আশা ছিলো সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হবে

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৩, ২২:৫৮
৫টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরেও জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের বয়স ও অসুস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে ৯০ বছরের সাজা দেয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে যারা এতদিন ন্যায় বিচারের আশায় ছিলেন তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ তাদের সকলেরই আশা ছিলো- গোলাম আযমের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হবে। এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমীর সভাপতি প্রফেসর এমিরেটরস আনিসুজ্জামান বলেন, বিচারকরা তাদের প্রজ্ঞা দিয়ে রায় দিয়েছেন। এটাই আমি সুবিচার বলে মেনে নিয়েছি। কারণ, আমিতো বিচার চেয়েছি, শাস্তি নির্দিষ্ট করে দাবি করিনি। আর রায়ের ফলে গোলাম আযম অপরাধী বলে প্রমাণিত হয়েছে। এতে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকে ভয় করছে, আগামীতে কোন সরকার এসে গোলাম আযমের দণ্ড মওকুফ করে দিতে পারে; কিন্তু আমি এতে মোটেও বিচলিত নই। কারণ, গোলাম আযম যে অপরাধী এটা প্রমাণ হয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গোলাম আযমের মতো গণহত্যার সংঘটকের প্রাণদণ্ডাদেশ প্রত্যাশিত ছিল; কিন্তু এত দীর্ঘ সময়ের কারাদণ্ডও চরম শাস্তিই। তিনি তো আর নব্বই বছর বাঁচবেন না। তবে এ রায়ের ফলে তিনি বেঁচে থাকার একটি সুযোগ পেলেন সেটাও সত্য। প্রাণদণ্ডাদেশ হলে সেটি কার্যকর করে তাকে অপরাধের জন্য প্রাপ্য শাস্তি দেয়া সহজ ছিল। গোলাম আযমসহ দেশের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি দিয়ে আমরা এটা নিশ্চিত করতে পারছি যে, এ ধরনের গুরুতর অপরাধ সংঘটনে ভবিষ্যতে আর কেউ সাহস করতে পারবে না। এভাবে একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছি। সামগ্রিকভাবে দেশের জন্য এর ফলাফল ইতিবাচক হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, আমরা এ রায়ের জন্য দীর্ঘ চার দশক অপেক্ষা করেছি। দেশবাসী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ এতদিন ধরে যে রায় শোনার অপেক্ষায় ছিল, আদালত কিন্তু সেই রায়টি দিয়েছে। রায়ে আদালত বলেছে, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনীত প্রতিটি অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তিনি সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য। তবে বয়স ও অসুস্থতার কারণে সর্বোচ্চ সাজা কমিয়ে ৯০ বছর দেয়া হলো। আমি মনে করি, এই সাজাও কম নয়। হয়ত খানিকটা হতাশ যে মৃত্যুদণ্ড এখনই দেয়া যাচ্ছে না। তবে ক্ষুব্ধ বা সম্পূর্ণ হতাশ একথা আমি বলব না। কারণ এই রায়ের পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। তিনি বলেন, জামায়াত ইসলাম একটি অপরাধী সংগঠন। এই অপরাধী সংগঠনের দেশে রাজনীতি করা, ভোটাধিকার ও নির্বাচনে যাওয়ার অধিকার থাকতে পারে কি না, এটা সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিবেচনা করতে হবে। কারণ একটি অপরাধী সংগঠনকে যদি আমরা রাজনীতি করার সুযোগ দিই, তাহলে বাংলাদেশের সমস্ত সন্ত্রাসী সংগঠনকে রাজনীতি করতে দিতে হবে এবং তখন তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করা যাবে না। মুনতাসীর মামুন বলেন, জামায়াতের এই নেতৃত্ব যদি থাকে তাহলে তারা তরুণদের বিপথগামী করবে। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, সরকারকে বার বার বলেছি, জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা করতে। ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধে কিন্তু সরকার কোন মামলা করেনি। সরকারকে আরো বলেছিলাম যেন রাষ্ট্রপতি কোন যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড মওকুফ করতে না পারে এ ব্যাপারে আইন প্রণয়ন করতে; কিন্তু সরকার সেটাও করেনি। এটা সরকারের ব্যর্থতা বলেই মনে করি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, আমরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। মুক্তিযুদ্ধের পর ৪০ বছর ধরে যে মানুষগুলো বিচারের অপেক্ষায় ছিল, তারা আজ ন্যায় বিচার পেল না। গোলাম আযমের বয়স ও অসুস্থতার বিষয়গুলো বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, সেটা উচিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের উচিত, গোলাম আযমের মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করে উচ্চ আদালতে আবেদন করা। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, গোলাম আযম যে স্বাধীনতা বিরোধী অপরাধ করেছেন, সেটা এত দিন ঐতিহাসিকভাবে সত্য ছিল; কিন্তু আজ সেটি আইনগতভাবে সত্যে পরিণত হলো। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে একটি সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, জামায়াত ইসলাম একটি দোষী সংগঠন। এই সংগঠনের প্রধান হিসেবে গোলাম আযম গণহত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রত্যাশা ছিল সর্বোচ্চ শাস্তির; কিন্তু তাকে যেহেতু সর্বোচ্চ সাজা দেয়া হলো না সেজন্য আমাদের মনে দু:খ, ক্ষোভ, কষ্ট ও হতাশা কাজ করছে। সেটি না হওয়ায় দেশের সিংহভাগ মানুষের মতো আমিও হতাশ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর যে বিভিন্ন বাহিনী পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করেছে, তার তত্ত্বাবধানে ছিলেন গোলাম আযম। বয়সের কথা বিবেচনা করে তাকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়েছে। এটা কোনভাবেই গ্রহণ করতে পারি না। তিনি বলেন, আমি বিষণ্ন এ কারণে, যে মানুষটির কারণে এদেশের লাখ লাখ মানুষকে জীবন ও অসংখ্য মা-বোনকে ধর্ষিত হতে হয়েছে। তার কমান্ড রেসপনসিবিলিটির (নেতৃত্বের দায়) জন্য তার ফাঁসি হওয়া উচিত ছিলো। শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী বলেন, ৪২ বছর ধরে আমরা অপেক্ষা করেছি। যার কথায় গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ হলো, সেই ব্যক্তির ফাঁসি হলো না। এটি বড়ই হতাশার। এদিকে বিশিষ্ট নাগরিকরা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক-জঙ্গিবাদ বিরোধী মঞ্চ, সমাজবাদী ছাত্রজোট, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, বিপ্লবী ছাত্র সংহতি, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা।