গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ঠিক একদিন আগে গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনে (ইসি) গিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। ক্ষমতাসীন দল বিকালে এসে নির্বাচনে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধের দাবি ও বেশকিছু প্রিজাইডিং অফিসারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে সকালে বিরোধী দল ‘বিশেষ এলাকার’ কর্মকর্তাদের দিয়ে পুলিশ প্রশাসন সাজানো ও গার্মেন্টস কর্মীদের পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ এনেছে। এ জন্য তারা এই নির্বাচনে আবারও সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, ঢালাওভাবে অভিযোগ না করে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত রয়েছে।
আগামীকাল শনিবার অনুষ্ঠিতব্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে একের পর এক অভিযোগ করে যাচ্ছে বিরোধী দল। সরকারের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। সদ্য অনুষ্ঠিত চারটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই নির্বাচনে বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করে। এই পরিস্থিতিতে গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে দু’দলই মরিয়া হয়ে উঠেছে। এর অংশ হিসাবে গতকাল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বেশকিছু অভিযোগ তুলেছে উভয় পক্ষই। বিকালে আওয়ামী লীগের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল ও সকালে বিএনপির দু’ সদস্যের প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ করেন।
আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমদের নেতৃতে গতকাল বিকাল পৌনে ৩টায় ইসিতে যান একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম ও আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক মৃনাল কান্তি দাস। প্রায় ঘন্টাব্যাপী প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) অন্য চার কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। বৈঠকে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে ১৪ প্রিজাইডিং অভিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। বলা হয়, এরা সবাই ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা। নির্বাচনে তারা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। নির্বাচনে ধর্মের অপব্যবহার, বিশেষ করে হেফাজত ইসলামের অপপ্রচার বন্ধের বিষয়ে কমিশনকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আহবান করা হয়। নির্বাচন কমিশনও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়। এছাড়াও সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে কমিশনের প্রকাশিত গেজেট নিয়েও আলোচনা করেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমদ বলেন, চার সিটির মতো যাতে গাজীপুর নির্বাচন সুষ্ঠু হয়, তার জন্য কমিশনকে বলা হয়েছে। তবে প্রধান বিরোধী দল এই নির্বাচন নিয়ে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বিএনপি জিততে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা অভিযোগ করতেই থাকবে-এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, চার সিটি নির্বাচনের আগে তিনবার ইসি এসেছিল তারা। নির্বাচনের দিন ৫ বার সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিল, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে না’। অথচ চার সিটিতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই কমিশনের অধীনেই আগামীতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে।
প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সেল গঠনের বিষয়ে তোফায়েল আহমদ বলেন, বিএনপির অভিযোগ ভিত্তিহীন। প্রধানমন্ত্রীর অফিসে কোনো সেল গঠন করা হয়নি। অভিযোগ করা বিএনপির অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনে হেরে গেলেই তারা অভিযোগ করেন।
বিএনপির প্রতিনিধি দল
এর আগে সকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল কমিশনে আসে। সিইসির সাথে দেখা করে নির্বাচনে অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ আনেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। পরে নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এটাই জাস্টিফাইড হয় যে, এ নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশের স্বার্থে সিইসিকে গাজীপুরে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছি।
সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে গাজীপুরে আইন-শৃংখলার যে পরিস্থিতি, তাতে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনের ব্যাপারে শঙ্কা রয়েছে। তাই তারা সেনাবাহিনী মোতায়েন চাইছেন। সেনা মোতায়েন করলে ভোটারদের আস্থা দৃঢ় হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন ‘বিশেষ এলাকার’ কর্মকর্তাদের গাজীপুরের পুলিশ প্রশাসনে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা প্রভাব বিস্তার করছেন। কয়েকটি এলাকায় গার্মেন্টস কর্মীদের পরিচয়পত্র নিয়ে নেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের বিজয় নিশ্চিত করতে এই অনিয়ম চলছে বলে তার দাবি। বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এম এ মান্নানের কর ফাঁকির অভিযোগে ব্যাংক একাউন্ট জব্দের বিষয়ে নজরুল বলেন, ভোটের সময়ে এনবিআরের আচরণ প্রমাণ করছে সরকার সবখানে দলীয়করণ করছে। বিএনপির বক্তব্য শুনে তা পর্যালোচনা করে সিইসি ‘যতটুকু সম্ভব দেখার’ আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান বিএনপি নেতা। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও নজরুলের সঙ্গে ছিলেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত কমিশন
যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত বলে উল্লেখ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। গতকাল শেরেবাংলা নগরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিকালে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। সিইসি বলেন, আমরা সব সময় গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
নির্বাচনে বিএনপি’র বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণভাবে কোন অভিযোগ করলে পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব না, যদি সুনির্দিষ্টভাবে কোন অভিযোগ করেন তাহলে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব।
স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রভাবের বিষয়ে সিইসি বলেন, নির্দলীয় নির্বাচনই হচ্ছে। কোন দলের প্রতীক ব্যবহূত হচ্ছে না। তবে যখন দলীয় নেতৃবৃন্দ নির্বাচনী কার্যক্রমে উপস্থিত থাকেন তখন দলীয় প্রভাব পড়ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্থানীয় নির্বাচনেও দলের প্রভাব কিছুটা পড়ে।
নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত আছে। যাতে করে ভোটাধিকার প্রয়োগে কোন প্রভাব না পড়ে সে বিষয়ে সর্বক্ষণ নির্বাচন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতোই শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আচরণবিধি মানতে কঠোর ইসি
গতকাল নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতই হচ্ছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের নির্বাচনী প্রচারণার শেষ সময়। এরপর এই এলাকায় কেউ নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন না। নির্বাচনী আচরণবিধি যাতে লঙ্ঘিত না হয়- সেদিকে কমিশন কড়া নজর রাখবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
