বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি বলেছেন, ১৯৬০ সালের পর থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে আমার পারিবারিক বাসভবন গুডস হিলে আমি কখনোই স্থায়ীভাবে বসবাস করিনি। ১৯৬৫ সালের শেষ এবং ৬৬ সালের শুরুর দিকে এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময় ছাড়া আমি কখনো গুডস হিলে বাস করিনি। শুধু পারিবারিক অনুষ্ঠানের সময় সেখানে গিয়েছি। এছাড়া চট্টগ্রামের সঙ্গে আমার সামাজিক যোগাযোগের পুরোটাই ১৯৭৪ সালের পর থেকে। ১৯৭৯ সালের পূর্বে চট্টগ্রামের ভোটার তালিকায়ও আমার নাম ছিল না। গতকাল রবিবার বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ নিজের পক্ষে দেয়া সাক্ষ্যে সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এ কথা বলেন।
জবানবন্দিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পূর্ববর্তী সময়ে তার নিজের এবং পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ভূমিকার বিশদ বর্ণনা দেন। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে আসাদকে যখন হত্যা করা হয় তখন তার ১০ ফুট দূরত্বের মধ্যে ছিলাম। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক সমাবেশেও অংশ নিয়েছিলাম। তিনি বলেন, ওই সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে স্বাধীনতার ঘোষণা বলে দাবি করা হয়ে থাকে। যদি তাই হয়, তবে আমি দাবি করতে পারি আমি মুক্তিযুদ্ধের একজন সমর্থক ছিলাম। গতকাল সপ্তম দিনের মতো জবানবন্দি দেয়ার সময় এ বিএনপি নেতাকে অসুস্থ দেখাচ্ছিল। মামলার কার্যক্রম আজ সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। এছাড়া তাকে আজকের মধ্যে জবানবন্দি শেষ করতে বলা হয়েছে।
জবানবন্দির শুরুতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আমি ঢাকায় বাস করতাম। ঢাকায় আমাদের কোন ড্রাইভার না থাকায় আমার বাবা বিভিন্ন স্থানে গেলে আমিই গাড়ি চালাতাম। আমার জানা মতে, আমিই তখন একমাত্র ছাত্র ছিলাম, যে ধানমন্ডিতে একাকি একটি বাড়িতে বাস করতো এবং একটি গাড়ি ছিল। আমার পিতা চট্টগ্রামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। এমএলএ, এমএনএ, মন্ত্রিসভার সদস্য, স্পিকার এবং ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার পিতার কর্মকাণ্ডের স্বাক্ষর আজো চট্টগ্রামে রয়েছে। ১৯৬০ সালে যখন আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম তখন থেকে আমি নিজের মতো করে জীবন-যাপন করতাম। আমার পুরো শিক্ষা জীবনটাই এ রকম ছিল। ১৯৬৫ সালের শেষ এবং ৬৬ সালের শুরুর দিকের চার মাস ছাড়া আমি ১৯৭৪ সালের আগ পর্যন্ত কখনোই গুডস হিলে বসবাস করিনি।
তিনি বলেন, ১৯৬৬ সালের শুরুর দিকে আমার পিতা যখন মুসলীম লীগ থেকে বহিষ্কার হন তখন থেকে ৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি গণপরিষদের একজন স্বতন্ত্র সদস্য ছিলেন। এ সময় তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, যে আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আইয়ুব শাসনের সমাপ্তি হয়। এ সময় সাধারণভাবেই তার যোগাযোগ ছিল মুসলীম লীগের নেতা নন এমন ব্যক্তিদের সাথে। তাদের মধ্যে বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদ, এয়ার ভাইস মার্শাল আসগার খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান, নূরুল আমীন, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী অন্যতম। আর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের সাথে তখন আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। যদিও আমি নিজে কখনো কোন ছাত্র সংগঠনের সদস্য ছিলাম না।
আমার বন্ধুদের সঙ্গে ৬৯ সালে আমি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। সে আন্দোলনের একটি ধানমন্ডি অধ্যায়ও ছিল। তারা প্রায়ই আমার ধানমন্ডির বাসায় আসত। তাদের মধ্যে যাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল তারা হলেন তওহিদ সামাদ, আহমেদ সালমান ফজলুর রহমান (সালমান এফ রহমান), শেখ কামাল, নিজাম আহমেদ, খায়রুল বাশার, ইরফান খান, ইমরান আহমেদ, কাজী আনোয়ার, আব্দুস সামাদ, কাইয়ুম রেজা চৌধুরীসহ আরো অনেকে। সিনিয়রদের মধ্যে আব্দুর রউফ, তোফায়েল আহমেদ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, সিরাজুল আলম খান, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, শাহজাহান সিরাজদের আমন্ত্রণ জানাতাম। আন্দোলনকে বেগবান করতে তারা আমার বাড়িতে মিলিত হতেন। সিনিয়রদের এসব মিটিংয়ে তাদের আপ্যায়ন করাই ছিল আমার কাজ। এসব নেতাদের অনেকে আমার পিতার সঙ্গেও প্রায়ই দেখা করতেন।
তিনি বলেন, ’৭১-এর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক সমাবেশে আমার উপস্থিতির কথা বলতে পারে, এমন বহুসংখ্যক ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তোফায়েল আহমেদ, মনিরুল হক চৌধুরী, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, সালমান এফ রহমান, খায়রুল বাশার, নিজাম আহমেদ, কাইয়ুম রেজা চৌধুরী, ড. বেলাল বাকী, তাওহিদ সামাদসহ আরো অনেকে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ থেকে ২২শে মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর একাধিক বৈঠক হয়। ঐসব বৈঠকের খবর সে সময়কার সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
