পরিকল্পনায় অগ্রজ

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৩, ২১:১২
আমাদের দেশের স্বকীয় সংগীতধারার অন্যতম পুরোধা ধরা হয় তাকে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এ দেশে ব্যান্ড সংগীতের যে নতুন ধারা তৈরি হয়েছিল, সেই ধারার সৃষ্টিশীল নির্মাণেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক। আর অজস্র জনপ্রিয় গানের সুরস্রষ্টা এবং ব্যান্ড মিউজিকের এই প্রবাদপ্রতিম মানুষটিই হলেন নকীব খান। আধুনিক ও ব্যান্ড সংগীতের এ সিরিয়াস সুরকার ও শিল্পী গানের পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল ফুড প্রডাক্টস কোম্পানি নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেডের সাপ্লাই চেইন ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন দীর্ঘ দিন। সেই ধারাবাহিকতায় একজন সফল স্ট্র্যাটেজি প্ল্যানার হিসেবে আমাদের এবারের সংখ্যায় কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন রিয়াদ খন্দকার এ পেশায় আপনার শুরুর গল্পটা জানতে চাই। চাকরি করব এমন ইচ্ছা কখনোই ছিল না। একসময় ইচ্ছে ছিল স্থাপত্যবিদ হবো, পরে আবার ভেবেছি মিউজিশিয়ান হবো। কিন্তু আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের জন্য মিউজিককে পেশা হিসেবে নিতে পারিনি। তাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে একসময় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার আশায় একটা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মে কাজ করি কিছু সময়। কিন্তু বুঝতে পারলাম চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং আমার দ্বারা হবে না। সে সময়টাতে (১৯৮৮ সালে) আবার ফিলিপস বাংলাদেশ থেকে কাজ করার প্রস্তাব এল। তখন সেখানে কাজ শুরু করি। কিন্তু কয়েক বছর ফিলিপসে কাজ করার পর তা যখন বিক্রি হয়ে যায় তখন বিওসি বাংলাদেশে জয়েন করি এবং ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিন বছর কাজ করি। ১৯৯৫ সালে নেসলে বাংলাদেশে জয়েন করি ফাইন্যান্স বিভাগে। ১৯৯৯ সালে সাপ্লাই চেইন ডেভেলপমেন্টের দায়িত্ব হাতে পাই। ২০১১ সাল পর্যন্ত সেখানে সাপ্লাই চেইনের প্রধান ছিলাম। তারপর ২০১২ থেকে কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্সের ডিরেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করি। এখন পর্যন্ত এই কোম্পানিতেই আছি। আমাদের দেশে এত পেশা থাকতে আপনি কেন এই পেশাটা বেছে নিলেন? গ্লোবালি এই পেশাটার গুরুত্ব অনেক বেশি। আর আমাদের দেশে অন্য সব দেশ থেকে এর গুরুত্ব একটু বেশিই বলে আমার মনে হয়। আমি যখন এ পেশাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলাম, তখন এ পেশাটা আমাদের দেশে সম্পূর্ণ নতুন ছিল। তখন এখানে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট আমি উন্নত করেছি। যদিও তখন থেকে এ সময় পর্যন্ত কয়েকটা বছর কেটেছে তবুও বলব, এখনো আমাদের দেশে এ পেশাটা নতুনের মতোই আছে। সেজন্য এ জায়গাটাতে কাজের স্কোপ অনেক বেশি পাওয়া যায়। এখানে চ্যালেঞ্জটাও অনেক বেশি। সৃষ্টিশীল এ পেশাতে নিজের চিন্তা চেতনাকেও কাজে লাগানোর যথেষ্ট সুযোগ আছে। এ সবকিছু মিলিয়ে আমি এই পেশাতে নিজেকে যুক্ত করি। সফলতার পাশাপাশি এই পেশায় কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন? এই পেশায় কাজ করে আমি অনেক সফলতা অর্জন করেছি। বাংলাদেশে এ পেশার পরিধি ব্যাপকভাবে ছিল না। এর ব্যাপকতার ক্ষেত্রে আমার একটা বড় অবদান আছে। সেই দিক থেকে নিজের কাজের ক্ষেত্রে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারি। আমি মনে করি, কোনো ভালো কাজের সফলতাই ব্যক্তিকে স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে। এই প্রজন্মের কাছে এই পেশার চাহিদা কতটুকু বলে আপনি মনে করেন? এই প্রজন্ম এ পেশা সম্পর্কে কতটা ধারণা রাখে আমি জানি না। আন্তর্জাতিকভাবে এর গুরুত্ব বাড়ছে এবং বাড়বে। তাই আমার মনে হয়, নতুন প্রজন্ম এই গুরুত্ব বাড়ার সাথে সাথে এই পেশার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। তবে আমি যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই তখন তাদের আগ্রহ দেখেছি। তারা এ পেশা নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করতে চায়, যা এই পেশার প্রতি তাদের আগ্রহের একটা প্রতিচ্ছবি। দ্রুত সম্প্রসারণশীল সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। কোনো কোম্পানি যদি সফলভাবে তাদের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট করতে পারে তাহলে তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে আমি মনে করি। এই পেশায় আগত নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? এখন যারা কাজ করছে তারা অনেক বেশি টেকনোলজি গ্রহণ করছে। এটা খুবই ভালো। কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে, সৃষ্টিশীলতা নিজ থেকে তৈরি করতে হবে এবং তথ্যপ্রযুক্তি তাকে সাপোর্ট দিবে। কিন্তু শুধু টেকনোলজির সুবিধা বেশি নিতে গিয়ে নিজের সৃষ্টিশীলতাকে নষ্ট করা যাবে না। তবে আমি যা দেখেছি নতুনরা খুবই বুদ্ধিমান। তারা ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদিকে ব্যবহার করে অনেক অ্যাডভান্স কাজ করে। যা এই পেশার জন্য খুবই কল্যাণকর। তবে এর পাশাপাশি দেখা যায় অনেকের জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ কম। এজন্য বেশি বেশি বই পড়তে হবে। ব্যবহারিক জ্ঞান আহরণ করে তা ব্যবসায় কাজে লাগাতে হবে। নতুন যারা সংক্ষিপ্ত রাস্তা ধরে এই পেশায় সাফল্য অর্জন করতে চায় তাদের উদ্দ্যেশ্যে একটা কথা বলব, জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই এবং অনেক পড়াশোনা ছাড়া এ পেশায় সফলতার কোনো সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই। যেহেতু এই প্রজন্ম আগামীতে এ দেশের নেতৃত্ব দেবে এবং একুশ শতকের চ্যালেঞ্জটা তাদেরই মোকাবিলা করতে হবে তাই তাদের প্রতি আমার পরামর্শ রইল জ্ঞান অর্জন এবং টেকনোলজির সুবিধা গ্রহণ করে তাদের প্রকৃত সমন্বয় ঘটাতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে। আপনার শৈশব, কৈশোর এবং পরিবারের কথা জানতে চাই। আমার শৈশব, কৈশোর কাটে চট্টগ্রামে। শৈশবে বন্ুদের সাথে স্কুল শেষে খেলতে যাওয়া, দৌড়ঝাঁপ ইত্যাদিই ছিল উল্লেখযোগ্য বিষয় সে সময়ে আমাদের কাছে। আর কৈশোর কেটেছে সংগীত নিয়ে। যখন এসএসসি পরীক্ষা দিলাম, তখন সোলসের সাথে যোগ দিই। তারপর যখন কলেজে উঠলাম তখন সোলস অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠে। মূলত সেই সময়টাতে গান নিয়েই কাটাতাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে গ্র্যাজুয়েশন করার পর ঢাকায় চলে আসি। ১৯৮৫ সালে রেনেসাঁ ফর্ম করি। তখন থেকেই মিউজিকটা আমার ভাবনার বড় একটা জায়গা দখল করে। তবে সেটা ফ্যাশনের মতোই। আর আমার পরিবারে আমার স্ত্রী নুসরাত, এক মেয়ে ফাবিহা খান এবং এক ছেলে জারিফ খান আছে। আমার মেয়েটা ও-লেভেলে পড়ছে। এ ছাড়াও সে ছায়ানটে গান শিখছে। আমার অ্যালবাম ‘বৃষ্টির রাত’-এ তার সাথে আমার একটি দ্বৈত গানও আছে। আর আমার ছেলে একটা স্কুলে পড়াশোনা করছে। এবার ফাহমিদা নবীর ‘ইচ্ছে হয়’ অ্যালবামের সব কটি গানের সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন আপনি ও আপনার ভাই পিলু খান। এবারই প্রথম আপনারা ব্যান্ডের বাইরে একই শিল্পীর পুরো অ্যালবামের গানের সুর করেছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাই এক সপ্তাহের সিদ্ধান্তে অ্যালবামটির কাজ করা। ফাহমিদা নবীর প্রথম অ্যালবামেরও সব ক’টি গানের সুর করেছিলাম। ওই অ্যালবামের নাম তুমি ‘তুলনাহীনা’ (১৯৮৯)। তারপর আর একসঙ্গে কাজ করা হয়নি। এবার সুন্দর কিছু গান লিখেছেন রাসেল। আমরাও ভালো কিছু গান তৈরির চেষ্টা করছি। আপনার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানতে চাই। আমার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন আমার দেশ, আমার পরিবার এবং আমার পেশা ও নেশাকে ঘিরেই। আমি আমার কাজকে সফলভাবে করে আমার দেশকে কিছু একটা দিতে চাই। আমার দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের পাশে থেকে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করারও একটা ইচ্ছা আছে। সংগীতকে আমি অনেক ভালোবাসি। তাই সংগীত দিয়ে দেশের মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে চাই আমি। আমি সোসাইটি ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব অটিস্টিক চিলড্রেনের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছি, এ জন্য অটিস্টিক শিশুদের জন্য বড় কিছু করে যাওয়ারও ইচ্ছা আছে। তারা যেন তাদের মেধাটাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পায়, সেজন্য তাদের পাশে থেকে তাদের সাথে কাজ করে যাওয়ার স্বপ্নও কাজ করে মনের মধ্যে।