গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে স্থানীয় সমস্যাগুলোই। তাদের প্রশ্ন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা তাদের এলাকার সমস্যা দূর করবেন তো? ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের যানজট টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত সার্বক্ষণিক জ্যামের সৃষ্টি করে রাখে। এর প্রভাব আশেপাশের পুরো এলাকাতেই ছড়িয়ে পড়ে। বর্ষাকালে রয়েছে জলাবদ্ধতা। গাজীপুর শহরের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে দেশের প্রধান ট্রেন লাইন। এই ট্রেন যাওয়া আসার কারণে গাজীপুর শহর অনেক সময়ই যানজটের শহর হয়ে থাকে। ভোটারদের প্রশ্ন, নতুন নগরপিতা এসব সমস্যা সমাধানে কি পদক্ষেপ রাখবেন? তাই মেয়র প্রার্থীর মাঝে এইসব কাজ করবার যোগ্যতা রয়েছে কিনা তাই খতিয়ে দেখছেন ভোটাররা। তাই আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বন্দ্বমুখর অবস্থান ছাপিয়ে এ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত দুই জোটের প্রভাবশালী দুই প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণী খেলায় তাই মূল ইস্যু হয়ে উঠেছে গাজীপুরের বিকাশমান সিটি এলাকার যোগাযোগ-যানজট, ক্রমশ বেড়ে ওঠা শহরের অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা।
নির্বাচিত হলে কি উন্নয়ন করবেন প্রত্যেক প্রার্থীকেই ভোটারদের কাছে নিজ নিজ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরতে হচ্ছে। ভোটাররা বলছেন, যিনি নগরীর সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন আমরা তাকেই ভোট দেব। ফলে মেয়র, কাউন্সিলর, সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী, যারা পূর্বে নির্বাচিত ছিলেন, তাদের গণসংযোগ, প্রচার-প্রচারণায় গিয়ে ভোট চাওয়ার সময় ভোটারদের নিকট কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে, আবার নতুন-পুরাতন সকল প্রার্থীই যানজট-জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী ব্রিজ থেকে রাজেন্দ্রপুর পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা, সড়কে দীর্ঘ যানজট। মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস রাস্তার মোড়, বোর্ড বাজার, গাজীপুরা ও টঙ্গীতে যানজট লেগে থাকে। এ মহাসড়ক থেকে সিটি এলাকার ভিতরের গলির অধিকাংশ সড়কের অবস্থা আরো নাজুক। অধিকাংশ সড়কের পাশে পানি নিষ্কাশনের জন্য নেই পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। যেসব ড্রেন রয়েছে সেগুলোরক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর। ফলে একটু বৃষ্টি হলেই পানি উপচে পড়ে রাস্তায়। এই রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যাম লেগে থাকে। ফলে টঙ্গী ব্রিজ থেকে জয়দেবপুর মোড় পেরুতে কখনো কখনো দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লেগে যায়। নগরবাসীর দুর্ভোগ সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়।
উল্লেখ্য, সাতজন মেয়রপ্রার্থী থাকলেও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র এডভোকেট আজমত উল্লাহ খান (দোয়াত কলম) ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. এ মান্নানের (টেলিভিশন) মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে। সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৪৫৫ জন ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
টঙ্গী পৌরসভা গঠনের পর থেকে গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান পৌরসভা বিলুপ্ত হবার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর মেয়র হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকালে তিনি এলাকার অনেক উন্নয়ন করেছেন। তবে নগরবাসীর সবচেয়ে ভোগান্তির কারণ যোগাযোগ ও যানজট এবং জলাবদ্ধতার মত প্রতিদিনের সমস্যা সমাধানে কোন কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যত নেই। ফলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে।
অপরদিকে, বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক এমএ মান্নান ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। এরপরে আর কখনোই নির্বাচনে জয় পাননি তিনি। ফলে এলাকার উন্নতিতে তার অবস্থান কী হবে তা ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে। রিকশাচালক মনসুর মিয়া বললেন, যে প্রার্থী আমাদের কষ্ট বুঝবে, সমস্যার সমাধান করবে, আমি তাকেই ভোট দেব। খারাপ রাস্তায় বৃষ্টির পানি জমলে যানজট তৈরি হলে আমাদের রোজগার কমে যায়। নগরীর ওয়্যারলেস গেটের হোটেল ব্যবসায়ী আব্দুল কাসেম বললেন, বর্ষাকালে নির্বাচন হওয়ায় প্রচারণায় প্রার্থীরা বেশি জোর দিচ্ছেন। বৃষ্টির পর আমার বাড়িতে যেতে কোমর সমান পানি হয়। ফলে প্রার্থীরা বারবার আসছেন আর নির্বাচিত হলে এ দুর্ভোগ থাকবে না বলে আশ্বাস দিচ্ছেন।
