আজ তৃতীয় রমজান। সর্বত্র রমজানুল মোবারকের একটি পবিত্র আবহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তারাবীহ ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামায়াতে মসজিদগুলো পরিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। অধিক ইবাদত-বন্দেগী, জিকির-আজকার, দান-সদকা, কুরআন তেলাওয়াত ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ঈমানদার রোজাদারগণ এগিয়ে যাচ্ছেন। এই রোজা পালন ঈমানদার বেহেশেতর নিকটবর্তী করে এবং দোযখ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যেমন রসূল (স.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য একদিন রোজা রাখে আল্লাহতায়ালা তাঁর ও জাহান্নামের মাঝে একটি গর্ত তৈরি করে দেন। যা আসমান ও জমিনের মাঝের দূরত্বের সমান (তিরমিজি-১৬২৪ মেশকাত)। আবূ হুরায়রাহ (রা.)-এর বর্ণনায় রসূলুল্লাহ (স.) বলেনঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এবং এক জুম’আ থেকে অন্য জুম‘আ আর এক রমজান থেকে অন্য রমজান-এর মধ্যবর্তী পাপের প্রতিশেধক হয়ে যায়, যখন বড় বড় পাপ থেকে সে বিরত থাকে (মুসলিম, সহীহুত তারগীব ওয়া আত তারহীব, ১ম খণ্ড, ৪৮৮ পৃঃ হাদীস নং-৯৮০)। আমর ইবনে মুর্রাহ আলজুহানী (রা.) বলেন, একজন লোক নবী (স.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল (স.)! আপনার নির্দেশ কি? আমি যদি এই সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই এবং আপনি আল্লাহর রসূল। আর আমি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি ও যাকাত প্রদান করি এবং রমজানের রোজা রাখি ও সেই রাতে (তারাবীহ) সালাতে দাঁড়াই তাহলে আমি কাদের মধ্যে গণ্য হতে পারি? তিনি বললেন, তুমি সিদ্দিক ও শহীদদের মধ্যে গণ্য হতে পারবে (সহীহ ইবনে হিব্বান, সহীহুত তারগীব ওয়া আত তারহীব, ১ম খণ্ড, ৪৯১ পৃঃ, হাদীস নং-৯৮৯)।
সাহল ইবনে সা‘দ (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেনঃ জান্নাতে আটটি দরজা রয়েছে, তার মধ্যে একটি দরজার নাম ‘রাইয়ান’। তার মধ্যে রোজাদার ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করবে না (বুখারী ৩২৫৭, মুসলিম ১১৫২, তাহকীকে মেশকাত ১৯৫৭)। আর এক বর্ণনায় তিনি (স.) বদ দু‘আ দিয়ে বলেন, সে ব্যক্তির নাক মাটিতে মিশে যাক, যে রমজান পেল অথচ নিজেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত করে নিতে পারল না (তিরমিযী, মেশকাত, ৮৬ পৃষ্ঠা)। অন্য বর্ণনায় আছে, জিব্রাঈল (আ.) তার ঐ বদ দু‘আতে আমীন! আমীন! বলেছিলেন (ইবনে খুযাইমাহ, ৩য় খন্ড, ১৯২ পৃষ্ঠা)।
রমজানুল মোবারকের কারণে জান্নাতকে সারা বছরের জন্য সাজানো হয় এবং রমজানের প্রথম রাতে আরশ থেকে এক মনোরম বাতাস প্রবাহিত হয় যা জান্নাতের গাছের পাতাগুলো ছুঁয়ে যায়। ফলে এক সুমধুর ও মিষ্টি আওয়াজ সৃষ্টি হয়। তখন জান্নাতের হুরেরা ফরিয়াদ করে যে, এমন কেউ আছে কি, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আমাদের দরখাস্ত পেশ করবে? রমজানের প্রত্যেক রাতে এক আহ্বানকারী এ আহ্বান করে— কোন প্রার্থনাকারী আছে কি? যার তাওবা তিনি (আল্লাহ) কবুল করবেন? কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? যাকে তিনি ক্ষমা করে দেবেন? এমন কেউ আছে কি যে, সেই আল্লাহকে ঋণ দেবেন যিনি কাঙ্গাল নন, কৃপণ নন বরং পুরোপুরি দাতা এবং অধিক দাতা (ইবনে হিব্বান)।
প্রথমত. রমজান মাসের প্রথম রাত যখন আসে তখন আল্লাহ তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। আর যার ওপর তার দৃষ্টি পড়ে তাঁকে তিনি কখনো শাস্তি দেবেন না। দ্বিতীয়ত. তাদের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের সুবাসের চেয়েও সুগন্ধময়। তৃতীয়ত. ফেরেশ্তারা তাদের জন্য প্রত্যেক দিন ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। চতুর্থত. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জান্নাতকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, তুমি আমার বান্দাদের জন্য তৈরি হও এবং সজ্জিত হও। অতিশীঘ্রই তাঁরা দুনিয়ার ক্লান্তি থেকে আমার ঘরে ও আমার সম্মানে স্বস্তি চাইবে। পঞ্চমত. যখন শেষ রাত আসে তখন তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। একজন লোক জিজ্ঞেস করল, এটা কি ক্বদরের রাত? তিনি বললেন, না। তুমি কি মজদুরকে দেখনি যে, তারা যখন কাজ থেকে অবসর পায়, তখন তাদের মজুরি পুরোপুরি প্রদান করা হয় (বাইহাকীর শুআবুল ঈমান, কানযুল উম্মা-ল ৩০২ পৃষ্ঠা)।
মূলতঃ রমজান মাস হলো সওয়াব হাছিল ও গুনাহ থেকে পরিত্রাণ লাভের মাস। জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃতি লাভের মাস। আমরা যারা এ মাসটি পেয়ে রোজা পালন করছি তাঁরা বড়ই সৌভাগ্যবান। তাই এ মাসে সকল দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আল্লাহতা’য়ালার নির্দেশের কাছে মস্তক অবনত করে গভীর সেজদায় লুটিয়ে পড়ি ও আল্লাহর রিজামন্দি হাসিলের চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দান করুন, আমীন।
ই-মেইল ঃ [email protected]
