চট্টগ্রামে চার দশক শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগ নেই

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০১৩, ২১:৪১
বাণিজ্যিক রাজধানী ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামকে ঘিরে গত চার দশক ধরে ভারী ও মাঝারি শিল্প খাতে কোনো নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ নেই। গড়েও উঠেনি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন কোনো শিল্পাঞ্চল। সামপ্রতিক সময়গুলোতে চট্টগ্রামের অনেক বেসরকারি উদ্যোক্তা শিল্প স্থাপনে আগ্রহ পোষণ করলেও তারা হাজারো সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই আগ্রহটুকুও হারিয়ে ফেলছেন। সেই সাথে শিল্প বিশেষজ্ঞ বা ইনডাস্ট্রিয়াল এক্সপার্ট হিসাবে ভূমিকা পালনকারী একটি মহলের নেতিবাচক ভূমিকার কারণেও শত কোটি টাকার বিনিয়োগে আগ্রহী অনেক বিনিয়োগকারী আস্থাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র। চট্টগ্রাম চেম্বারের দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র জানান, স্বাধীনতার পূর্বে স্থাপিত শিল্পাঞ্চলগুলো ছাড়া স্বাধীনতা উত্তরকালে স্থানীয় বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য আর কোনো শিল্পাঞ্চল স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য গড়ে উঠেনি। উদ্যোক্তাদের মধ্যে সহজ বিনিয়োগ মনে করে যারা রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের দিকে গেছেন তারাও সামপ্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি। শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আমদানি রপ্তানির ব্যাপক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রামের মাটিতে স্থানীয় বেসরকারি বিনিয়োগে ভারী ও মাঝারি শিল্প স্থাপনে দীর্ঘদিনের বন্ধ্যাত্ব বিস্ময়কর। এখানে শিল্প স্থাপন ও স্থানীয় বিনিয়োগ কাজে লাগাতে সরকার সমূহের ব্যর্থতাকেও তারা দায়ী করেন। তারা বলেন, গত ক’বছর আগে থেকেই চট্টগ্রামের মিরসরাইতে স্পেশাল ইকোনোমিক জোন স্থাপনের কথা বলা হলেও প্রসঙ্গটি এখন চাপা পড়ে গেছে। স্বাধীনতার আগে স্থাপিত কালুরঘাট, সীতাকুন্ড, বাড়বকুন্ড, ফৌজদারহাট ইত্যাদি শিল্পাঞ্চলগুলোকেও যথাযথভাবে বিকশিত করার ক্ষেত্রে সরকারসমূহ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি এবং শিল্পপতি সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামে স্থানীয় বিনিয়োগে শিল্প স্থাপনে তিনটি বড় সমস্যা উদ্যোক্তাদেরকে কঠিন সংকটের মধ্যে ফেলে রেখেছে। সংকটগুলো হচ্ছে, নতুন শিল্প স্থাপনায় গ্যাস সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা যা নি:সন্দেহে বড় সমস্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমির অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি। চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও ফ্রাঙ্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, শিল্প স্থাপন, এ বিষয়ে ঋণ প্রদান এবং শিল্প সুবিধার সবকিছু কেন্দ্রীভূত করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের অশেষ সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো যায়নি গত প্রায় চল্লিশ বছর। তিনি এজন্য বিগত সময়ের সব সরকারকেই দায়ী করে বলেন, চট্টগ্রামের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে চট্টগ্রামে শিল্প স্থাপনের অনিশ্চয়তা দূর করতে শিল্প বিষয়ক সকল কার্যক্রমকে বিকেন্দ্রীকৃত করতে হবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার আগে নাসিরাবাদসহ যেসব জায়গা শিল্প স্থাপনের জন্য দেয়া হয়েছিলো সেগুলো বেহাত হয়েছে কিংবা যথাযথ হাতে পড়েনি। ফলে সেসব স্থানে আজো কোনো শিল্প গড়ে উঠেনি। তিনি বলেন, প্রচুর বিনিয়োগকারী চট্টগ্রামে শিল্পে বিনিয়োগের অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু আস্থাহীনতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগের অভাবের কারণে শিল্প স্থাপিত হচ্ছে না। তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামেও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেই সাথে শিল্প স্থাপনের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসাবে চট্টগ্রামে ভূমির অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিকেও দায়ী করেন। তিনি জানান, চট্টগ্রামে এখন এক কাঠা ভূমির মূল্য ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা। এই দামে ভূমি কিনে দু’ চার পাঁচ কোটি টাকায় শিল্প স্থাপন সাধারণ উদ্যোক্তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এদিকে বেসরকারি রিফাইনারী সেক্টরের একটি সূত্র জানান, কিছু সংখ্যক অপেশাদার ও স্বার্থান্বেষী চক্রের তত্পরতায় এই সেক্টরেও বিনিয়োগ গুটিয়ে রেখেছেন উদ্যোক্তারা।