পিএসসির সিদ্ধান্তে দিনভর ভোগান্তি

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৩, ২২:৪৩
৩৪তম বিসিএস নিয়ে শাহবাগে বিক্ষোভ আন্দোলনের মুখে ফল পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা প্রিলিমিনারিতেই কোটা অনুসরণ করায় ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবি শিক্ষার্থীদের সরকারের পক্ষ থেকে কোটার নির্দেশনা ছিল না  ৭৯ উত্তর সঠিক হয়েও চান্স পাননি অনেকেই বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে গতকাল বুধবার দিনভর ভোগান্তি পোহায় রাজধানীবাসী। ৩৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারী পরীক্ষায় কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করে ফল প্রকাশ করায় শাহবাগ মোড়ে আন্দোলনে নামে বিক্ষুব্ধ চাকরি প্রার্থীরা। আন্দোলনের মুখে বিকালে প্রিলিমিনারী পরীক্ষার ফল স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে পিএসসি। পিএসসি ফলাফল পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দিলেও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে বিক্ষুব্ধরা। শাহবাগে সড়ক অবরোধের বিরূপ প্রভাব পড়ে রাজধানীর অন্যান্য এলাকার সড়কেও। পুরো রাজধানী জুড়ে ছিল যানজট। ভেঙ্গে পড়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও। কয়েকটি এলাকার সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে যানবাহন। এতে দুর্ভোগ পোহায় যাত্রীরা। বিসিএসসহ সরকারি সকল পরীক্ষায় কোটা পদ্ধতির সংস্কারসহ অন্য তিন দাবি আদায়ে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় আবারো শাহবাগে সড়ক অবরোধ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীরা। এজন্য ‘মেধা মূল্যায়ন মঞ্চ’ নামে একটি প্লাটফর্মও তৈরি করেছে আন্দোলনকারীরা। প্রার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল দুপুরেই বৈঠকে বসে পিএসসি সদস্যরা। বিকালে পিএসসি’র চেয়ারম্যান এ টি আহমেদুল হক চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত করা হয়েছে। প্রিলিমিনারীতেই কোটা পদ্ধতি অনুসরণের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রিলিমিনারী পরীক্ষায় সুর্নিদিষ্ট কোন নির্দেশনা না থাকলেও একেবারে নিজেদের ইচ্ছায় কোটা অনুসরণের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়েও অনেকে বাদ পড়েন এবং তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েও অনেকে উত্তীর্ণ হন বলে পরীক্ষার্থীরা দাবি করেন, যা স্বীকার করেন পিএসসি কর্মকর্তারাও। তবে কেন বা কি কারণে প্রিলিমিনারীতে কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়-সে বিষয়ে পিএসসির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে কিছু বলা হচ্ছে না। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুস সোবহান সিকদার জানান, সরকারের পক্ষ থেকে প্রিলিমিনারীতে কোটা সংরক্ষণের কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের কারণে রাজধানী প্রায় অচল হয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শাহবাগ মোড় বন্ধ থাকায় সকাল থেকে রূপসী বাংলা হোটেল, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মহাখালী, বনানী পর্যন্ত যানজট ছড়িয়ে পড়ে। বিকালের দিকে ফার্মগেট পর্যন্ত যানজট দেখা যায়। তবে সন্ধ্যার দিকে রাজধানীতে যানজট কমে আসে। গত সোমবার বিকালে ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। সাধারণ ক্যাডারের ৪৪২টি পদসহ মোট দুই হাজার ৫২টি পদে নিয়োগ দিতে গত ৭ ফেব্রুয়ারি ৩৪তম বিসিএসের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। দুই লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন প্রার্থী এই পরীক্ষার জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। গত ২৪ মে অনুষ্ঠিত প্রিলিমিনারী পরীক্ষায় এক লাখ ৯৫ হাজার পরীক্ষার্থী এতে অংশ নেন। গত সোমবার প্রকাশিত ফলাফলে ১২ হাজার ৩৩ জনকে উত্তীর্ণ হিসাবে ঘোষণা করে পিএসসি। উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটায়, পাঁচ ভাগ উপজাতি কোটায় এবং ১০ ভাগ নারী কোটায় নেয়া হয়। ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষার ফলাফল বাতিল করে পুনর্মূল্যায়নসহ চার দফা বাস্তবায়নের দাবিতে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শাহবাগে সড়ক অবরোধ করেন অনুত্তীর্ণ চাকরিপ্রার্থীরা। এর আগে বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে তারা শাহবাগে যান। পুলিশের দুই দফা বাধা পেরিয়ে তারা সড়ক অবরোধ করেন। পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিসিএস পরীক্ষায় ৫৫ ভাগই নিয়োগ দেয়া হয় কোটা পদ্ধতিতে। এতদিন প্রিলিমিনারী ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর কোটায় আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হত। কিন্তু এবার প্রিলিমিনারী পরীক্ষাতেই কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করায় হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী বঞ্চিত হওয়ার শংকা তৈরি হয়েছে। চাকরিপ্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন, এবার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি হলেও উত্তীর্ণ প্রার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। ৩৩তম বিসিএস-এর প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ২৮ হাজারের বেশি প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়। অথচ এবার বেশি সংখ্যক প্রার্থী হলেও উত্তীর্ণ করা হয়েছে ১২ হাজার ৩৩ জনকে। এটি অসত্ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে তরুণ-তরুণীরা অভিযোগ করেছেন। এদিকে কোটা পদ্ধতিতে আবেদনকারীদের উত্তীর্ণ করাতে পরীক্ষার কাট নম্বরেও (একটি নির্দিষ্ট নম্বর যার বেশি পেলে লিখিত পরীক্ষার জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়) তারতম্য ঘটনো হয়েছে বলে প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন। কোটায় আবেদনকারীরা ৫৮ থেকে ৬০ পেয়ে উত্তীর্ণ হলেও সাধারণ প্রার্থীরা ৭৬ থেকে ৭৯ পেয়েও উত্তীর্ণ হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ৩৪তম বিসিএস-এর দায়িত্বে থাকা পিএসসির সদস্য মুহম্মদ লিয়াকত আলী খান ইত্তেফাককে বলেন, মৌখিক পরীক্ষার পর কোটা ঠিক করতে গিয়ে দেখা যায় অনেক পদ শূন্য পড়ে থাকে। প্রার্থী থাকে না। সে কারণে এবার প্রিলিমিনারি পর্যায় থেকেই যে কোটায় যতগুলো পদ আছে তার বিপরীতে প্রার্থী নেয়া হয়েছে। তবে কোটাধারী এবং সাধারণ প্রার্থীদের কাট নম্বর একই রাখা হয় বলে তিনি দাবি করেন। গতকাল বিকালে পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আ ই ম নেছারউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘৩৪তম বিসিএস-এর প্রিলিমিনারির ফলাফল নিয়ে কিছু সংখ্যক প্রার্থীর মধ্যে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মকমিশন বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ ‘৩৪তম বিসিএস-এর গুণাগুণ, ২ লাখ মেধাবী খুন’ চার দফা বাস্তবায়নের দাবিতে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় শাহবাগে পাঁচ শতাধিক চাকরিপ্রার্থী শাহবাগে সড়ক অবরোধ শুরু করেন। এ সময় মত্স্য ভবন-শাহবাগ-কাটাবন-টিএসসি-রূপসীবাংলা সন্নিহিত সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর ১২টার মধ্যে কয়েক হাজার চাকরিপ্রার্থী শাহবাগে অবরোধে যোগ দেন। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার প্রিলিমিনারিতে কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করে দুই লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ১২ হাজার ৩৩ জনকে উত্তীর্ণ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তরুণ-তরুণীরা। তারা শ্লোগান তুলেন—‘৩৪তম বিসিএস-এর গুণাগুণ, ২ লাখ মেধাবী খুন’। এছাড়াও আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়—‘কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা নিপাত যাক; ছি, ছি, ছি, পিএসসি, এটা তুই করলি কী; মুক্তিযুদ্ধের বাংলায় দুই নীতির ঠাঁই নাই, শহীদদের রক্তস্নাত বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই; কোটা দিয়ে কামলা নয়, মেধা দিয়ে আমলা চাই’। বিকাল পৌনে ছয়টার দিকে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ৩৪তম বিসিএস-এর প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দেয়ায় পিএসসিকে অভিনন্দন জানান আন্দোলনরতরা। একইসাথে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত তারা সড়ক অবরোধ চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দেন। একই দাবিতে আজ সকাল ১১টায় তারা শাহবাগে সড়ক অবরোধ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আন্দোলনরতদের চার দাবি সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষিত চারটি দাবি হলো—৩৪তম বিসিএস-এর ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন, প্রিলিমিনারি পরীক্ষার সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর সরকারি কর্মকমিশনের ওয়েবসাইটে এবং দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ, প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কোটা পদ্ধতি বাতিল, বিসিএসসহ পিএসসির অধীনে থাকা সকল সরকারি চাকরির পরীক্ষাতে কোটার হার কমিয়ে আনা। সাংবাদিক সম্মেলনে আন্দোলনরত প্রার্থী শাহীন আলম বলেন, বিসিএস উত্তীর্ণ প্রার্থীরাই একদিন রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কিংবা প্রধানতম অঙ্গে পরিণত হন। তারা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে জাতির প্রতিনিধিত্ব করে। তাই তাদের যোগ্যতা কতটুকু উচ্চমানসম্পন্ন হওয়া উচিত তা বিবেকবান মানুষের কাছে সহজেই অনুমেয়। কিন্তু সম্প্রতি পিএসসির কিছু কর্মকাণ্ড আমাদের ব্যথিত করে তুলেছে। প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে কারা অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছেন তা ভেবে শংকিত না হয়ে পারি না। লিখিত বক্তব্যে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্ন এ যাবত্কালের সবচেয়ে নিম্নমানের প্রশ্ন। ৭৯ পেয়ে পাস না করায় আক্ষেপ বিক্ষোভে অংশ নেয়া আব্দুর রহিম, মফিজুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুন, শিমুল বলেন, আমাদের ৭৯টির বেশি সঠিক নম্বর ছিল। তবুও চান্স পায়নি। অথচ আমাদের কোটাধারী বন্ধু ৬০ পেয়েই পাস করেছে। এ বৈষম্য কেন? আন্দোলনে অনুত্তীর্ণ প্রার্থীদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন উত্তীর্ণ এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তানও অংশ নেন। তারা বলছেন, কোটার কারণে বৈষম্য তারাও চান না। এটি বিব্রতকর। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আজ এ বিষয়ে তারা রিট করতে পারে বলে জানিয়েছে।