আকাশে মেঘ দেখলেই ডিএনডি বাঁধের অভ্যন্তরে বসবাসকারী প্রায় বিশ লাখ মানুষের বুক দুরু দুরু করে কাঁপতে থাকে। বৃষ্টি তাদের কাছে এখন কেবলই দুর্ভোগের নাম। ৫৫ বছর আগে তত্কালীন সরকার অধিক শস্য ফলানোর লক্ষ্যে চতুর্দিকে বাঁধ দিয়ে ৫৬ বর্গ কিলোমিটারের এই এলাকা গড়ে তোলে। নারায়ণগঞ্জ-আদমজী-ফতুল্লা-ডেমরা দিয়ে নির্মাণ করা হয় সড়ক। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে ডিএনডি বাঁধ গড়ে তোলা হয়েছিল, সময়ের আবর্তে তা ভেস্তে যায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডিএনডি এলাকায় গড়ে উঠতে থাকে জনবসতি আর নানা শিল্পকারখানা, যার বেশিরভাগই অনুমোদনবিহীন, অবৈধ। বর্তমানে ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, শ্যামপুর ও ডেমরা এলাকায় প্রায় বিশ লাখ মানুষ ডিএনডির অভ্যন্তরে বসবাস করছে। ছোট বড় মিলিয়ে সহস্রাধিক শিল্পকারখানাও গড়ে উঠেছে এখানে। কিন্তু এর কোনটাই পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। শিল্প কারখানা অথবা আবাসিক ভবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোন নিয়ম নীতিরই তোয়াক্কা করেনি কেউ।
১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় রাজধানী ও নারায়ণগঞ্জ তলিয়ে গেলেও ডিএনডি বাঁধ এলাকা ছিল বন্যামুক্ত। সেই সময় ডিএনডি বাঁধ এলাকার বাসিন্দারা ছিলেন মহাসুখে। বিকাল হলে তারা নারায়ণগঞ্জ শহরে এসে নৌকা ভাড়া করে হাওয়া খেতে বের হতেন। তখন ডিএনডি এলাকায় জমির চাহিদা বেড়ে যায় রাতারাতি। মানুষ প্রতিযোগিতা করে জায়গা কেনা শুরু করে। ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় যে ডিএনডি ছিল ঐ এলাকার বাসিন্দাদের জন্য আশীর্বাদের মত তা ২০০৪ সালের পর পরিণত হয় তাদের মরণ ফাঁদে। মাসের পর মাস ডিএনডির অভ্যন্তর পানিতে ডুবে থাকে। বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় ডিএনডি বাঁধের গোটা এলাকা। তলিয়ে যায় রান্না ঘর, টয়লেট, ঘরের মেঝে। সড়কের কোথাও হাঁটু আবার কোথাও কোমর সমান পানি। গতকাল শুক্রবার ডিএনডি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফতুল্ল¬ার রামার বাগ, সস্তাপুর, গাবতলা, কায়েমপুর, চাঁদমারী, ইসলাম বাগ, শহীদ নগর, মাসদাইর, ইসদাইর, গাবতলী, এনায়েত নগর, তল্লা, সবুজবাগ, কুতুবপুর, পাগলা, দেলপাড়া, আলীগঞ্জ, দাপা, পিলকুনি, ভুঁইগড়, রঘুনাথপুর, কুতুব আইল, নয়াআটি, লামাপাড়া, সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠান টুলি, হাজীগঞ্জ, গোপটা, গোদনাইল, ধনকুন্ডা, জালকুড়ির নিম্ন এলাকা এখনও জলাবদ্ধতার কবলে। দিন কয়েক আগে বৃষ্টি হলেও তার পানি এখনো নামেনি। তল্লা এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, তাদের ঘরবাড়ি এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। ইসদাইর এলাকার মোহাম্মদ আলী জানান, তাদের পরিবারের সবাইকে প্রায় সারাক্ষণ খাটের ওপর বসে কাটাতে হচ্ছে। ঘরের মেঝে, রান্নাঘর—সবই পানির নিচে। সদর উপজেলার ফতুল্লার ইসদাইর, গাবতলী, কাপুড়াপট্টি, টাগারপাড়, লালপুর ও সস্তাপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এসব এলাকার একতলা বাড়িগুলোর মেঝে পানিতে তলিয়ে আছে। ইট দিয়ে খাট উঁচু করে তার ওপর বসে দিন কাটাচ্ছে পরিবারের লোকজন। পুরুষরা সারারাত জেগে চালিয়েছে পানির পাম্প। আপনা থেকে পানি সরার ব্যবস্থা না থাকায় পাম্প মেশিন দিয়েই পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করতে হয় তাদের। ইসদাইর বটতলা এলাকার আসকর আলী জানান, রাতভর পানির পাম্প চালিয়েছি আর সারাদিন হাত-পা গুটিয়ে বসে আছি খাটের ওপর। কাপুইড়াপট্টি এলাকার গৃহিণী সানজিদা জানান, রান্না ঘর পানিতে তলানো। গ্যাসের চুলাও তাই। সকালে পাউরুটি ও কলা খেয়েছি। শহরের ডিআইটিতে মামার বাড়ি থেকে দুপুরের রান্না করা খাবার পাঠাচ্ছে। ডিএনডির নিচু এলাকার বাসিন্দাদের দুর্গতি আরো বেশি। টাগারপাড় এলাকার হবু মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী লাবিবা খাটের উপর মাটির চুলা বসিয়ে রান্না করছেন। ঘরের মেঝেতে পানি। সেখানে ভাসছে স্পঞ্জের স্যান্ডেল, পানির বোতল, কন্টেইনার। বাড়ির সামনে ড্রেন। ড্রেনের পানি আর ঘরের পানি একাকার হয়ে আছে। দুর্গন্ধে টেকা দায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ডিএনডির পানি নিষ্কাশনে যে খাল রয়েছে তা বেদখল হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে খালের ওপর আধা পাকা দোকান ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। অনেকে বেআইনিভাবে খালের ওপর নির্মাণ করেছে ছোট কালভার্ট। এর ফলে খাল অনেক সরু হয়ে গেছে। ফতুল্লার বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক শিল্পকারখানা খালের জায়গা দখল করে রেখেছে। এসব কারণে খাল এখন সরু নালাতে পরিণত হয়েছে। পানি এই সরু নালা দিয়ে নিষ্কাশিত হতে পারছে না। ডিএনডি খাল দখলের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাউছুল আযম জানান, ডিএনডিতে ১৮ টি খাল রয়েছে। ১০ জন খাল দখলদারকে উচ্ছেদ নোটিস দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চাওয়া হয়েছে। অচিরেই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি জানান, ডিএনডির জলাবদ্ধতা নিষ্কাশনে কুতুবপুরে এলজিআরডি থেকে ৪টি নতুন পাম্পের জন্য ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এদিকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ডিএনডি সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম সারোয়ার জানান, ডিএনডি ভেতর জলাবদ্ধতার পানি নিষ্কাশনে ২২ টি ছোট ও ৪ টি বড় পাম্প শুক্রবার থেকে চালু রয়েছে। জুলাই মাসে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। তাই সরকার থেকে আগেভাগে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অপরিকল্পিত ভাবে বাড়ি-ঘর, মিল, কল-কারখানা, অফিস, আদালত ব্যাংক, বীমা, স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ তো আছেই, যে যেভাবে পেরেছে ডিএনডির পানি নিষ্কাশনের খালগুলোও জবরদখল করে রেখেছে। এ ছোট খালগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি প্রধান নিষ্কাশন খালে এসে জমা হয় এবং প্রধান নিষ্কাশন খাল দিয়ে পানি শিমরাইলের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প মেশিনের সাহায্যে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলা হয়। এ বিষয়ে শিমরাইলের ডিএনডি পাম্পহাউসের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার গোলাম সারোয়ার জানান, ডিএনডি সেচ ক্যানালে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা ঢাকা অফিসের দায়িত্ব। কি কারণে উচ্ছেদ হচ্ছে না তা তিনি জানেন না। তবে পাম্প হাউসের মুখের সেচ খালটি দখল হয়ে যাওয়ায় পাম্প হাউসে পানি খুবই কম প্রবেশ করছে। পানি কম আসার কারণে বর্তমানে পাম্প বন্ধ রয়েছে। তিনি জানান, খালের ভেতর আবর্জনা ফেলার কারণে পাম্পের সাহায্যেও ঠিকমত পানি বের করা যাচ্ছে না। ডিএনডি এলাকায় সুষ্ঠুভাবে সেচ প্রদান এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য ৯টি সেচ খাল, ৯টি ডিটিও খাল, ২১০টি আউট লেক, ১০টি নিষ্কাশন খাল কাটা হয়েছিল। এসব খালের সর্বমোট দৈর্ঘ্য ১৮৬ কিলোমিটার। এরমধ্যে নিষ্কাশন খালের দৈর্ঘ ৪৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার। ইরিগেশন ক্যানালের দৈর্ঘ্য ৫১ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এসব খালের বেশিরভাগ এলাকা এখন জবরদখল হয়ে গেছে।
ডিএনডির ৫৫ বছরের ইতিহাসে ২০০৪ ও ২০০৫ সালে ঘটে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়। ঐ দুই বছরের মত ভয়াবহ বন্যা যেন আর না হয়—এ প্রত্যাশা ডিএনডির প্রতিটি বাসিন্দার। ডিএনডির দিকে কোন সরকারই দৃষ্টি দেয় না বলে মনে করেন তারা। ১৯৯২ সালে জাপানি প্রতিষ্ঠান জাইকা একটি সমীক্ষা চালায় ডিএনডিতে। জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে বর্তমান পাম্প হাউসের অনুরূপ আরো ৫ টি পাম্প হাউস স্থাপন ছাড়াও জাইকা একাধিক প্রস্তাব রাখে। কিন্তু তাদের সে সব প্রস্তাব বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ গত ১৫ বছরেও নেয়নি কোন সরকার। আগেরবার আওয়ামী লীগ সরকার ডিএনডিকে ‘মডেল টাউন’ করার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। অপরিকল্পিত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঐ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি ডিএনডিবাসীর প্রবল বাধার কারণে। বর্ষা মৌসুমে ডিএনডিকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখার জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে ইতিপূর্বে। ২০০৫ সালের ২৪ জুলাই পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়। ঐ বৈঠকে মন্ত্রী, এমপি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা ওয়াসা ও রাউজকসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করলেও ডিএনডি’র জলাবদ্ধতা নিরসন বা এর উন্নয়নে তাদের মধ্যে কোন সমন্বয় হয়নি। ডিএনডির জলাবদ্ধতা নিরসন ও সার্বিক উন্নয়নে ঐ সময় ২৩৩ কোটি টাকার একটি প্রস্তাবনা আনা হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ ছাড় না হওয়ায় ঐ প্রস্তাবনা এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
গতকাল গিয়ে দেখা যায়, ফতুল্লা পাগলা, চিতাশাল, মুন্সিবাগ, নূরবাগ এলাকা, এলাকার ঢালু অংশে প্রায় হাঁটু পানি। গলিগুলোর অবস্থা আরো করুণ। কোনটাতে হাঁটু পানি, কোনটাতে কোমর অবধি ডুবে যায়। মহিলারা পর্যন্ত রাস্তায় হাঁটছেন প্রায় অর্ধেক ভিজে। এত দুর্ভোগের পরও বাসিন্দারা এ ব্যাপারে কথা বলতে তেমন আগ্রহী নন। অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। তাছাড়া বলেও বা কি লাভ! কে শুনবে তাদের কথা! এমনই মনোভাব প্রায় প্রতিটা বাসিন্দার।
