খোশ আমদেদ মাহে রমজান

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৩, ২৩:২৭
আজ দ্বিতীয় রমজান ও প্রথম জুমআ। ব্যাপক উত্সাহ উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে পবিত্র রমজানুল মোবারক পালিত হচ্ছে। সর্বত্র একটি বেহেশিত আবহের শান্তির সমীরণ প্রবাহিত হচ্ছে। মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পরিবর্তে অমীয় শান্তির অনাবিল ফল্গুধারা অনুরণিত হচ্ছে। ঈমানদারগণ মন দিয়েছেন অধিক ইবাদত বন্দেগীতে। কেননা এ মাসে যে একটি নফল কাজ করবে সে একটি ফরজের সমতুল্য সওয়াব পাবে। আর যে একটি ফরজ কাজ করবে, সে ৭০টি ফরজ আদায় করার পূণ্য অর্জন করবে। সে হিসাবে কেউ এক টাকা দান করলে ৭০ টাকা টাকা দানের সওয়াব প্রাপ্ত হবেন। এটা হলো ধৈর্য্যের মাস আর ধৈর্য্যের প্রতিদান হলো জান্নাত। এই সিয়াম সাধনা নতুন কোন বিষয় নয়। সকল নবী রসূল ও তাদের অনুসারীদের ওপর এই সিয়াম বা রোজা পালন ফরজ ছিল। যেমন্ল আদম (আ.) যখন নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলেন এবং তারপর তাওবা করেছিলেন তখন ৩০ দিন পর্যন্ত তাঁর তওবা কবুল হয়নি। ৩০ দিন পর তাঁর তওবা কবুল হলে তার সন্তানদের ওপরে রোজা ফরজ করে দেয়া হয়। জির্র ইবনে হুবাইশ (রা.) বলেন, একদা আমি রসূল (স.)-এর বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবেন মাসউদকে (রা.) আইয়্যামে বীয (চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখকে আইয়্যামে বীয বলে) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা আদমকে (আ.) একটি ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু আদম (আ.) সেই ফল খেয়ে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসতে বাধ্য হন। সে সময় তার দেহের রং কালো হয়ে যায়। ফলে তাঁর এ দুর্দশা দেখে ফেরেশতাগণ কেঁদে কেঁদে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করলেন, হে আল্লাহ! আদম আপনার প্রিয় সৃষ্টি!! আপনি তাকে জান্নাতে স্থান দিয়েছিলেন, আমাদের দ্বারা তাকে সিজদাও করালেন, আর একটি মাত্র ভুলের জন্য তাঁর গায়ের রং কালো করে দিলেন? তাদের জবাবে আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-এর কাছে এ নির্দেশ পাঠালেন, তিনি যেন চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখেন। আদম (আ.) তা-ই করলেন। ফলে তাঁর দেহের রং আবার উজ্জ্বল হলো। এ জন্যই এ তিনটি দিনকে আইয়্যামে বীয বা উজ্জ্বল দিন বলে (গুনইয়াতুত ত্বা-লেবীন, বাংলা অনুবাদ ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা-২০৭)। মুয়াজ, ইবনে মাস’উদ, ইবনে আব্বাস, আতা, কাতাদাহ ও যাক্হাক (রা.) থেকে বর্ণিত নূহ (আ.)-এর যুগ থেকে প্রত্যেক মাসে তিনটি করে রোজা ছিল। পরিশেষে রমজানের এক মাস রোজা দ্বারা আল্লাহ তায়ালা তা রহিত করে দেন (তাফসীর ইবনে কাসীর ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ২১৪)। ইবনে কাসীরের (রহ.)-এ বর্ণনা প্রমাণ করে যে, নূহ (আ.)-এর যুগ থেকে মুহাম্মদ (স.)-এর যুগ পর্যন্ত রমজানের রোজা ফরজ হবার আগে কমপক্ষে তিনটি রোজা ফরজ ছিল। নূহ (আ.)-এর পরে নামকরা নবী ছিলেন ইবরাহীম (আ.)। ইবরাহীমের (আ.) যুগেও ৩০টি সিয়াম ছিল। ইবরাহীমের (আ.) পর কিতাবধারী প্রসিদ্ধ নবী মূসা (আ.)। তাঁর যুগেও রোজা ছিল। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (স.) মদীনায় হিজরত করে এসে ইহুদীদেরকে আশুরার দিনে (মহররম চাঁদের ১০ তারিখে) রোজা অবস্থায় পেলেন। তাই তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, আজকে তোমরা কিসের রোজা করছো? তারা বলল, এটা সেই মহান দিন যেদিনে আল্লাহতায়ালা মূসা (আ.) ও তার কওমকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফিরাউন ও তার জাতিকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ মূসা (আ.) ঐদিনে রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরা আজকে ঐ রোজা করছি। (বুখারী, মুসলিম, মেশকাত ১৮০ পৃষ্ঠা) ঈসা (আ.)-এর পর শেষ নবী মুহাম্মদ (স.)-এর যুগ। তার নবী হবার পূর্বে আরবের মুশরিকদের মধ্যেও সিয়ামের প্রচলন ছিল। দ্বিতীয় হিজরীর শাবান মাস হতে বর্তমান প্রচলিত এক মাস সিয়াম ফরজ সম্বলিত আয়াত নাযিল হয় এবং তার পরের মাস রমজান থেকে মুহাম্মদ (স.) ও তাঁর সাহাবীরা এটা আমল করা শুরু করেন। তাই আমরাও যেন রোজা পালনের মাধ্যমে গুনাহ মাফের এই পবিত্র মাসে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতার হস্ত সম্প্রসারিত করি এবং রমজানের শিক্ষা যথাযথভাবে বাস্তবাযনের চেষ্টায় ব্রতি হই। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দান করুন, আমীন।