সম্পর্ক উন্নয়নের ব্রত

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৩, ২১:১৩
সুদূর নাইজেরিয়ার উত্তরীয় প্রদেশে কেটেছে তার শৈশবের দিনগুলো; পড়াশোনাটাও সেখানে। বহুদেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহটা বুঝি সেখানেই জন্মেছিল। অনেক দেশের অনেক সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগটা দূতাবাসের চাকরিতে যে না চাইতেই প্রাপ্য। এমন ইচ্ছে থেকেই কম্পিউটার প্রকৌশলী দিনার দেশে ফিরে নিজ যোগ্যতাতেই সুযোগ করে নেন নাইজেরীয় দূতাবাসে। এখন বাংলাদেশস্থ রয়াল থাই অ্যাম্বেসিতে সচিব পদে কর্মরত রয়েছেন। একই সাথে দেখছেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের দিকটাও। দিনার আহমেদ প্রজন্মকে শুনিয়েছেন তার পথচলার গল্প। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মোহাম্মদ মোর্শেদ নাসের, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু দিনার আহমেদ ডাকনাম :দিনার জন্মতারিখ ও স্থান :২৯ ডিসেম্বর, ঢাকা মায়ের নাম :নূরজাহান বেগম বাবার নাম :সুলতান আহমেদ প্রথম স্কুল :নাসারাওয়া প্রাইমারি স্কুল, নাইজেরিয়া প্রিয় মানুষ :আমার মা প্রিয় উক্তি :knowledge is a key to success প্রিয় পোশাক :সালোয়ার-কামিজ অবসর কাটে যেভাবে :পড়াশোনা করে, টিভি দেখে সাফল্যের সংজ্ঞা :যেটা করতে চাইছি, সেটা ঠিকমতো করতে পারাটাই সফলতা। বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে, মা’ও কর্মজীবী। নাইজেরিয়া সরকারের আমন্ত্রণে সপরিবারে পাড়ি জমান তারা সেখানে। ছোট্ট মেয়ে কিছু বুঝতে না বুঝতেই পড়লেন অন্য রকম এক পরিবেশে। আশপাশে হরেক রঙের মানুষ, তাদের কথা বলার ভাষাও অন্যরকম। অবাক করা তথ্য হলো, নাইজেরিয়াতে প্রায় শতাধিক ভাষা প্রচলিত। উত্তর প্রদেশের কিছু ভাষা বুঝতেও শুরু করল মেয়েটি। এরপর স্কুলে ভর্তি হলেন দিনার। বন্ধুবান্ধবও নানা দেশের নাগরিক। আন্তর্জাতিক এক পরিমণ্ডলে বড় হওয়ার সুযোগ ক’জনেরই বা জোটে? আর এই সময়েই খুব ভালো লেগে যায় ভিন্ন রকম সংস্কৃতি। দিনার আহমেদ সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলছিলেন, ‘আমাদের দেশের মতো নয় পুরোটা। স্কুলের ডিঙ্গি পেরিয়েই বিষয়ভিত্তিক দিকে চলে যাওয়া যায় সেখানে।’ ‘ও’ লেভেল দিয়েই তাই পছন্দের বিষয় কম্পিউটার সায়েন্সের দিকে পা বাড়ান তিনি। আর যে সময়ের কথা বলছিলেন, তখন কম্পিউটার দেশে ছিল হাতে গোনা। সারাটা দিন স্কুল-কলেজের ল্যাবে কম্পিউটারের সামনেই কাটিয়ে দিতেন তিনি। সাধারণ প্রোগ্রামগুলোও কি বিস্ময়কর হয়েই না ধরা দিত সেই সময়। দিনার আহমেদ এভাবেই কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক শেষ করে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেন। দেশে আসাটা মূলত বেড়ানোর খাতিরে হলেও কেন জানি থেকে যেতে মন চাইল তার। সেই সময়ে বিয়ের প্রস্তাবটাও আসে। নেভাল আর্কিটেক্ট মশিউর রহমানের সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন সেই সময়ে। বাংলাদেশের মেয়ে তিনি, তবুও নতুন এই পরিবেশে খাপ খাওয়ানো চাই। এই নিয়ে পরিবারের সহযোগিতা ছিল দারুণ, আর সে জন্য তাদের কাছে যারপরনাই কৃতজ্ঞ তিনি। যাই হোক, ঘরে বসে থাকার মানুষ নন দিনার আহমেদ। খোঁজ পেয়ে নাইজেরীয় দূতাবাসে চাকরির আবেদন করলেন। একেবারে যে নিজের পড়াশোনার সাথে খাপ খাইয়ে চাকরি, তা নয় কিন্তু। নাইজেরীয় দূতাবাস তার যোগ্যতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন সেখানে থাকার অভিজ্ঞতাটাই বিবেচনায় এনে সুযোগটা দিলেন তাকে। তারপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নাইজেরিয়া দূতাবাস বাংলাদেশ ছাড়লে মেধার জোরে তিনি সুযোগ করে নেন থাই অ্যাম্বেসিতে। প্রথম দিকে অফিসিয়াল কাজে যোগদান করলেও সততা, নিষ্ঠা আর ঠাণ্ডা মাথায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাই অল্প সময়ে তাকে পৌঁছে দেয় সচিব পদে। থাই অ্যাম্বাসেডরের একান্ত সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি এখন। কেমন উপভোগ করেন এই পেশা? দিনার আহমেদ বলেন, ‘ভালোই লাগে নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে। আর যেহেতু আমি অ্যাম্বেসিতে কাজ করি এবং আমার কাজটা হচ্ছে বন্ধুত্বের সম্পর্ক উন্নয়নের সেহেতু নিজের থেকেও একটা দেশপ্রেম অনুভব করি। সেই সাথে দায়িত্বটাও সমানতালে মাথায় রাখতে হয়।’ দুই দেশের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় রেখেই তাকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয় কীভাবে কী করলে ফলপ্রসূ হবে তাদের কাজ। এই সবকিছু ব্যবস্থাপনা করাটাও কিন্তু নেহায়েত কম খাটুনি নয়। দিনার আহমেদের কাছে প্রশ্ন ছিল, কখনও কি মনে হয় আবার দেশের বাইরে ফিরে যাবেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে নেতিবাচক মত দিলেন তিনি। তিনি দীর্ঘদিন তো দেশের বাইরে ছিলেন, এখন চান এখানেই বাকি জীবনটা কাটাতে। তবে মাঝে মাঝেই নাইজেরিয়ার সেই দিনগুলো দারুণ মিস করেন তিনি; সময় সুযোগ পেলেই ছুটে যেতে চান ছেলেবেলার সেই বন্ধুদের কাছে। দিনার আহমেদ কর্মজীবনে যেমন একজন সফল ব্যবস্থাপক, ব্যক্তিজীবনেও তিনি সব সিদ্ধান্ত নেন বুঝেশুনে। স্বামী ড. মোহাম্মদ মশিউর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাদের একমাত্র সন্তান মুহাম্মদ মাহদী মারজানকে নিয়েই কেটে যায় অবসরের সময়টা। তার বাবা-মা এখন দেশে, একমাত্র ভাই প্রবাসে। সবমিলিয়ে ভালোই আছেন দিনার আহমেদ। তার পথচলা অবারিত হোক, শুভকামনা তার জন্য।