ভিসির পদত্যাগ দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন দীর্ঘদিন যাবত্ অবরুদ্ধ রয়েছে। পত্র-পত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় এ সংক্রান্ত খবর প্রতিদিনই প্রকাশিত হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের কোন খবর চোখে পড়ে না; কাজেই সহসা এ অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না- এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি দেশের কতটা নাজুক ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই অচলাবস্থা। এ ব্যাপারে প্রশাসনের টনক নড়া জরুরি বলে আমরা মনে করি। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের অযৌক্তিক আচরণের ফলে দেশের একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে- এমনটা কারোরই কাম্য নয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির বর্তমান চালচিত্র একটু ভিন্নধর্মী বলে মনে হয়। কারণ ছাত্রদের চাইতে শিক্ষকদের কোন্দল ও অপ-রাজনীতিই এ পরিস্থিতির জন্য অধিক দায়ী।
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষারই ব্যবস্থা করে না; ছাত্রদের মাঝে ভবিষ্যত্ ব্যক্তি ও কর্মজীবনের নানা শৃঙ্খলা ও নিয়ম-নীতিরও শিক্ষাদান করে। ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত করে দেশ-মাতৃকার সেবায় নিয়োজিত করে তুলতে এ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা তাই অগ্রগণ্য। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সর্বশেষ স্তর। ফলে শিক্ষকরা জীবনের অর্জনগুলোর তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর চিন্তা-চেতনাকে প্রস্ফুটিত করে তুলেন। জাতির ভবিষ্যত্ কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার্থীকে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেন তাঁরা। শিক্ষা প্রদান ও গবেষণা শিক্ষকদের প্রধান দু’টি কাজ এবং লেখাপড়া ও জ্ঞানার্জন ছাত্রজীবনের প্রধান ব্রত। কাজেই শিক্ষকরা যদি সত্ ও আদর্শবান হন তাহলে শিক্ষার্থীরা তাঁদেরকে অনুসরণ করেন। কিন্তু শিক্ষকরা যদি অধিক রাজনীতিক হন এবং এর সঙ্গে ছাত্রদেরকেও জড়িয়ে ফেলেন তাহলে শিক্ষার্থীরা তাঁদেরকে আর আদর্শের ও অনুসরণের আসনে বসাতে চান না। ভিসি হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি এবং তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারি সকলের সাহায্য-সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তিনি সদা বদ্ধপরিকর। কিন্তু এই কর্তাব্যক্তি যদি অধিকাংশের গ্রহণযোগ্য না হন তাহলে সেখানে বিপত্তি ঘটতে বাধ্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে অন্তহীন অভিযোগ করে আসছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবাই তাঁর যোগদানের শুরু থেকেই। ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে দূরত্ব তৈরিতে তিনি যে ভূমিকা গ্রহণ করেছেন তা সকলেই জানেন। ভিসির বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাঁকে মেনে নিতে পারছেন না। ছাত্রলীগ দ্বারা শিক্ষক লাঞ্ছনার বিচার, গণমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে অশালীন ও আপত্তিকর বক্তব্য, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা, ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অশালীন বক্তব্য, সিন্ডিকেট সদস্যকে অপমান করাসহ বারোটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ এনে ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের পদত্যাগের একদফা দাবিতে আন্দোলন করছে শিক্ষক সমিতি। এসব জটিলতায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সকল কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে চরমভাবে। কিন্তু হতাশার কারণ হলো এ ব্যাপারে সরকার কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না। সরকারের ভূমিকা দেখে মনে হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তাঁদের কিছু করবার নেই। দলীয় আনুগত্যে নির্বাচিত ভিসির সকল দায় নিতে যেন সরকার সদা প্রস্তুত। কিন্তু এই অচলাবস্থা আর কতদিন? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কি এভাবেই কতিপয় শিক্ষকের কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে? সরকারের উচিত বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট নিরসনে সচেষ্ট হওয়া।
লেখক :সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
