিপূর্ণ পথে সরকার পরিবর্তনের সর্বসম্মত পন্থা আলোচনার মাধ্যমে নিরুপণ করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় বিভিন্ন মত ও পথের প্রতিভাবান মানুষকে সংশ্লিষ্ট করতে হবে। জাতির সকল অংশের মধ্যকার প্রাণশক্তিকে সমন্বিত করতে পারলেই আমরা আমাদের ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারব। এ জন্য প্রয়োজন বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সমঝোতার এক নতুন সিমফনি সৃষ্টি। আসুন, আমরা প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ এবং অসূয়া পরিত্যাগ করে আমাদের বাংলাদেশকে এক শান্তি ও সমৃদ্ধির নিবাসে পরিণত করি। আমাদের মিলিত অভিযাত্রা হোক একুশ শতকের আলোকিত নতুন দিগন্তে।