র্যাবের গুলিতে পা হারানো ঝালকাঠির রাজাপুরের কলেজ ছাত্র লিমন হোসেনের বিরুদ্ধে র্যাবের দায়ের করা সব মামলা অবশেষে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এ তথ্য জানিয়েছেন। এর আগে অস্ত্র আইনে ও সরকারি কাজে বাধার অভিযোগে করা দু’টি মামলায় লিমনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় পুলিশ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী লিমনের মামলা প্রত্যাহার করা হবে।’ মামলা প্রত্যাহারের পর এবার লিমনের পা হারানোর জন্য দায়ী র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা-জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন মনে করছি না। র্যাব লিমন ও তাঁর সঙ্গীদের যে অবস্থায় পেয়েছে, তাতে তারা র্যাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেছিল। প্রতিরোধের বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে হবে।’
মামলা প্রত্যাহারের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন লিমন হোসেন। তিনি মনে করেন, এর মধ্য দিয়েই প্রমাণ হয়েছে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। এখন অভিযুক্ত র্যাব সদস্যদের বিচার হলেই তিনি ‘প্রকৃত বিচার’ পাবেন।লিমনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা দু’টি প্রত্যাহারের জন্য অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। গতকাল কমিশনের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কমিশনের চেয়ারম্যানের পাঠানো আধা-সরকারি চিঠি, সরাসরি সাক্ষাত্ ও অনুরোধের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষ মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই ফোন করে কমিশন চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানিয়েছেন। এ সিদ্ধান্ত নেয়ায় সরকার, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানিয়েছে কমিশন।
এর আগে ২৩ জুন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান তাঁর কার্যালয়ে লিমন, তার মা হেনোয়ারা বেগম ও বাবা তোফাজ্জেল হোসেনকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন। এ সময় তিনি র্যাবের দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের বিপরীতে র্যাবের বিরুদ্ধে লিমনের মায়ের করা মামলা তুলে নেয়ার প্রস্তাব করেন। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
সাতুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা লিমনকে ২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিকেলে বাড়ির কাছের স্থানীয় শহীদ জমাদ্দারের বাড়ির সামনে র্যাবের-৮র একটি দল আটক করে। র্যাবের দাবি, লিমন স্থানীয় সন্ত্রাসী মোর্শেদ জমাদ্দারের সোর্স। এসময় লিমন নিজেকে কাঠালিয়া পিজিএস কারিগরি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী বলে পরিচয় দেন। কিন্তু র্যাবের এক সদস্য লিমনের কথা না শুনেই তার বাঁ পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেন। পরে ঢাকা চিকিত্সাধীন অবস্থায় তাকে সুস্থ করতে চিকিত্সকরা তার গুলিবিদ্ধ বাম পা কেটে ফেলেন।
এ ঘটনার পর র্যাব-৮ এর তত্কালীন উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) লুত্ফর রহমান বাদী হয়ে লিমনসহ আটজনের বিরুদ্ধে রাজাপুর থানায় দু’টি মামলা করেন। অন্যদিকে র্যাবের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন লিমনের মা। কিন্তু তদন্তের পর মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) দেয় পুলিশ। এ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করলে সেটাও খারিজ করে ঝালকাঠির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। পরে এ আদেশের বিরুদ্ধে জজ আদালতে রিভিশন দায়ের করেন হেনোয়ারা বেগম।
দোষী র্যাব সদস্যদের বিচার
ঝালকাঠি প্রতিনিধি ও রাজাপুর সংবাদদাতা জানান, মামলা প্রত্যাহারের খবর পাবার পর লিমন প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান স্যার আমাকে ফোন করে আমার বিরুদ্ধে র্যাবের সকল মামলা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ খবর শুনে আমি খুশিতে চিত্কার করে উঠি। এতটা খুশি হয়েছিলাম যে, আমি স্যারের সাথে ফোনেই কেঁদে ফেলেছিলাম। স্যার এসময় আমাকে সান্ত্বনা দেন এবং আমার বিজয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন।’ লিমন আরো জানান, মিডিয়ায় ব্যাপারটি ফলাও করে প্রচারিত হওয়ায় সরকার সত্যটা বুঝতে পেরে র্যাবের সাজানো মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এখন সরকারের কাছে দাবি করি, আমাকে গুলি করে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়া র্যাব সদস্যদের যেন সঠিক বিচার করা হয়।
লিমনের মা হেনোয়ারা বেগম জানান, তার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল। তারা গরীব বলে র্যাব তাদের নানাভাবে হয়রানি করেছে। মামলা চালানোর মতো তাদের কোন সামর্থ্য নেই। সরকার এই মামলা প্রত্যাহার করায় তারা চির কৃতজ্ঞ।
লিমনের আইনজীবী আক্কাস সিকদার বলেন, ‘সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন লিমনকে গুলি করে পঙ্গু করা র্যাব সদস্যদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা লিমনের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবো।’
