প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রফতানি বেড়েছে

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৩, ২২:৩৯
আগের বছরের তুলনায় সদ্য শেষ হওয়া ২০১২-১৩ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগের অর্থবছরে রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল পাঁচ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের দিক থেকে বরাবরের মত গত অর্থবছরও পিছিয়ে ছিল। অবশ্য আগের অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছরে রফতানি আয় লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছে ছিল। ২০১১-১২ অর্থবছরে যেখানে রফতানি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আট দশমিক ৩৫ শতাংশ পিছিয়ে ছিল সেখানে গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মাত্র তিন দশমিক ৫১ শতাংশ পিছিয়ে ছিল। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) জুন শেষের রফতানি পরিসংখ্যানে এমনটি দেখা গেছে। গত অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা আগের অর্থবছরের চেয়ে বেশি ছিল, ডলারের দামও ছিল পড়তির দিকে¬। বিদায়ী অর্থবছর জুড়ে ডলারের গড় মূল্য ৮০ টাকার নিচে অবস্থান করছিলো। এরকম পরিস্থিতিতে রফতানির পরিমাণ ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হলেও বড় ধরনের আঘাত আসেনি বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান সুভাশীষ বসু বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাবনা অনেক। এতে দেশের নানা প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে রফতানির গতি দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে রফতানি সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে ইপিবি বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান বেশি রফতানি হওয়ার পণ্যের পাশাপাশি জাহাজ নির্মাণ শিল্প, কাগজ, প্রিন্টিং, রাবারসহ ১২টি পণ্য রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশ বিদেশে মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগের ফলে রফতানি বাড়ছে। রফতানির ইতিবাচক ধারার বিষয়ে রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দা ও দেশের রাজনৈতিক খারাপ অবস্থার মধ্যেও রফতানি বাড়ছে-এটা খুবই ভাল লক্ষণ। তবে গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকট, উচ্চ সুদ হার, অবকাঠামো সমস্যাসহ নানামুখী সমস্যাসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রফতানিকারকরা শঙ্কিত। এজন্য সামনের দিনগুলোতে আরো বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। রফতানি আয়ের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি যেসব ঝুঁকি রয়েছে সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রতিকূলতার মধ্যে রফতানি আয় বাড়লেও রফতানি বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখে এমন পণ্যের সংখ্যা বাড়ছে না। গুটিকয়েক পণ্যই নিয়ন্ত্রণ করছে এ বাণিজ্য। একইভাবে গত এক দশক ধরে গুটিকয়েক দেশের বৃত্তের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখা এ রফতানি খাত। সীমিত পণ্য ও বাজার এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কমে যাচ্ছে টার্মস অব ট্রেড (এক ইউনিট রফতানির পরিবর্তে কত ইউনিট আমদানি করা যায়)। ফলে যেকোন সময় রফতানি খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। উদ্যোক্তাদের মতে, দেশ থেকে ৭০৫টি পণ্য রফতানি হলেও মাত্র ছয় ধরনের পণ্যের ওপর টিকে আছে পুরো রফতানি খাত। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ আশানুরূপ না হওয়ায় এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে পণ্যের বহুমুখীকরণ হচ্ছে না বলে তাদের অভিযোগ। ফলে রফতানি বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ছে দেশ। অন্যদিকে অর্থনীতির বড় এ খাতে কোন ধরনের নেতিবাচক ঘটনা ঘটলে পুরো অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়বে বলেও সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে এ খাতে আয়ের পরিমাণ বাড়বে বলেও উদ্যোক্তারা মত দিয়েছেন। এজন্য রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আরও বেশি এগিয়ে আসা প্রয়োজন। পণ্যের বহুমুখীকরণ না হলে এবং রফতানির গন্তব্য না বাড়লে অর্থনীতিতে বড় ধরনের দুর্যোগ আসতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন স্বয়ং বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের। ইপিবির তথ্যমতে, গত অর্থবছরের পুরো সময়ে দুই হাজার ৭০১ কোটি ৮২ লাখ ডলার পরিমাণের পণ্য রফতানির হয়েছে। যা গত বছরের একই সময়ে তুলনায় ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। অর্থাত্ আগের অর্থবছরের (২০১১-১২) একই সময়ে দুই হাজার ৪২৮ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছিল। যা ওই অর্থবছরের ইপিবির নেয়া লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আট দশমিক ৯৩ শতাংশ পিছিয়ে ছিল। এসময়ে রফতানি আয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, ফার্মাসিটিক্যালস, চামড়াজাত পণ্য, কসমেটিকস, হ্যান্ডি ক্রাফট্স, কাগজ ও কাগজজাত পণ্য, চট ও চটের ব্যাগ, কার্পেট, ফুটওয়্যার প্রভৃতি। ইপিবির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইপিবির তালিকাভুক্ত পণ্যগুলোর মধ্যে প্রায় ২৭টি খাতের কোন অগ্রগতি নেই। গত অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় এসব খাতে রফতানি কমেছে। আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ও প্রবৃদ্ধির দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার রফতানি। এসময়ে গত অর্থবছরে এ পণ্যটি মোটেও রফতানি হয়নি। এছাড়া হিমায়িত খাদ্য, হিমায়িত মাছ, চিংড়ি, চা, তামাক, ফুল, সিমেন্ট, পাথর, লবণ, পেট্রোলিয়াম সামগ্রী, কেমিক্যাল, প্লাস্টিক পণ্য, প্রিন্টেড পণ্য, উল ও উল সামগ্রী, কাঁচা পাট, সিরামিক, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, জাহাজ ও নৌকা জাতীয় পণ্য আগের অর্থবছরের চেয়ে কম রফতানি হয়েছে।