মর্যাদার লড়াইয়ে জিততে শেষ মুহূর্তের দৌড়-ঝাঁপ

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৩, ২২:৪১
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়ে উঠেছে প্রধান দুই প্রার্থী এমনকি প্রধান দুই দলের ‘মর্যাদার লড়াই’। এই লড়াইয়ে জিততে তাই দুই পক্ষই মরিয়া হয়ে উঠেছে। আজ মধ্যরাতেই শেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা। তাই শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় সর্বশক্তি নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মাঠে। জয় ছিনিয়ে আনার অঙ্ক কষছেন যার যার মত করে। লড়াইয়ের ফল দেখার জন্য যেন তর সইছে না গাজীপুর তথা দেশবাসীর। গাজীপুরের নির্বাচন জমে উঠেছে মূলত আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লাহ খান এবং বিএনপি সমর্থিত এম এ মান্নানকে কেন্দ্র করে। নৌকা বা ধানের শীষে ভোট না চাইলেও সত্যিকার অর্থেই এটা আওয়ামী লীগ-বিএনপির মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। দু’দিন বাদে শনিবার নির্বাচন। আর নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী আজ বৃহস্পতিবার রাত বারোটায় বন্ধ হয়ে যাবে প্রচার-প্রচারণা। তাই গতকাল ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন সবাই। আজও থাকবেন। প্রার্থীরা ছুটছেন। তাদের আগে পিছে ছুটছেন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা। গতকাল গাজীপুর মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে দুই মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্রীয় নেতারাও শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় দিনভর ব্যস্ত ছিলেন। মেয়র প্রার্থীরা তো বটেই নির্বাচনী মাঠ গরম করে রেখেছেন কাউন্সিলর প্রার্থীরাও। তাদের নির্বাচনী এলাকা তুলনামূলকভাবে ছোট বলে ঘন ঘন প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন সবাই। কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে নিয়োজিত মাইকগুলো শহরের অলিগলিতে বিরামহীনভাবে বেজে চলেছে। নানা ছন্দে শ্লোগান দিয়ে চলেছে এলাকার শিশু-কিশোররা। শেষ মুহূর্তে ভোট চাইছেন মুহুর্মুহু শ্লোগানের মাধ্যমে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের টার্নিং পয়েন্ট হিসাবেও বিশ্লেষকরা গাজীপুর সিটি নির্বাচনকে বিবেচনা করছেন। যেহেতু এটা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসাবে বিবেচিত, সে কারণে এখানে আওয়ামী লীগের অবস্থান কেমন সেটাই দেখে নিতে চাইছেন তারা। সে কারণেই উভয় দলের লক্ষ্য নির্বাচনে নিজস্ব দলীয় ভোটের বাইরে অন্য ভোট ব্যাংকগুলোকে নিজের পক্ষে টানা। গাজীপুরে ভোট ব্যাংক হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে গার্মেন্টস কর্মী, বিভিন্ন শিল্প-কারখানার শ্রমিক, সংখ্যালঘু ভোট এবং তরুণদের ভোট। এদের মনোযোগ আকর্ষণে সুকৌশলে বিরামহীন তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছেন সবাই। এ প্রচারণায় দুই জোটের কেন্দ্রীয় নেতাদের পদভারে মুখর গাজীপুরের মাটি। গণসংযোগের পাশাপাশি গতকাল শেষ দিনেও দুই প্রার্থীর পক্ষে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা এবং পেশাজীবী ও শ্রমজীবী নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা দলীয় প্রার্থীর জয়ের কৌশল নির্ধারণ করেন। জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকেট আমানত হোসেন খান বলেন, আজমত উল্লাহ খানকে অসংখ্য রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন সমর্থন দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে তরিকত ফেডারেশন, খেদমতে ইসলাম, বেসরকারি শিক্ষক ফেডারেশন, শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট, স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদ, গাজীপুর আইনজীবী সমিতি, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, উপজাতি এসোসিয়েশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, গাজীপুর জেলা সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে আজমত উল্লাহ খানের পক্ষে সমর্থন প্রদান করে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, একতা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনসহ ৪০টি সংগঠনসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন সাংবাদিক সম্মেলন করে আজমত উল্লাহ খানের পক্ষে সমর্থন ও প্রচারনায় অংশ নিচ্ছে। ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী এম. এ মান্নান আওয়ামী লীগ বিরোধী সকল শক্তিকে তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় নেতারাও কলকাঠি নাড়িয়ে চেষ্টা করেছেন সফলতা অর্জনের। অধ্যাপক মান্নানের নির্বাচনী সমন্বয়কারী, হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ১৮ দলের অংশীদার ছাড়াও মান্নানকে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিশ, এনপিপি, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ইসলামী জোট, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র সমাজ, শ্রমিক পার্টি, শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট, ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ড্যাব, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি, আদর্শ শিক্ষক পরিষদ, বাংলাদেশ কারিগরী কলেজ শিক্ষক সমিতি, জিয়া পরিষদ, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, প্রভৃতি দল ও সংগঠন সমর্থন প্রদান করে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। গতকাল আজমত উল্লাহ খান স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে মহানগরীর টঙ্গীর পাগার, বিসিক এলাকা ও কাউলতিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে গণসংযোগ ও পথসভায় অংশগ্রহণ করেন। অপরদিকে, অধ্যাপক এম.এ মান্নান স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে গতকাল চান্দনা চৌরাস্তা, কাশিমপুর, দিগন্ত সোয়েটারসহ নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় এবং আশপাশের এলাকায় গণসংযোগ করেন ও পথসভায় বক্তব্য রাখেন। আজমত উল্লা খানের নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়কারী আকম মোজাম্মেল হক এমপি বলেন, নির্বাচনের প্রচারণায় আমরা খুবই আশাবাদী। মান্নানকে হেফাজতের সমর্থন:এদিকে, গতকাল হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতারা পূর্ব নির্ধারত এক সংবাদ সম্মেলনে এম এ মান্নানের পক্ষে তাদের সমর্থন ঘোষণা করেছেন। ফলে গতকাল সিটি নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও খেলাফত আন্দোলনের আমির শাহ আহাম্মদ উল্লাহ আশরাফী বলেন, আমরা অধ্যাপক মান্নানকে সমর্থন দিয়েছি। এ সময় মান্নানের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেঃ জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ বলেন, সরকার নির্বাচন কমিশনের চোখের সামনে প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে আচরণ বিধি লংঘন করে চলেছে। তিনি আজমত উল্লাহ খানের একটি পোস্টার দেখিয়ে বলেন, সরকারি দলের প্রার্থী তার নির্বাচনী পোস্টারে দলীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের ছবি ব্যবহার করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার হিসাবে দলীয় লোকদের নিয়োগ দিয়েছেন। আমরা রিটার্নিং অফিসে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার পাইনি। তিনি অভিযোগ করেন, এখনো সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ নির্বাচনে আজমত উল্লা খানের পক্ষে কাজ করছেন। সাংবাদিক সম্মেলনে জেলা জাতীয় পার্টির (এ) সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম বলেন, আমরা জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে এম এ মান্নানের প্রতি সমর্থন দিচ্ছি। দলের সকল নেতাকর্মী তার পক্ষে কাজ করছে। রিকুইজিশন আতঙ্কে যানবাহন শূন্য : টঙ্গী থেকে কাজী রফিক জানান, আগামী ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে সরকারের নির্দেশে ৫৭০টি গাড়ি রিকুইজিশন করবে ট্রাফিক পুলিশ। এমন খবর চালকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে গত দুই দিন টঙ্গী ও গাজীপুর সিটি এলাকা যানবাহন শূন্য হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে অফিসগামী সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছে। ৩৬০টি বাস ও ২১০টি মাইক্রোবাস করা হবে। ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের ভোট গ্রহণে সরকারি কাজের জন্য ৫৭০টি গাড়ি প্রয়োজন রয়েছে। গাড়ি সংকটের কারণে সিএনজিগুলো সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।