আওয়ামী লীগে অসন্তোষ পরস্পরকে দুষছেন নেতারা

আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৩, ২২:৪২
খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেটের পর সর্বশেষ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর পরাজয়কে কেন্দ করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগে। গত পৌনে পাঁচ বছরে নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ও সাফল্য সত্ত্বেও প্রায় সারাদেশে সরকারের প্রতি মানুষের কেন এত ক্ষোভ, কেন অসন্তোষ- এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে সরকারের মন্ত্রী ও দলের শীর্ষ নেতারা একে অপরকে দোষারোপ করছেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ‘ভেদাভেদ’ ও ‘অন্তর্কোন্দল’ ভুলে ঐক্য জোরদার করতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার বিষয় শুধু নয়, পদ্মা সেতু নির্মাণসহ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের স্পর্শকাতর অনেক প্রতিশ্রুতিও পূরণ করতে না পারার ব্যর্থতার জন্যও পরস্পরের কাঁধে দোষ চাপানোর চেষ্টা করছেন মন্ত্রীদের অনেকে। তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, সরকারের মেয়াদ আর মাত্র সাড়ে তিন মাস। এখন পরস্পরকে দোষারোপ না করে বিগত পৌনে পাঁচ বছরের ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত করে সেগুলো শুধরানো জরুরি। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘যদিও গাজীপুরসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন, কিন্তু সেখানে জাতীয় ইস্যুর প্রভাব পড়েছে-এটা অস্বীকার করি না। এখন আমাদের উচিত নিজেদের ভুল-ত্রুটি শুধরে নেয়া।’ পদ্মার মূল সেতুর কাজ এখন পর্যন্ত শুরু করতে না পারার জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ‘অবাস্তব অবস্থান’কে দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল শুক্রবার তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর অবাস্তব অবস্থান সময়মতো পদ্মার মূল সেতুর কাজ শুরু করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল আশুলিয়ার নবীনগর-কালিয়াকৈর মহাসড়কের উন্নয়ন কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করার পর যোগাযোগমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়া ও চীন পদ্মা সেতু নির্মাণে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়ার একদিন না যেতেই অর্থমন্ত্রী বলে বসলেন-তাদের প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য, অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য জনগণকে হতাশ করেছে। এদিকে, গাজীপুরসহ পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের পরাজয়কে দল ও সরকারের জন্য ‘চরম ধাক্কা’ হিসেবে স্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। এজন্য যারা সরকারকে নানাভাবে ‘বিব্রত’ করছেন, তাদেরই অনেকাংশে দায়ী করেছেন। দায়ভার মাথায় নিয়ে তাদেরকে সরে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গতকাল ঢাকায় কেন্দ ীয় গ্রন্থাগার মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় নাসিম বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন আমাদের প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। ভুল-ত্রুটি শুধরাতে হবে। এখন আমরা কোন দিকে যাব, এ সিদ্ধান্ত আমাদেরকেই নিতে হবে, এটা চরম বাস্তব। সরকার ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায় সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ সিটিতে ভরাডুবি ও সরকারের জনপ্রিয়তা কমার কারণসমূহ চিহ্নিত করার কাজ চলছে। কীভাবে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ কমানো যায়-সেই উপায়ও খোঁজার চেষ্টা হচ্ছে। এনিয়ে একটি নিরপেক্ষ প্রতিবেদন তৈরির জন্য একজন উপদেষ্টাকে দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সূত্রমতে, এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। শেষ সময়ে হলেও প্রয়োজনে দল ও সরকারে পরিবর্তন আনার আভাসও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জানা গেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীও চিন্তিত। এজন্য বেলারুশ সফর সংক্ষিপ্ত করে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই তিনি দেশে ফিরেছেন। দেশে ফেরার পর গত তিনদিনে তিনি জ্যেষ্ঠ নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও নানা পর্যায়ে কথা বলেছেন, নিজস্ব উইংয়ের মাধ্যমেও এই পরিস্থিতির কারণ বোঝার চেষ্টা করছেন। কীভাবে এ অবস্থা কাটানো যায়, তা নিয়েও পরামর্শ করছেন ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী গত দু’দিন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। দলের বর্তমান ও প্রাক্তন এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গেও কথা বলছেন। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও উপদেষ্টাকে ভর্ত্সনা করেন। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য কোনো কোনো মন্ত্রী-উপদেষ্টার কর্মকাণ্ডকেও দায়ী করেন তিনি। বৃহস্পতিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও কেন্দ ীয় নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। একইদিন প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও সংস্থাপন উপদেষ্টা এইচটি ইমামের সঙ্গে। নানা কারণে সরকারের যে জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে তা অস্বীকার করছেন না আওয়ামী লীগের নেতারাও। তাদের মতে, হেফাজত ইস্যুকে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছে। মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশে অভিযান সম্পর্কে জনমনে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় সরকারি দলের লোকজন তা সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি। এছাড়া সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দলাদলি, ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মকাণ্ড এবং তৃণমূল পর্যায়ে দলের লোকজনের বাড়াবাড়ি মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে। মহাজোট ও ১৪ দল শরিকদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করার প্রভাবও পড়েছে পাঁচ সিটির নির্বাচনে। পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় ও উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এই পরাজয় নেতা-কর্মীদের মনোবলে ধাক্কা দিলেও তা ‘শাপে বর’ হয়েছে। দলের সবাইকে ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে এগিয়ে যেতে হবে। তার দাবি, আওয়ামী লীগ জানে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। মোহাম্মদ নাসিমও বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে হাতে সময় খুবই কম। এর মধ্যেই নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করতে হবে, জনঅসন্তোষ কাটানোর চেষ্টা করতে হবে।