মাদকাসক্তি থেকে যুব সমাজকে বাঁচাতে হবে

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০১৮, ২২:০৯

মাদকাসক্তি! যাকে বলা হয় সকল সন্ত্রাস ও অপরাধের জনক। একজন মানুষ যখন অন্ধকারের ভুবনে পা বাড়ায় তখন সে প্রথম সিঁড়ির যে ধাপটিতে পা রাখে তা মাদকদ্রব্য। এই মাদকদ্রব্য তাকে টেনে নেয়, উত্সাহিত করে পরবর্তী ধাপগুলো পেরিয়ে যেতে। ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে বাংলাদেশের মাদক ব্যবসা ও প্রাপ্তির সহজলভ্যতা বেশি এবং বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এদিকে ঝুঁকেছেও বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ড্রাগ হলো এমন বস্তু যা গ্রহণ করলে ব্যক্তির এক বা একাধিক কার্যকলাপের পরিবর্তন ঘটায়। একটা ড্রাগের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে তার রাসায়নিক গঠন বৈশিষ্ট্যের উপর। এই ড্রাগ অপব্যবহারের কারণে রোগী তার রোগের জন্য ওষুধের গুণাগুণ পাওয়ার বদলে হয়ে যায় বিষ। তাই অনেক সময় বিষ স্বল্প মাত্রায় প্রয়োগ করলে হয় ওষুধ, কিন্তু বেশি মাত্রা বা অযথা গ্রহণ করলে হয় বিষাক্ত যা শরীরকে নিস্তেজ করে, মৃত্যু ডেকে আনে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অপব্যবহারের মাধ্যমে মাদকাসক্তির সূচনা হয়। অপব্যবহার থেকে অভ্যাস, অভ্যাস থেকে আসক্তি। বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে  জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ, ১৬ ভাগ নারী। সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে নারী ও শিশু-কিশোররাও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

এটা সহজেই  অনুমান করা যায় যে, দেশে মাদকাসক্তির কারণে যুব সমাজের জীবন শুধু বিপন্ন হয় না, এতে গোটা পরিবার বা সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া ইনজেকশন-এর মাধ্যমে মাদক গ্রহণের কারণে দেশে এইডস আক্রান্তের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রশ্ন জাগে, যে ছেলে বা মেয়েটিকে বাবা-মা জন্ম থেকে তিলে তিলে আদর ভালোবাসা দিয়ে তাকে মানুষ করে তুলেছেন সে কিভাবে তার বুকে ছুরি বসায়। হত্যা করতে দ্বিধা করে না বাবা আর মাকে কিংবা যে ছেলেটি আজ বাবা-মায়ের মাথার ঘাম পায়ে ফেলানোর কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে নামকরা একটি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে সে কেন আজ মাদকাসক্ত?

সন্তানকে তার বাবা-মা একমাত্র সম্বল সেই জমি বিক্রির টাকা দিয়ে একটি কারণে শহরে পড়তে পাঠান— ছেলেটা যেন পড়াশোনা শেষ করে মানুষের মত  মানুষ হয়। কিন্তু সেই সব বাপ-মায়ের ছেলে-মেয়েদের এহেন কাণ্ডকীর্তি কি মানুষের পর্যায়ে পড়ে? কি কারণে আজ এই তরুণ বয়সের ছেলে-মেয়েরা অমানুষ হয়ে যাচ্ছে। উত্তরটা সহজ আর তা হচ্ছে মাদক গ্রহণ থেকে মাদকাসক্তি।

পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে, দিন দিন ইয়াবা আসক্তদের সংখ্যা অস্বাভাবিকহারে বাড়ছে। আসক্ত তরুণ-তরুণীরা অধিকাংশ উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সর্বাপেক্ষা কার্যকর উপায় হচ্ছে মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা। মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা, মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, বেকারদের কর্মসংস্থান ও স্কুল কলেজে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে  শিক্ষা প্রদান এবং মাদকাসক্তদের চিকিত্সার ব্যবস্থা করা।

মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তি স্বভাবতই চিকিত্সা নিতে চায় না। কারণ সে বুঝতেই পারে না যে, তার চিকিত্সার প্রয়োজন। আবার অনেকেই শারীরিক যন্ত্রণার ভয়ে মাদক চিকিত্সায় অনীহা পোষণ করে। বাবা-মাকে তাদের সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করতে হবে যাতে সে বুঝতে পারে যে, আমরা তাকে ভালোবাসি, তার সুন্দর ও সুস্থ জীবনের জন্য আমরা সহযোগিতা করতে চাই। বেশিরভাগ মাদকাসক্তির Relapse হয় পরিবারের বৈরী এবং সন্দেহমূলক আচরণের কারণে। মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তিকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে না পারলে যে কোনো সময় তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।

তাই সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই, আমাদের এই সচেতনতা এবং সহযোগিতা  যুব সমাজকে যুবশক্তিতে পরিণত করবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মাদক কি আমাদের সমাজে তাহলে সকল পরিবারেই ঢুকে পড়ছে? নাকি আমরা আমাদের সন্তানদের সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারছি না? এই  দায়ভার কারা নেবে? পরিবার, সমাজ না দেশ?

আসুন না, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা সবাই এক হই, অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে আমরা সবাই দল, মত, ধর্ম, বর্ণ  নির্বিশেষে সবাই হাতে হাত ধরে কাজ করি।

n লেখক :অধ্যাপক, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি-মানস, সদস্য,  জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড   

E-mail: [email protected]