বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফার আন্দোলন শুরু করেন, তখন পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি অস্ত্রের ভাষায় মুজিবের ছয় দফার জবাব দেব।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি আন্দোলনের ভাষায় তা প্রতিরোধ করবো।’ বঙ্গবন্ধু তা করেছিলেন। বর্তমানেও চারদিক থেকে শেখ হাসিনাকে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র ঘিরে ধরলেও একমাত্র আন্দোলনের ভাষায় তিনি এই শত্রুব্যুহ ভেদ করতে পারবেন।
মনে হয় গাজীপুরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ গাজী হতে যাচ্ছে। ৬ জুলাই শনিবার যখন এই নিবন্ধটা লিখছি, তখন গাজীপুরের সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন চলছে। চূড়ান্ত ফল সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত নই। তবে গাজীপুর থেকে যে আভাস পাচ্ছি, তাতে মনে হয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হবেন। এজন্য চারটি নির্বাচনের মতো আওয়ামী প্রার্থী শহীদ হবেন না। আমি অবশ্য গাজীপুর থেকেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয়ের খবর শোনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। এখনো আছি। তবে জয়ের আভাস পাচ্ছি বলে আনন্দিত।
এই নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার পর বিএনপি কি বলবে, তাও অনুমান করতে অসুবিধা হচ্ছে না। যদি তাদের প্রার্থী জয়ী হন, তাহলে এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে তারা মেনে নেবেন। বলবেন, এখন আর আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। তারা অবিলম্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি মেনে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করুক। আর বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হলে চিত্কার শুরু হবে, আওয়ামী লীগ কারচুপি করে আমাদের জয় ছিনতাই করেছে। এই দুই বক্তব্যের রেকর্ডই বিএনপি অফিসে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার পর কোন্টা বাজানো হবে, তা তারা ঠিক করবেন।
দু’-তিন দিন আগে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ হচ্ছিল। আওয়ামী লীগের নব প্রজন্মের উদীয়মান নেতাদের মধ্যে তার প্রতি আমার অগাধ আস্থা। কাদের ভালো সাংবাদিকও। অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘বাংলার বাণীর’ সাংবাদিক থাকার সময় থেকেই তার সঙ্গে আমার পরিচয়। সাংবাদিকতাতেও তিনি দক্ষতা দেখিয়েছেন। এবার একটি বিতর্কিত মন্ত্রী দফতরের ভার গ্রহণ করে তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে যে গতি সঞ্চার করেছেন এবং সুনাম অর্জন করেছেন তা বিস্ময়কর। দেশের অবস্থা সম্পর্কেও তার কাছ থেকে মোটামুটি বাস্তব পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ পাই। ওবায়দুল কাদের অতি আশাবাদে ভোগেন না, আবার সহজেই হতাশ হয়ে পড়েন না।
টেলিফোন-আলাপে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আওয়ামী লীগ সরকার অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতির মধ্যেও দেশের উন্নয়ন ও দারিদ্র্য মোচনে এতো ভালো কাজ করেছে যে, যা বিএনপি’র শাসনামলে ভাবাই যায়নি। তারপরও সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির কারণ কি? কাদের বললেন, গাফ্ফার ভাই, কেবল উন্নয়নের কাজ দ্বারা মানুষের মন জয় করা যায় না, আচরণ ভালো করা চাই। আমরা মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করিনি। সংসদে আমাদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু আমরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। আমরা ক’জন সংসদ সদস্য নিজেদের নির্বাচন কেন্দ্রে যেতে পারি? নিজেদের কৃতকর্মের জন্য নির্বাচকমণ্ডলীর সম্মুখীন হতে আমরা ভয় পাই। আমাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকট, প্রচারশক্তি আরো দুর্বল। আমরা অসংখ্য ভালো কাজ করেও তা দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারি না। মিডিয়া আমাদের প্রতি বিমুখ। বিএনপি-জামায়াত শত মুখে আমাদের বিরুদ্ধে শত মিথ্যা প্রচার করছে। জানেনতো, একটি মিথ্যাকে শত মুখে শত বার বললে সত্য হয়ে যায়। বিএনপি-জামায়াতের মিথ্যা প্রচারণাও এখন দেশের অনেক মানুষ সত্য মনে করে। সবচাইতে বড় কথা, বর্তমানে যা চলছে, তা ’৪৭ ও ’৭১ এর মধ্যে যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ’৭১ এর ইডিওলজিকাল ভিত্তি থেকে আমরা ক্রমশই সরে আসছি। ’৪৭-এর ইডওলজি তাই যুদ্ধে জয়ী হচ্ছে। আমরা ’৭১ এর শক্তি ঐক্যবদ্ধ হতে ও ঘুরে দাঁড়াতে পারছি না।
এতো কিছু বলার পরও ওবায়দুল কাদের বললেন, ‘আমি হতাশ নই। আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার সময় এখনো আছে। আমাদের সবচাইতে বড় রাজনৈতিক মূলধন শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্ব।’ ওবায়দুল কাদেরই আমাকে গাজীপুরে নির্বাচনের হাওয়া ঘুরছে বলে জানালেন। বললেন, নেত্রীতো (শেখ হাসিনা) এখন লন্ডনে। তার সঙ্গে দেখা হলে জানাবেন, গাজীপুরে আমাদের জয়ের আশা দেখা দিয়েছে।
আমার এই লেখাটি যখন ৭ জুলাই ভোরে ‘ইত্তেফাকের’ পাঠকদের চোখে পড়বে তখন হয়তো তারা জেনে যাবেন, গাজীপুর নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল কি? আমি ইতিপূর্বে আমার একটি কলামে লিখেছিলাম, গাজীপুর হচ্ছে আওয়ামী লীগের জন্য স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাবাহিনীর হাতে ক্রমাগত পরাজয় বরণের পর স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধেই সোভিয়েট ইউনিয়নের লাল ফৌজ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল এবং যুদ্ধের মোড় তাদের জয়ের দিকে ঘুরে গিয়েছিলো। মস্কোর উপকণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছেও জার্মান নািস বাহিনীকে পেছাতে হয়েছিল এবং পরাজিত হতে হয়েছিল।
সাম্প্রতিক চার চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শোচনীয় পরাজয় বরণের পর যদি গাজীপুর নির্বাচনে জয় লাভ করে, তাহলে তা হবে স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধে লাল ফৌজের বিস্ময়করভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো জয়। এই জয় ধরে রাখতে পারলে আগামী সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা অনেকটাই দূর হবে। কিন্তু কতোটা দূর হবে তা নির্ভর করে তার সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস, দ্রুত জনবিচ্ছিন্নতা দূর করার উপর। ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং দুর্নীতি দমনে আওয়ামী লীগ তার দুর্বলতা পরিহার করেছে এই সত্যটি দেশবাসীর কাছে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারার উপর।
সবচাইতে বড় কথা, আওয়ামী লীগকে তার সেকুলার জাতীয়তাবাদের আদর্শে ফিরে আসতে হবে। ’৭১-এর চেতনায় বিশ্বাসী সকল দল ও মতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। শিথিল মহাজোট নয়, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির শক্তিশালী দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। হাতে মাত্র সময় আছে কয়েক মাস। গাজীপুরে যদি আওয়ামী লীগের পরাজয় ঠেকানোও যায়, তাতে আত্মসন্তোষে না ভুগে আওয়ামী লীগকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রিয়, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। কিন্তু এই ধর্মান্ধতাকেই ধর্মের খোলস পরিয়ে রাজনীতিতে ব্যবহার করে জামায়াত-বিএনপি-হেফাজত বাংলার মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। আওয়ামী লীগও এই ধর্মান্ধতার সঙ্গে আপস করে, নিজেদের জামায়াতি ও হেফাজতিদের চাইতে বড় মুসলমান প্রমাণ করে লাভবান হবে না। বরং নিজেদের সেকুলার অবস্থানে অনড় থেকে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের শক্তিতেই মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতা এবং সেই ধর্মান্ধতা মিশ্রিত রাজনৈতিক অপশক্তিকে পরাস্ত করতে পারবে।
আওয়ামী লীগের শত্রু এখন ডানে-বামে। এমনকি নিজেদের ভেতরেও। এরশাদ সাহেব এবং তার জাতীয় পার্টির মতিগতি বোঝা ভার। তিনি কখনো বলছেন মহাজোটে থাকবেন না, কখনো বলছেন, কারো সঙ্গে জোট না করে একা নির্বাচনে যাবেন। গাজীপুরের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে শেষ পর্যন্ত সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু তার দলীয় লোকেরা স্থানীয়ভাবে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে বলে খবর রটেছে। এরশাদ সাহেবকে মহাজোটে রাখার জন্য তোয়াজ-তদ্বিরের অন্ত নেই। তাতে আওয়ামী লীগের সামনের সারির কোনো কোনো নেতা-কর্মীও লজ্জা পাচ্ছেন বলে আমার কাছে ক্ষোভের সঙ্গে কথা বলেছেন।
এটা এরশাদ সাহেবের জন্য রাজনৈতিক মাহেন্দ্রক্ষণ। নীতি-নৈতিকতা তার রাজনীতির মানদণ্ড নয়। সুতরাং তিনি খেলবেনই। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আওয়ামী লীগ যদি এই খেলা আর কিছুকাল সহ্য করে চলেও দলটির উচিত হবে মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত কিন্তু বর্তমানে নিষ্ক্রিয় বাম গণতান্ত্রিক দলগুলোকে আরো কাছে টানা, সক্রিয় করা, সিপিবি ও বাসদের মতো দলগুলোকেও মহাজোটে টেনে আনা এবং মহাজোটের ঐক্য সুদৃঢ় করা।
গাজীপুর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও আগামী সাধারণ নির্বাচনে তার জয়কে তা নিশ্চিত করবে না, যদি আওয়ামী লীগ তার সাংগঠনিক দুর্বলতা দূর না করে এবং তার আদর্শিক ভিত্তিমূলে যতোটা সম্ভব (বর্তমান পরিবর্তনের হাওয়া মেনে নিয়েও) ফিরে যাওয়ার চেষ্টা না করে। ’৪৭ ও ৭১’ এর এই আদর্শগত যুদ্ধে আওয়ামী লীগকে একাত্তরের চৈতন্যকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতেই হবে।
আওয়ামী লীগের আরেকটি প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান গ্রহণ করছে সুশীল সমাজের একটা বড় অংশ, কিছু বড় এনজিও, ট্রান্সপারেন্সি, সুজন ইত্যাদি কিছু চ্যাটারিং ক্লাব এবং নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের শিবির। এখানেও প্রশ্ন উঠেছে আওয়ামী লীগ কি এই ফ্রন্টের সঙ্গে আপস করবে, না সব ফ্রন্টেই যুদ্ধ করবে? ইউনূস-শিবিরের দু’টি ইংরেজি ও বাংলা মুখপত্র ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সরাসরি হেট ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। এদের সম্মিলিত শক্তি কম নয় এবং এদের প্রচারণা বিএনপি-জামায়াত শিবিরের শক্তি বাড়িয়ে তুলছে।
অভিমন্যু সপ্তরথী বেষ্টিত হয়ে শত্রুব্যুহ থেকে বেরুবার পথ পাননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই পথ খুঁজে বের করতে হবে। অতুলনীয় সাহস তার বড় অস্ত্র। কিন্তু এই যুদ্ধে সাহসের সঙ্গে কৌশলেরও প্রয়োজন রয়েছে। তিনি দেশের বাম ও ডান সকল গণতান্ত্রিক দলের নেতাদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে বসুন। যুদ্ধের নীতি ও কৌশল নির্ধারণ করুন। একদিকে মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতা, অন্যদিকে সুযোগ সন্ধানী ও আত্মস্বার্থসর্বস্ব এলিট ক্লাসের একশ্রেণীর মাথাওয়ালা লোকদের জোটবদ্ধতা, এই দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ করে সফল হতে হলে আওয়ামী লীগকে তার গণসমর্থনের শিকড়ে ফিরে যেতে হবে। একমাত্র গণঐক্যের দুর্বার শক্তি দ্বারাই পারবে আওয়ামী লীগ বহু ফ্রন্টে গণশত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে। দোদুল্যমানতা ও আপসবাদিতা তার পরাজয় ডেকে আনবে।
বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফার আন্দোলন শুরু করেন, তখন পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি অস্ত্রের ভাষায় মুজিবের ছয় দফার জবাব দেব।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি আন্দোলনের ভাষায় তা প্রতিরোধ করবো।’ বঙ্গবন্ধু তা করেছিলেন। বর্তমানেও চারদিক থেকে শেখ হাসিনাকে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র ঘিরে ধরলেও একমাত্র আন্দোলনের ভাষায় তিনি এই শত্রুব্যুহ ভেদ করতে পারবেন। আর এই আন্দোলন হবে ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক শক্তির আন্দোলন।
গাজীপুরে যদি আওয়ামী লীগ জেতে তাহলেও তাকে এই জয়কে ধরে রাখার জন্য তার শক্তির ভিত্তি জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে। আর পরাজিত হলেও আবার শক্তি সংগ্রহ ও জয়লাভের জন্য আরও কঠোরভাবে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে; গণঐক্য গড়ে তুলতে হবে। গাজীপুরের এই নির্বাচনের ফল আওয়ামী লীগকে পথ দেখাক। গাজীপুর হোক আগামী সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার পথনির্দেশ। জয়ে উল্লসিত হওয়া উচিত হবে না। পরাজয়েও নিরাশ হওয়ার কারণ নেই। নেতৃত্ব আছে এবং নীতিও আছে। আওয়ামী লীগকে কেবল তা সবলে আঁকড়ে ধরতে হবে এবং ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আমার বিশ্বাস, গাজীপুর আওয়ামী লীগকে এই ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি ও সাহস জোগাবে।
\ লন্ডন ৬ জুলাই, শনিবার, ২০১৩ \
