৩৩ বছর ধরে আইন পাস করছি

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৩, ২৩:২৩
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি বলেছেন, আমি বাংলাদেশের সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গত ৩৩ বছর ধরে আইন পাস করছি। জীবনে এই প্রথম কেউ আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললো। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জেরাকালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি এ কথা বলেন। তাকে দিনভর জেরা করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুম। জেরার প্রথম প্রশ্ন থেকেই ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ও সালাহউদ্দিন কাদেরের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা শুরু হয়। জেরাকালে কয়েক দফা বাক-বিতণ্ডা চলে। জেরা শেষে মামলার কার্যক্রম আগামী সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। এদিন আসামিপক্ষকে নতুন সাক্ষী আনার জন্য বলেছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল জেরার শুরুতে আইনজীবী সালাহউদ্দিন কাদেরের বংশ পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি পাল, সেন বা দাস না, আমি চৌধুরী। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আপনাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে আপনি হাঁ-না উত্তর দেন। তখন সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, আমি আপনার ছাত্র নই। আপনার এবং আপনার পিতার জন্মের বহু আগ থেকে চট্টগ্রাম বাংলার অংশ ছিল, কখনোই চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের বাসিন্দারা আলাদা জাতিসত্তা হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। এ ঐতিহাসিক বাস্তবতা জানা সত্ত্বেও সত্য গোপন করে ট্রাইব্যুনালে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বক্তব্য দিয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ কথা সত্য নয়। তাহলে চট্টগ্রাম পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হবে এ কথাটি আলাদা করে ব্রিটিশ রাজের ‘পার্টিশান অব বেঙ্গল গভর্নমেন্ট রেজুলেশন’-এ বলার দরকার হতো না। এছাড়া আইন করে জাতিসত্তার স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান। এর উত্তরে তিনি বলেন, সত্য। আপনার ১৮ জুন ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দির কিছু অংশ ‘জন্মসূত্রে চট্টগ্রামী। আমরা চট্টগ্রামের মানুষ। আমাদের নিজস্ব ভাষা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে।’ এ বক্তব্য সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং একইসঙ্গে সংবিধান অবমাননার শামিল—রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর এমন সাজেশনের (প্রস্তাব) জবাবে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, সংবিধানের সুনির্দিষ্ট কোন্ অনুচ্ছেদের সঙ্গে আমার বক্তব্য সাংঘর্ষিক তা উল্লেখ করা হয়নি। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে রাউজান ও হাটহাজারী আসনে আপনার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রার্থী ছিলেন। তিনি অধ্যাপক মুহাম্মদ খালেদের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন। উত্তরে সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, শুনেছি। এ সময় চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমার জানা নেই। এই ট্রাইব্যুনালে আপনার কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ প্রদর্শনী হিসেবে দাখিল করেছেন কিনা রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এখানে কেন আমি কোনো জায়গায় এমনকি নির্বাচন কমিশনেও আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ দেইনি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি কখনো হলে বা ছাত্রাবাসে অবস্থান করিনি। তাই এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো কাগজপত্র নেই। আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডনে অধ্যয়ন করেননি এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, এ কথা সত্য নয়। আমি বাংলাদেশের সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গত ৩৩ বছর ধরে আইন পাস করছি। ১৯৭১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে গেরিলা বাহিনীর আক্রমণে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সা গ্রহণ করেন। আপনার গাড়ির ড্রাইভার গুলিতে নিহত হয় মর্মে ২৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক পাকিস্তানে খবর প্রকাশিত হয়। আপনি জবানবন্দিতে বিষয়টি গোপন করেছেন এমন সাজেশনের জবাবে তিনি বলেন, যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে তখন আমি দেশে ছিলাম না। ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আপনার বাবা নিহত হওয়ার যে বক্তব্য দিয়েছেন তা অসত্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত-রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির এ বক্তব্যের জবাবে সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, এ কথা সত্য নয়, কারণ প্রয়াত নির্মল সেন ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবুল ফজল তাদের নিবন্ধে হত্যার কথা লিখেছেন। যা দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছে। রাউজানের কুণ্ডেশ্বরী, জগত্মল্লপাড়া, সুলতানপুর, বণিকপাড়া, ঊনসত্তরপাড়া, দেওয়ানজী পুকুরপাড় এবং মাকপুরা এলাকায় ১৯৭১ সালে নিহত শহীদদের নামের তালিকা সম্বলিত স্মৃতিসৌধ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের এ সাজেশনের জবাবে তিনি বলেন, আমি কখনো এসব এলাকায় যাইনি। ১৯৭৪ সালে দেশে ফেরত আসার পর আপনার সেই পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শনী হিসেবে জমা দিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেইনি। ১৯৭৪ সালে বেনামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমি বৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছি। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গেরিলা আক্রমণে আহত হয়ে আপনি শবে-বরাতের রাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান—রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ কথা সত্য নয়। আমি তখন দেশেই ছিলাম না। ১৯৭১ সালের ঘটনায় ১৯৭২ সালে দালাল আইনে মামলা ও জনরোষের কারণে আপনি আত্মগোপনে ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ কথা সত্য নয়। এছাড়া আত্মগোপনে থাকার কারণে ছোট বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি এ কথাও সত্যি নয়। পরবর্তীতে আপনি গোপন আস্তানা থেকে বেরিয়ে শাড়ি ও বোরখা পরে অন্য এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে ছোট বোন ও তার স্বামীকে আশীর্বাদ করেন— এমন সাজেশনের জবাবে তিনি বলেন, এ কথা সত্যি নয়। আপনি আপনার জবানবন্দিতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেননি। কৌঁসুলির এমন বক্তব্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমি দেশেই ছিলাম না। তখনকার ঘটনার জন্য কেনো নিজেকে নির্দোষ দাবি করবো। আমিতো রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়ে এখানে এসেছি।