যাবার সময় কেউ দেখে না ফেরার সময় গ্রেফতার

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৩, ২৩:১৮
নওগাঁর এনামুল, মাদারীপুরের আব্দুল কুদ্দুস। ভাগ্য বদলের জন্য বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করে আসছিলেন অনেক-দিন থেকে। কিন্তু যাওয়ার মত কোন অবলম্বন পাচ্ছিলেন না। শেষটায় খপ্পরে পড়েন দালালের। বাপ দাদার জমি বিক্রি আর ধার দেনা করে দালালের হাতে প্রত্যেকেই তুলে দিয়েছিলেন তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। তবে টাকা দেয়ার পরও তাদের ভোগান্তির শেষ হয়নি। মাসের পর মাস ঘুরতে হয়েছে দালালের পেছনে। শেষটায় দালাল বিমান বন্দরে নিয়ে ধরিয়ে দেয় পাসপোর্ট ও টিকেট। এরপর সংশ্লিষ্ট এয়ার-লাইন্স থেকে বোডিং কার্ড, ইমিগ্রেশন শেষ করে নির্ধারিত ফ্লাইটে ওঠেন। কিন্তু কোন ধরনের বাধা না পাওয়ায় তারা ধরেই নিয়েছিলেন পাসপোর্ট ভিসা সবই আসল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দেশের এয়ারপোর্টে পৌঁছে ইমিগ্রেশনের মুখোমুখি হয়ে বুঝতে পারেন সব কিছুই জাল। শেষটায় ফিরতে হয় দেশে। কিন্তু এখানেই শেষ হয়। যে বিমান বন্দর থেকে নির্বিঘ্নে বিমানে উঠেছিলেন সেই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণের পরপরই পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। শুধু এনামুল বা কুদ্দুসই নয়। এটা হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের নিত্য দিনের চিত্র। বিমান বন্দর থানা পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিমাসে একশ’ থেকে দেড়শ’ ব্যক্তি জাল পাসপোর্ট , জাল ভিসায় বিদেশ থেকে দেশে ফিরে গ্রেফতারের মুখোমুখি হচ্ছে। অপর দিকে গত এক মাসে হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরে জাল পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে বিদেশ পাচার কালে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে ১৪১ জন। এদের মধ্যে ২৩ জন রোহিঙ্গা। সূত্র জানায়, জাল পাসপোর্ট, গলাকাটা পাসপোর্ট অথবা জাল ভিসায় আদম পাচারের সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। তারাই ইমিগ্রেশন শ্রম ও জনশক্তি কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের ম্যানেজ করে আদম পাচার করে থাকে। এ সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে মাথাপিছু ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। বিমান বন্দর ইমিগ্রেশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, জাল পাসপোর্ট জাল ভিসার ব্যাপারে ইমিগ্রেশন ব্যাপক সতর্ক। তবে অনেক সময় দেখা যায় এক সঙ্গে এক দেড়শ পাসপোর্ট জমা পড়ে। এরমধ্যে দু’একটা ভুল হতে পারে-। তবে বিদেশ থেকে ফেরত আসার ব্যাপারে দালালদের কারসাজী বেশি থাকে। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে সব দেশের সঙ্গে ভিসা পরীক্ষা করার সুযোগ নেই। গ্রেফতার হওয়ার পর বিমান বন্দর থানায় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় এনামুল হকসহ কয়েকজনের সঙ্গে। কথা বলার সময় এনামুল হক তার নিজের কথা বলতে গিয়ে হাউ মাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বলেন, তার গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলার মান্দার থানার শিসউল । গত ২২ জুন তিনিসহ কয়েকজন জর্দানে পৌঁছেন। যাওয়ার সময় বিমান বন্দরে তাদেরকে কোন ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়নি। জর্দানে আম্মান বিমান বন্দরে পৌঁছার পরই সেদেশের ইমিগ্রেশন তাদের আটক করে ফেরত পাঠায়। আর শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন ২৪ জুন। তিনি বলেন, গাউছিয়া হজ এজেন্সীকে দিয়েছিলেন সাড়ে তিন লাখ টাকা। বলা হয়েছিল ক্লিনার পদের চাকরি। মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা। একই সঙ্গে জর্দান থেকে ফেরত এসেছেন মাদারীপুর জেলার জালালপুর গ্রামের কুদ্দুস সরকার (৩৬)। তিন সন্তানের জনক। তিনিও একই এজেন্সীর মাধ্যমে গিয়েছিলেন। তাকেও দিতে হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। আব্দুল কুদ্দুস বলেন, মাদারীপুরে অধিবাসী রাজধানীর বনানী এলাকার আলমগীর খাঁন নামে এক ব্যক্তিকে তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়েছিলেন। আর আলমগীরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তার এলাকার সালাম মুন্সী। তবে টাকা দিয়েছিলেন দুই বছর আগে। আর দুই বছর দালালের পেছনে ঘুরাঘুরির পর শেষটায় গত ২২ জুন বিমান বন্দরে ধরিয়ে দেয় পাসপোর্ট। একই সময় গ্রেফতার হওয়া আব্দুল হান্নান বলেন, তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর। গত ১৪ জুন আমিরাত এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট যোগে দুবাই হয়ে মোজাম্বিকে পৌঁছান। ২৪ জুন মোজাম্বিক ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে দেশে ফেরত পাঠায়। বিমান বন্দর থানার ডিউটি অফিসার সাব-ইন্সপেক্টর শফিকুর রহমান জানান, প্রায় প্রতিদিনই বিদেশ থেকে জালপাসপোর্ট ও জাল ভিসার জন্য ৫ থেকে ৭ জন দেশে ফেরত আসছে। প্রতারণার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশ ঘটনায় দেখা গেছে দালালরা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কারণ দালালদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না।