রাজশাহী জেলা ও মহানগর বিএনপির ঐক্যে ফাটল ধরেছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাদিম মোস্তফা এবং মহানগর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিনুর মধ্যে আবারো শুরু হয়েছে টানাপড়েন। অথচ সদ্য সমাপ্ত রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) নির্বাচনকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে দুই মেরুর প্রধান হিসেবে পরিচিত মিনু-নাদিম দীর্ঘদিনের বিরোধ ভুলে এক কাতারে আসেন। দলীয় প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের মাধ্যমে রাসিকের মেয়র পদটি ছিনিয়ে নেন। এনিয়ে স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের আফসোস, ‘দুই নেতার জোড়া লাগানো সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হলো না।’
দলীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি পবা উপজেলার দারুশা বাজারে স্থানীয় বিএনপির নামে রাসিকের নবনির্বাচিত মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মহানগর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু।
সূত্র মতে, মেয়র বুলবুলের সংবর্ধনার নামে আয়োজিত দারুশার অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মিজানুর রহমান মিনু তার বক্তব্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৩ (পবা ও মোহনপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনকে পরিচয় করিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, সংবর্ধিত মেয়র বুলবুলও তার বক্তব্যে মিলন সম্পর্কে একই কথা বলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন জেলা বিএনপির নেতারা। কারণ সমপ্রতি মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ ও একই পদে জেলা বিএনপিতে যাওয়া বিএনপি নেতা তোফাজ্জল হোসেন তপুও রাজশাহী-৩ আসন থেকে বিএনপির টিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক। একই আসনে বিএনপির টিকেটে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল মনিরও। এছাড়া বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম শরীক জামায়াতে ইসলামীর তিন নেতা যথাক্রমে আতাউর রহমান, ডা. মো. জাহাঙ্গীর ও পবা উপজেলা চেয়ারম্যান মকবুল হোসেন উক্ত আসনে সংসদ নিবাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক বলে জানা গেছে।
এদিকে জেলার বিএনপির নেতারা দাবি করেন, পবার দারুশা বাজারে রাসিক মেয়রকে সংবর্ধনার বিষয়ে রাজশাহী জেলা ও পবা উপজেলা বিএনপি এমনকি সংশ্লিষ্ট হুজরিপাড়া ইউপি বিএনপির নেতা-কর্মীরা কিছুই জানতেন না, তাদের জানানো হয়নি। অনুষ্ঠানের সভাপতি সেলিম রেজা বাচ্চু উপজেলা বিএনপির অনুমোদিত কমিটির কোনো পদে নেই। তিনি আগের উপজেলা কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। ২০১০ সালের কাউন্সিলে শাহজাহান আলীকে সভাপতি ও মফিদুল ইসলাম বাচ্চুকে সাধারণ সম্পাদক করে পুনর্গঠিত উপজেলা বিএনপির কমিটি অনুমোদিত হয়েছে। এদিকে সংশ্লিষ্ট হুজরিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেনও রাসিকের মেয়রকে সংবর্ধনার বিষয়ে কিছু জানতেন না বলে দাবি করেন। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা বিএনপির একজন সহ-সভাপতি বলেন, পবার দারুশার সংবর্ধনার বিষয়টি জানাজানি হলে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে নবনির্বাচিত মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে অনুষ্ঠানে না যেতে অনুরোধ করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা শোনেননি। তিনি আরো বলেন, ‘মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনকে পরিচিত করাতেই বুলবুলকে সংবর্ধনার নামে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কারণ আগামী সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৩ আসনে স্থানীয়সহ বিএনপির কয়েকজন নেতা গণসংযোগ করছেন। দলীয় হাইকমান্ড যাকে মনোনয়ন দেবেন, তিনিই দলীয় টিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। কিন্তু তার আগেই নবনির্বাচিত মেয়রকে নিয়ে মহানগর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু যে খেলা শুরু করেছেন, তা রাজশাহী বিএনপির ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। এতে করে স্থানীয়ভাবে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এর প্রভাব আগামী জাতীয় নির্বাচনে পড়বে।
এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা বিএনপির সভাপতি নাদিম মোস্তফা সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। পবা উপজেলা এমনকি হুজরিপাড়া ইউপির নেতারাও বিষয়টি জানেন না। দারুশা মাঠে স্থানীয় বিএনপি কোনো সংবর্ধনার আয়োজন করেননি। নবনির্বাচিত মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলও বিষয়টি তাকে জানাননি। মতামতের জন্য মহানগর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। নতুন রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওই সংবর্ধনায় আমি জেলা বিএনপির কোনো নেতাকে দেখিনি।’ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে স্থানীয় বিএনপির ঐক্য অটুট থাকবে কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিজেদের মধ্যকার ছোটখাটো সমস্যা নিজেরা বসে ঠিক করে নেব।’
