অজানাকে জানার আগ্রহটা ছিল অনেক। অনেক তুচ্ছ ব্যাপারও চলে আসত তার চিন্তার গণ্ডিতে। এই জানার স্পৃহাই তাকে নিয়ে আসে সফলতার দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেভাল আর্কিটেক্ট অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক শারমিন শবনমকে নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
উচ্চমাধ্যমিক থেকেই মূলত পড়াশোনার প্রতি আগ্রহটা জন্মাতে থাকে। আর এই আগ্রহ এবং নতুন কিছু জানবার স্পৃহাই এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত ফল। পরবর্তীতে বুয়েটে পড়বার ইচ্ছা থেকেই ভর্তি পরীক্ষা দেন এবং টিকেও যান। এখনকার মতো ওই সময়টাতেও ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বা কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টগুলো তুমুল জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু মেধাতালিকার শীর্ষে না থাকার দরুণ পরের দিকের বিভাগগুলোর দিকে মনোনিবেশ করেন। বাংলাদেশের জাহাজ শিল্পের উদীয়মান ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নেভাল আর্কিটেকচার ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টকেই বেছে নেন। প্রথম দিকে একটু ভয় কাজ করছিল কারণ সে সময় এই বিষয়ে অধ্যয়নরত মেয়েদের সংখ্যা খুব কম ছিল। এ ছাড়াও, নেভাল আর্কিটেকচারের উপর বাস্তব কোনো ধারণা না থাকায় একটু সংশয়ে ছিলেন যে ভালো করতে পারবেন কি না। কিন্তু ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু করার পর থেকেই তার সব সংশয় দূর হয়ে যায়। প্রথম বর্ষ থেকেই নেভাল আর্কিটেকচার বিষয়টির প্রতি দারুণ আগ্রহ জন্মাতে থাকে। মূলত পড়াশোনার মাঝে আনন্দ খুঁজে নিতে পারাটাই মুখ্য, ভালো ফলাফল তাতে বাড়তি পাওনা হিসেবেই চলে আসে। পাস করার পর জাহাজ নকশা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ করার জন্য যোগ দেন একটি বেসরকারি ডিজাইন ফার্মে। সেখানে ৮ মাস কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে জাহাজের নকশা প্রণয়ন, কাঠামো এবং কারিগরি দিক সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা নিতে সহায়তা করেছে। ডিপার্টমেন্টে প্রভাষক নিয়োগের সার্কুলার দেওয়ার পর আবেদন করেন এবং ভালো ফলাফল থাকায় ইন্টারভিউ বৈতরণী পার হয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন শিক্ষক হিসেবে। বর্তমানে শিক্ষকতার পাশাপাশি এই বিভাগেই মাস্টার্সে অধ্যয়নরত আছেন। বলছিলাম এই প্রজন্মের মেধাবী জন শারমিন শবনম সম্পর্কে।
শারমিন শবনমের জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় কেটেছে বাংলাদেশের অনেকগুলো জেলায় ঘুরে। শহরের ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলা মায়াবী মফস্বলেই অতিবাহিত করেছেন শৈশব ও কৈশোরের বর্ণিল দিনগুলো। খেলাধুলা জীবনের একটা বড় অংশ হয়েছিল, যেটা তাকে সাহায্য করেছে এই পৃথিবীটাকে আরও বড় পরিসরে উপলব্ধি করতে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন। মা পুরোদস্তুর গৃহিণী, নিজের সবটুকু সময়ই ঢেলে দিয়েছেন পরিবার ও সন্তানের দেখাশোনার কাজে। ছোট বোন পড়ছে শাহজালাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে, ছোট ভাই নটরডেমে পড়ছে।
নিজের কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে শারমিন শবনম বলেন, ‘আগেকার দিনে মনে করা হতো শিক্ষকতা পেশা হিসেবে নিরস এবং বৈচিত্র্যহীন। কিন্তু যুগ পাল্টেছে, যুগের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে শিক্ষকতা পেশাকেও এখন আধুনিক হতে হয়েছে। যেকোনো কাজই আন্তরিকতার সাথে করলে কাজটি যেমন সুচারুরূপে সম্পন্ন করা যায় তেমনি তা উপভোগ্যও হয়। আমি চেষ্টা করি নিজের পড়াশোনায়, ডিপার্টমেন্টের উন্নয়নে এবং একজন শিক্ষক হিসেবে ক্লাসরুমে নিজের শতভাগটা দিতে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের গ্র্যাজুয়েটরা যেন সুশিক্ষিত এবং সুদক্ষ নেভাল আর্কিটেক্ট হিসেবে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।’
সবশষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন ভালোভাবে মাস্টার্স শেষ করে বাইরের নামকরা কোনোও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করা। এরপর দেশে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় থেকেই বহুদূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। জাহাজ নির্মাণ শিল্প নিয়ে গবেষণা কাজে আত্মনিয়োগ করার পাশাপাশি জনকল্যাণে এবং দেশের মঙ্গলের জন্য কিছু করাই তার আজীবনের স্বপ্ন।
