বিসিএসে বিলুপ্ত হোক সকল বৈষম্য

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৩, ২১:১৩
৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই আস্তে আস্তে মানুষের মধ্যে একটি গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। এর মূল কারণ বৈষম্য। এই গুঞ্জনের ব্যাপ্তি এখন শাহবাগে পৌঁছেছে। চারিদিকে মিছিল, মিটিং আর আলোচনার ঝড় । চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি ৩৪তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। এতে ৪৪২টি সাধারণ ক্যাডারের পদসহ মোট দুই হাজার ৫২টি পদে নিয়োগের লক্ষ্যে গত ২৪ মে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই পরীক্ষায় অংশ নিতে অনলাইনে আবেদন করেছিল দুই লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন প্রার্থী। এর মধ্যে এক লাখ ৯৫ হাজার জন পরীক্ষার্থী প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন। পরীক্ষা গ্রহণের ৪৫ দিনের মাথায় গত সোমবার পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এতে পাস করেছেন মাত্র ১২ হাজার ৩৩ জন। উত্তীর্ণদের মধ্যে ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটায়, ৫ ভাগ উপজাতি কোটায় এবং ১০ ভাগ নারী কোটায় নেয়া হয়েছে। অতএব, মোট উত্তীর্ণদের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মুক্তিযোদ্ধা কোটায়, এক হাজার নারী কোটায় এবং পাঁচশ জন উপজাতি কোটায় এসেছেন। আগে মৌখিক পরীক্ষার পর কোটা পদ্ধতিতে বাছাই করা হলেও ৩৪তম বিসিএসেই প্রথমবারের মত প্রাথমিক বাছাইয়ের সময় কোটা পদ্ধতি কার্যকর করা হয়েছে। এর ফলে ৯০-এর কোটা পেরিয়ে গিয়ে অনেকেই উত্তীর্ণ হতে পারেননি, এমন দাবি উঠেছে অনুত্তীর্ণ প্রার্থীদের কাছ থেকে। উল্লেখ্য, পিএসসি কখনোই প্রাথমিক বাছাই প্রতিযোগিতায় প্রাপ্ত নম্বর প্রকাশ করে না। প্রার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর নিয়ে যে দাবি তা খালি চোখে দেখতে গেলে সম্পূর্ণরূপে প্রমাণ বহির্ভূত। অতএব, তাদের চ্যালেঞ্জ করার কোন পথ খোলা রাখা হয়নি। চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংযোজন বহু আগেই। আমাদের দেশে মোট আসনের শতকরা ৫৬ শতাংশ কোটার আওতাভুক্ত। এই ৫৬% কোটার বন্টন করা হয়েছে-মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩০%, নারী কোটায় ১০%, জেলা কোটায় ১০%, আদিবাসী কোটায় ৫%, প্রতিবন্ধী কোটায় ১%। অবশিষ্ট মাত্র ৪৪% মেধা কোটায় উত্তীর্ণ। উল্লেখিত কোটার অন্তর্ভুক্ত নন এমন প্রার্থীর সংখ্যাই বেশি। তাদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়। এর চাক্ষুষ প্রমাণ এবারের ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সেই ৪৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী। কারণ উত্তীর্ণের তালিকায় নাম তোলাটা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। জেলা কোটা যখন সংযোজন করা হয়েছিল তখন দেশে মাত্র ১৭টি জেলা ছিল। এখন বাংলাদেশে মোট ৬৫টি জেলা বিদ্যমান কিন্তু এখনো সেই পুরোনো নিয়মে জেলা কোটা চলছেই। আপত্তি আছে; আছে বিভিন্ন ধরনের বিপক্ষীয় যুক্তি। সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের নামই যখন বিভিন্ন কারণে মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে থাকে তখন মুক্তিযোদ্ধার কোটার সার্থক ব্যবহার প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পূর্বে এমন অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি আমলা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন যাদের অভিভাবক একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের যদি সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে দিতেই হয় তবে তা দিতে হত তাদের বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় থেকে অথবা এখনো যারা শিক্ষার্থী আছেন তাদের দিকে নজর দিতে হবে। কমপক্ষে স্নাতক পর্যন্ত সেই সব বঞ্ছিত মানুষদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা আমরা যখন করতে পারছি না, তখন এমন প্রহসনের প্রয়োজন কি? মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নতুন সংযোজিত হয়েছে তাদের নাতি-নাতনীরা। এমতাবস্থায় দেশের অন্যান্য জনগণের কাছে এই বিষয়টি খুব একটা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আরেকটি সংযোজিত বিষয় ‘বয়সসীমা’। অন্যান্য সাধারণ প্রার্থীদের আবেদনের বয়সসীমা ৩০ বছর আর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যারা আছেন তাদের ৩২ বছর। এটি চাকরির ক্ষেত্রে আরেকটি বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে। অপরদিকে অবসরপ্রাপ্ত চাকুরেদেরও বয়সসীমায় অনুরূপ সুবিধা দেয়া হয়েছে। জোর করে চাপিয়ে দিলে কোন জিনিস সত্যিকার অর্থে সফল হয় না। অন্তত চাকরি ক্ষেত্রকে সকল ধরনের বৈষম্যের আওতামুক্ত রাখা প্রয়োজন। শিক্ষা জীবনের সমাপ্তিলগ্নে মানুষ চাকরি নামক এই সোনার হরিণটির পেছনে ছোটে, এক নিশ্চিন্ত ভবিষ্যত্ গড়ার আশায়। অনেকটা পরিশ্রম করে তাদের এই পথ পাড়ি দিতে হয়। এর মধ্যে যদি এমন বিভিন্ন কোটা, বিভিন্ন বৈষম্যের বাঁধা এসে পড়ে তবে বহু যোগ্য প্রার্থী ঝড়ে পড়বে এ পথ থেকে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সৃষ্টি হোক একটি বৈষম্যমুক্ত পরিবেশ । যেখানে লড়াই হবে মেধার সাথে মেধার। সেখানে বিলুপ্ত হবে সকল বৈষম্যের; জয় হবে শুধুই মানুষের। লেখক :নবীন লেখক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন