জীবন সবার কাছেই তো আনন্দময়। যদি আনন্দময় না হতো তাহলে কি মানুষ বেঁচে থাকার জন্য এত কিছু করত? অবশ্যই জীবন আনন্দময়, আর জীবনে দুঃখ, কষ্ট, হতাশা থাকলেও প্রত্যেক মানুষেরই বেঁচে থাকার প্রতি তীব্র লোভ কাজ করে। আর এ জন্যই প্রতিটি মানুষের কাছে জীবন আনন্দময়। দৈনন্দিনের একঘেয়েমিকে পাশ কাটিয়ে একটু ভিন্নভাবে জীবনযাপনে নতুন স্বাদ মেলে। প্রতিনিয়ত নিজেকে পরিবর্তন করা নতুন সাজে নিজেকে উপস্থাপন করাই তারুণ্যের ধর্ম। এ নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
ঘড়ির অ্যালার্মের শব্দে বিছানা থেকে তাড়াহুড়ো করে নামল রুমানা। ইস্ সাতটা পাঁচ বাজে। ফ্রেশ হতে হবে। কোনোরকমে নাস্তা সেরেই ছুটতে হবে অফিসে। রাস্তায় প্রতিদিন কমবেশি জ্যাম তো আছেই। ঠিক নয়টায় অফিসে না পৌঁছতে পারলে বসের বকাবকি শুনতে হয়। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। আবার পরদিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কিভাবে যে দিন পার হয়, বুঝতেই পারে না সে। এভাবেই অফিস ও বাড়ি করে জীবনটা কেমন যেন পানসে হয়ে গেছে ওর। সপ্তাহের ছুটির দিনটাও কোথাও যেতে ভালো লাগে না। শুধু রুমানা নয়, প্রতিদিন একই রকম করে কাটানোর জন্য আমরা সবাই এক সময় হাঁপিয়ে উঠি। একঘেয়েমি আমাদের পেয়ে বসে। ছুটির দিনটির জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকি চাতক পাখির মতো। ছুটির দিনটি পারিবারিক আবহে বিশ্রামে পার করে আরেকটি ছুটির দিনের আশায় থাকি। এভাবেই মানুষের জীবনে একঘেয়েমি থেকে বিতৃষ্ণার জন্ম নেয়। আর জীবনের মুহূর্তগুলো নিরস হয়ে উঠে। অথচ নিরস মুহূর্তগুলোকে আনন্দময় ও উপভোগ্য করার কারিশমা কিন্তু আপনার নিজের হাতেই।
কাজে আনুন বৈচিত্র্য
প্রতিদিন রুটিন মাফিক কাজ করতে করতে আমরা একঘেয়েমিতে ভুগি। একইরকম কাজ নিয়মিত করায় একটা সময় গিয়ে সেই কাজের প্রতি আমাদের উত্সাহ থাকে না। খুব সহজেই আমরা তখন অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ি। অবসাদের অন্যতম কারণ হলো একঘেয়েমি। অবসাদগ্রস্ত হয়ে গেলে কর্মক্ষেত্র, পড়াশোনা, সৃষ্টিশীল কোনো কাজে পরিপূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে জীবনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ হয়ে যাই। এ জন্য প্রতিদিনের কাজে যদি কিছুটা বৈচিত্র্য আনা যায়, তাতে একঘেয়েমি কেটে যাবে। বিভিন্ন কাজে সময় কাটানোর পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আনতে পারলে জীবনটাকে সহজেই আনন্দময় ও উপভোগ্য করে তোলা সম্ভব।
প্রতিটি মুহূর্ত আনন্দময় করুন
জিসান এবার এসএসসি দেবে। পড়াশোনা চলে নিয়মিতই। ছাত্র হিসেবে ভালো। স্কুল, বাসা, ব্যাচে পড়তে যাওয়া, কম্পিউটার, বন্ধুদের সাথে সেলফোনে কথা—এই নিয়েই গত্বাধা রুটিন। ওর যেমন ভালোলাগে না, তেমনি বাবা-মা’রও নগর জীবনে নিজের সন্তানের জন্য একটু উচ্ছল বিনোদনের ব্যবস্থা করতে না পারার জন্য মনোকষ্টের কমতি নেই। এক সন্ধ্যায় বাবা কাজে বাইরে যাবে, জিসানকেও সঙ্গে নিল। প্রথমে মা একটু আপত্তি করলেন পড়াশোনার মুহূর্ত বলে, পরে ছেলেকে বের হতে দিতে রাজি হন। বাবার কাজ অল্প সময়ের। কিন্তু রিকশায় যাওয়ার পথটা অনেক। কাজও হলো, বাবা ও ছেলে রিকশায় বসে মুক্ত হাওয়াও খেল। অন্যদিন জিসান একটু পড়তেই যে ক্লান্ত হতো, সেদিন তার ব্যতিক্রম ঘটল। দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়েই পড়তে পারল সে। এ রকমভাবে আপনিও আপনার মুহূর্তগুলোকে আনন্দময় করে তুলতে পারেন। রুটিন মাফিক কাজ প্রতিদিন করতেই হবে তার তো কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে প্রতিদিন ঘুম থেকে সাতটায় উঠছেন, সপ্তাহে দু-তিনদিন ছয়টায় উঠুন। স্বামী-স্ত্রী কিংবা সন্তানসহ বাসার সামনের খোলা জায়গায় একটু বেরিয়ে আসুন। তা না থাকলে বাসার ছাদে হাঁটাহাঁটি করুন। সকালের চা-টা না হয় ছাদে বসেই খেলেন। অফিস থেকে বের হয়েই তো বাসায় যান প্রতিদিন। ইচ্ছে করলে একদিন যেকোনো পার্কে বিকেল বেলা খোলা বাতাসে হাঁটুন। অফিস-বাসার বাইরের পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটিয়ে দূর করতে পারেন, একঘেয়েমি ভাবটা অনায়াসেই। প্রতিদিন তো বাড়ির রান্না করা খাবারই খান। মাঝেমধ্যে সবাই মিলে বাইরে খেতে যেতে পারেন। ছুটির দিন ছাড়াও যেকোনো দিন রাতে এ পরিকল্পনা করা যেতে পারে। প্রতিদিন বাড়িতে স্ত্রীর হাতের বানানো চা-ই আপনি খান, দু-একদিন আপনি নিজেই চা বানিয়ে তাকে খেতে দিন। এতে পারস্পরিক সম্পর্কটা অনেক মধুর হয়। প্রতিদিন প্রতিটি কাজে আনন্দময় মুহূর্ত তৈরি করতে হবে নিজেকেই বৈচিত্র্যের মাধ্যমে। তবেই একঘেয়েমি দূর করে মানসিক আনন্দ ও অবসর যাপনের সুখ পাওয়া যাবে।
বদলে ফেলুন চিন্তাধারা
একঘেয়েমি ভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ নিজেকেই বের করতে হবে। কোনো ব্যক্তি যদি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি একটি নিরস কাজকে সরস বানিয়ে আনন্দ খুঁজবেন তাহলেই যথেষ্ট। এ জন্য মানসিক চিন্তাধারা পালটে ফেলতে হবে। কাজের প্রতি আন্তরিক হলে, ভালোবেসে কাজ করলে কোনো কাজ অর্ধেক পড়ে থাকে না। আর কাজের চাপে ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতে হয় না। আমাদের একঘেয়েমি বা অবসাদ আসে কাজের জন্য নয়। কাজ শেষ করতে না পারার ফলে ভাবনা-চিন্তায় হতাশা ও বিরক্তভাব থেকে। তাই প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন শেষ করতে হবে। প্রতিদিন নিজের একইরকম কাজ হলেও সেটাকে কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায়, তা চিন্তা করতে হবে। নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকতে হবে। এভাবে কাজের পরিধিকে বাড়ালে নতুনত্ব পাওয়া যায়। তখন আর একঘেয়ে ভাবটা থাকবে না। ঠিক মতো চিন্তার মধ্যে দিয়েই যেকোনো কাজ সরস করে তোলা যায়। এ জন্য দরকার সদিচ্ছার। একটু ভাবলেই বোঝা যাবে নিজের কাজকে আনন্দময় করে তুলতে পারলে কতটা লাভবান হওয়া যায়। প্রতিদিন ছোটখাটো বৈচিত্র্য থাকলে কাজে একঘেয়েমির চেয়ে আনন্দটাই বেশি থাকবে। আর জীবন হয়ে উঠবে রঙিন।
