বাংলাদেশে বিভিন্ন নির্মাণ শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটে চলেছে। বিশ্বমানের এসব শিল্পের কাতারে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ছে দক্ষ প্রযুক্তিজ্ঞানসমৃদ্ধ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের। ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে যে ক’টি পেশা শিক্ষার্থীদের বেশি পছন্দ করে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সিভিল। এই প্রজন্মের তেমনই কয়েকজন মেধাবী সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। আয়োজনটি দেখুন পরের পৃষ্ঠায়। গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
জোবায়েদ বিন রাকিব
প্রভাষক (স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগ)
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
জোবায়েদ বিন রাকিব
ডাকনাম :জোবায়েদ
জন্মতারিখ ও স্থান :১২ মে, ১৯৮৯
মায়ের নাম :রওশান রাকিব
বাবার নাম :আব্দুর রাকিব
প্রথম স্কুল :খুলনা রোটারি স্কুল
প্রিয় মানুষ :বাবা-মা
প্রিয় উক্তি :A person who never made a mistake never tried anything new.
প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :টিভি দেখে, ইন্টারনেট ব্রাউজিং করে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :চেষ্টা করে যেতে হবে, সাফল্য আসবেই।
ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণীতে গণিতে বেশ কাঁচা ছিলেন। নবম শ্রেণীতে এসে বিজ্ঞান-গণিত বিষয়ের প্রতি ঝোঁক বেড়ে গেল। বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলে ডাক্তার হবেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতিই তার ঝোঁকটা বেশি ছিল। সেই সূত্রে ভর্তি হলেন দেশসেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে। আর ছাত্রজীবনের এই চার-পাঁচটি বছর ছিল তার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। শিক্ষক আর বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে কম পাওয়া হয়নি তার। বুয়েটের শিক্ষকদের জীবনযাপন এবং তাদের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধাবোধ দেখে মুগ্ধ হয়ে শিক্ষকতা পেশাটি বেছে নিলেন তিনি। বলছি জোবায়েদ বিন রাকিবের কথা, স্নাতক শেষ করে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিনি। আর নিজের বিনয় দিয়েই পৌঁছেছেন শিক্ষার্থীদের প্রিয় শিক্ষকের তালিকায়। জোবায়েদ ছোটবেলা থেকে যেকোনো কাজ মনোযোগের সাথে করার চেষ্টা করেছেন, যার কারণে বরাবরই পড়াশোনার ক্ষেত্রে সাফল্য পেয়ে এসেছেন। ছাত্র পড়ানোর বাইরেও ব্যক্তিগতভাবে কিছু রিসার্চ কাজের সাথে জড়িত তিনি। সেগুলো বিদেশি জার্নালে প্রকাশিতও হয়েছে। জোবায়েদের কাছে প্রশ্ন ছিল, কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এই পেশায়? তিনি বলেন, ‘আমার এই পেশাতে আমি অনেক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ নিজের স্বল্প জ্ঞান অন্যদের সাথে ভাগ করে নিতে কার না ভালো লাগে! তা ছাড়া কাজের কোনো বাঁধাধরা সময়সীমা নেই। তাই কাজের চাপটাও কম বোধ করি।’ কাজের সুযোগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে জোবায়েদ বলেন, ‘দেশে প্রচুর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এগুলোতে উন্নতমানের শিক্ষক প্রয়োজন। পুরকৌশল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যে উপবিভাগগুলো আছে—এনভাইরনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং, জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পানিকৌশল ইঞ্জিনিয়ারিং। সবগুলোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশে-বিদেশে কাজের অনেক সুযোগ আছে।’ তাই তিনি মনে করেন পেশা হিসেবে সময়ের সাথে বেশ উপযোগী এটা। এ ছাড়া কেউ শিক্ষাকতার পাশাপাশি রিসার্চ এবং কনসালটেন্সি কাজের সাথে জড়িত থাকতে পারে, যেটা তাদের জ্ঞানচর্চা বৃদ্ধি করার পথ করে দেয়।
নতুনদের এই পেশায় স্বাগত জানিয়ে জোবায়েদ বলেন, ‘আমরা যারা নতুন আছি এ পেশাতে, তারা আধুনিক টেকনোলজি, প্রোগ্রামিং এবং সফটওয়্যার সম্বন্ধে জ্ঞান রাখে। তাই তারা আরও ফলপ্রসূভাবে তাদের কাজ করে যেতে পারছে। কম সময়ে অধিক আউটপুট দিতে পারছে নতুনরা। বেশির ভাগই নিজ উদ্যোগে রিসার্চের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেটা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নতুন নতুন দিক উদ্ভাবন হচ্ছে। আমি আশা করি আমাদের দেশ এই নতুন মেধাগুলোকে দেশের মঙ্গলের কাজে লাগাতে পারবে।’
বিনয়ী এই তরুণ প্রকৌশলীর শৈশবের প্রথম কিছু সময় কাটে খুলনাতে। এর পর যখন ক্লাস টু’তে পড়েন তখন থেকে ঢাকাতে। পরিবারের খুব কাছে থাকতে পছন্দ করেন সবসময়। প্রথম সন্তান হিসেবে বাবা-মায়ের অনেক আদরের তিনি। খেলাধুলা করতে সবসময়ই ভালো লাগে তার, বুয়েট জীবনেও খেলার সাথে জড়িত ছিলেন। তার পরিবারে আছে বাবা, মা, ছোট ভাই এবং সহধর্মিণী। ভাই কিছুদিন আগে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে বর্তমানে চাকরি করছে, সহধর্মিণী শাইখা বিনতে আবেদীন জয়ন্তী ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সের পুরকৌশল বিভাগে শিক্ষকতা করছেন।
প্রজন্মের এই প্রকৌশলী নিজের শিক্ষার ঝুলিটা আরও সমৃদ্ধ করতে চান। সেই লক্ষ্যে দেশের বাইরে যাওয়ারও ইচ্ছে রয়েছে। তিনি তার সৃষ্টির
আলোয় গুণমুগ্ধ শিক্ষার্থীদের হাতে দিয়ে যাবেন আলোকবর্তিকা, শুভকামনা সেই জন্য।
মো. নাজমুস সাকিব
পরিচালক
ইকো-স্ট্রাকচার (প্রা.) লিমিটেড
মো. নাজমুস সাকিব
ডাকনাম :সাকিব
জন্মতারিখ ও স্থান :যশোর, ২২ জুলাই
মায়ের নাম :হাসিনা আক্তার
বাবার নাম :মো. আইনুল হক
প্রথম স্কুল :জয়দেবপুর কিন্ডার গার্ডেন, গাজীপুর
প্রিয় মানুষ :বাবা, মা
প্রিয় উক্তি :No matter what are you doing, you are always learning. If there is a wish, there is a way.
প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :মুভি দেখে, গান শুনে অথবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি ও চেষ্টা।
পুরকৌশলে পড়াশোনা করার ব্যাপারটা অনেক চিন্তাভাবনা করে শুরু করলেও পেশাদারি কাজের মধ্যে হঠাত্ করেই ঢুকে পড়েছিলেন। বুয়েটে পুরকৌশল বিভাগে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করার সময় সিনিয়র সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুল আজিজ এবং এস এম তোহিদুল আলমের সাথে একটি ৪ তলা মসজিদের স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস এবং ডিজাইনের মাধ্যমে তার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পেশাদারি কাজের শুরু। পরবর্তীতে তাদের হাত ধরেই ছাত্র অবস্থাতেই বিভিন্ন বহুতল ভবনের স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস এবং ডিজাইনের কাজে সরাসরি যুক্ত হন। মাস ছয়েকের মধ্যে তারা স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস, ডিজাইন ও ক্লায়েন্ট কোঅর্ডিনেশনে তার উপর নিশ্চিন্তে নির্ভর করা শুরু করেন। পরবর্তীতে কাজের পরিমাণ বাড়তে থাকলে ২০১০ সালের শুরুতে ইকো-স্ট্রাকচার নামে একটি কনসাল্টিং ফার্ম রেজিস্ট্রেশন করেন, যা বর্তমানে ইকো-স্ট্রাকচার (প্রা.) লিমিটেড। বলছিলাম এ প্রজন্মের মেধাবী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মো. নাজমুস সাকিব সম্পর্কে। বাবা সরকারি চাকরি করতেন, তার আবার দেশ ঘুরার শখ ছিল। যার ফলে কলেজ পর্যন্ত সাকিব বিভিন্ন জেলায় ৭টি স্কুল পরিবর্তন করেছেন। ফলে খুব সহজে মানুষের সাথে মিশে যেতে পারেন, নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। সবশেষে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, রংপুর থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বুয়েটে পুরকৌশল বিভাগে ভর্তি হন। ৩য় বর্ষে থাকাকালীন তিনি কন্সালটেন্সি কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েন। বাঁধন, বুয়েট ক্যারিয়ার ক্লাব, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনসহ বেশকিছু সংগঠনের সাথেও জড়িত ছিলেন। বুয়েট ক্যারিয়ার ক্লাবের ফাউন্ডিং প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এখন ফাউন্ডিং অ্যাডভাইজার হিসেবে দায়িত্বে আছেন। বাবা-মা আর বড় বোন নিয়েই তার পরিবারিক আবহ।
নিজের কাজ সর্ম্পকে সাকিব বলেন, ‘ইকো-স্ট্রকচারে আমি মূলত ম্যানেজমেন্ট, ডিজাইন কো-অর্ডিনেশনের পাশাপাশি স্ট্রাকচারাল মডেল অ্যানালাইসিস ও প্লাম্বিং ডিজাইনের করি। আমি এ পর্যন্ত ৫০টির বেশি বিল্ডিং প্রজেক্টে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও ডিজাইন কো-অর্ডিনেশনে সরাসরি যুক্ত ছিলাম। কিছু কাজের মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের, অ্যাটমিক এনার্জি রিসার্চ স্টাবলিশমেন্ট, সাভার, ঢাকা; সেতু বিভাগের জন্য এলিভেটেড ইক্সপ্রেসওয়ের ফাংশনাল থ্রিডি অ্যানিমেশন; শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ১২৮টি আইসিটি ট্রেনিং সেন্টারের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন। বর্তমানে আমরা ১টি ১৭ তলা ৩ স্টার হোটেল, ১টি ১০ তলা, ২টি ৯ তলা বিল্ডিং প্রজেক্টের ডিজাইন করছি। এ ছাড়াও আমি একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর এবং একটি কনসালটিং ফার্মের পক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিল্ডিং প্রজেক্টের ১২৮টি সাইটের সুপারভিশন ম্যানেজারদের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।’
তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন একজন উদ্যোক্তা হওয়ার, নিজে কিছু করার। নিজের প্রতিষ্ঠান ইকো-স্ট্রাকচারকে আরও বড় করে, আরও মানুষের কর্মসংস্থান করে, দেশে ইঞ্জিনিয়ারিং প্র্যাকটিস চালু করার জন্য কাজ করে যেতে চান।
শামসুন্নাহার সূচনা
প্রভাষক (পুরকৌশল বিভাগ)
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
সামসুন্নাহার সূচনা
ডাকনাম :সূচনা
জন্ম তারিখ ও স্থান :৬ নভেম্বর , কুমারখালি, কুষ্টিয়া
মায়ের নাম :নুরুন্নাহার বেগম
বাবার নাম :মো. আব্দুস সবুর সনেট
প্রথম স্কুল :ফুলকুঁড়ি শিশু বিদ্যালয়, কুমারখালি, কুষ্টিয়া।
প্রিয় মানুষ :আমার মা।
প্রিয় উক্তি :If you really want to explore, you must need to have a center.
প্রিয় পোশাক :শাড়ি
অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে আর ইন্টারনেটে সময় কাটিয়ে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :সাফল্য একটা সাবজেকটিভ ধারণা। সে অর্থে, একদম নিজের মতো করে পৃথিবীটা দেখতে পারার ক্ষমতা অর্জনই আমার কাছে সাফল্য।
খুব ছেলেবেলায় চাইতেন চিকিত্সক হবেন, সেই লক্ষ্যেই স্বপ্ন দেখতেন—ঘুরছেন স্টেথোস্কোপ নিয়ে ঘুরছেন। এই স্বপ্ন দেখা পর্যন্তই, খুব সিরিয়াসলি এটা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ ওই বয়সে ছিলও না। তবে আর যে একটা দিকে মেয়েটার শৈশবে বেশ জড়িয়ে ছিল, সেটা হলো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। তারপর কলেজজীবনে প্রথম যখন পেশা নিয়ে সিরিয়াসলি চিন্তা করেন, তখন তিনি নিজ থেকেই সিদ্ধান্ত নেন যে গণিত আছে এ রকম কিছু পড়বেন। সেই থেকে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন। তারপর বুয়েটে পুরকৌশল বিভাগে পড়তে এলেন। এই প্রজন্মের মেধাবী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার সামসুন্নাহার সূচনার শুরুর গল্পটি এমনই।
তার কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে আমরা বেশিরভাগ মানুষ আসলে বুঝি রড, বালি, সিমেন্ট, বাড়িঘর এইসব। কিন্তু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রটা কিন্তু অনেক বিশাল। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং, জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ট্রান্সপোর্টেশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং—প্রধানত এই চারটি ভাগ নিয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। আমার কাজের ক্ষেত্র এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং। তবে এই ইন্টারডিসিপ্লিনারির যুগে আমি এভাবে ক্যাটেগোরাইজ করতে স্বস্তি বোধ করি না।’
নিজের সাচ্ছন্দ্য বোধ এবং এই পেশা হিসেবে আমাদের দেশের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের উপযোগিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই পেশাটাই আমার লক্ষ্য ছিল, তাই আমার পক্ষে এটা নিয়ে একটা নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণে দাঁড়ানো একটু কঠিনই। তবে এখন পর্যন্ত এই জ্ঞানক্ষেত্রে আমার স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে আমি বেশ সন্তুষ্টই বলা যায়। এই দেশের সংস্কৃতির একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমাদের সমাজে একজন শিক্ষক ঐতিহাসিকভাবেই যথেষ্ট সম্মান পেয়ে থাকেন। সে দিক দিয়ে আমাদের দেশে শিক্ষকতাকে আজও মহান পেশা হিসেবে দেখা হয়। ফলে সমাজ ও একজন শিক্ষকের ভেতর একটা দ্বিমুখী দায়িত্ববোধের অলিখিত একটা সূত্র থাকে। এভাবে আমি এই দেশে শিক্ষকতার ভবিষ্যত্ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। আর যদি আমার গবেষণার ক্ষেত্র নিয়ে বলতে হয়, তবে এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বাংলাদেশ খুবই ভাইটাল একটা অবস্থানে আছে।’
নতুনদের কাজের সম্পর্কে তিনি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের তারুণ্য নিয়ে আমি সবসময়ই আশাবাদী। আজকের বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক জ্ঞান-পরিমণ্ডলে এ দেশের তারুণ্যের যে শক্তি ও সম্ভাবনা আমরা দেখছি, তাতে করে এই আশাবাদ আরও পোক্তই হয়। আমি মনে করি পরামর্শের চেয়ে নিজ থেকে অনুভব করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে তারপরও তাদের প্রতি আমার চাওয়া তারা যেন বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞান পরিমণ্ডলের দ্বিমুখী পাটাতনের ওপর নিজের অবস্থানটা নিয়ে পরিষ্কার ধারণা অর্জন করে। এভাবে তাদের করণীয় তাদেরই ঠিক করতে হবে, যাতে করে দেশ এবং বিশ্ব তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সেবাটাই পায়।’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন সম্পর্কে বলেন, ‘আমি আসলে বর্তমান নিয়েই বেশি আগ্রহী। তবে আমার মনে হয় বাংলাদেশে গবেষণার ক্ষেত্রটি আরও সুগঠিত হলে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার হবে। আমার অবস্থানে থেকে আমি আপাতত এই জায়গাটাই দেখতে চাই; বাংলাদেশে বিশ্বমানের গবেষণার ক্ষেত্র সৃষ্টির সাথে কোনোভাবে যুক্ত থাকতে পারলে মন্দ হয় না।’
ছবি দীপঙ্কর দীপু
মো. শাহিনুর রহমান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
অ্যাসিথেটিক আর্কিটেকচার ডেভেলপমেন্টস লি.
মো. শাহিনুর রহমান
ডাকনাম :শাহিন
জন্মতারিখ ও স্থান :২৫ আগস্ট, যশোর
মায়ের নাম :মোছা. শামসুন নাহার
বাবার নাম :মো. আকরামুর রহমান
প্রথম স্কুল :যশোর পলিটেকনিক প্রাইমারি বিদ্যালয়, যশোর
প্রিয় মানুষ :হযরত মোহাম্মদ (সা.)
প্রিয় উক্তি :সময় ও নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না।
প্রিয় পোশাক :পাঞ্জাবি, জিন্স
অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে ও ইন্টারনেটে জ্ঞান আহরণ করে
সাফল্যের সংজ্ঞা :সততা, একাগ্রতা ও পরিশ্রম।
‘পুরকৌশল প্রকৌশলকে বলা হয় সভ্যতার সোপান আর পুরকৌশল প্রকৌশলী হলো সেই আধুনিক সভ্যতার ধারকবাহক। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশের বিভিন্ন সেক্টরে প্রতিদিন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে। পুরাতন ধ্যান-ধারণা পালটে সবকিছুতেই আসছে নতুনত্ব। আমাদের নতুন পদ্ধতি প্রি-ইঞ্জিনিয়ারড স্টিল বিল্ডিং বর্তমান শিল্পকারখানা, কমার্শিয়াল ও রেসিডেন্টশিয়াল সেক্টরে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বিশেষ করে ভূমিকম্প প্রবণদেশে এই পদ্ধতির বিল্ডিংগুলো খুবই জনপ্রিয়। তা ছাড়াও খুবই দ্রুত স্থাপনার জন্য অনেক সময় সাশ্রয়ী। বিশ্বের সকল উন্নত দেশগুলো রাস্তাঘাটের স্থাপনা উন্নয়ন শেষ করে প্রকৃতি ও পরিবেশ যাকে বলে এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিকে নজর দিচ্ছে, সেখানে তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমরা পুরকৌশল ইঞ্জিনিয়াররা এখনও রাস্তাঘাট উন্নতি ও স্থাপনা শিল্পে সেই মান্ধাতা আমলের ইট, বালি, সিমেন্ট ও রেইনফোর্স রড ব্যবহার করে বাড়ি করি। এই ধরনের স্থাপনাগুলোর ভূ-কম্পন রোধক ক্ষমতা রিক্টার স্কেলের ৫.৫ বা ৬-এর বেশি নয়। বাংলাদেশে বড় মাপের ভূমিকম্প হলে, বিশেষজ্ঞরা সব সময় বলে আমাদের জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি হবে। জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও কিছু এশিয়ান দেশে ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কাঠের হার্ডবোর্ড ও কাগজের বাসায় থাকে। যদিও ওই দেশের বহুতলা বিল্ডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা কম, কারণ ওই দেশের ব্যবহূত জমি। কিন্তু আমাদের দেশে জমি অপ্রতুল। এ জন্য আমাদের বহুতলা বিল্ডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অনেক। কিন্তু আমাদের পুরাতন পদ্ধতি দিয়ে ২০ তলার বেশি উঁচু বিল্ডিং বানানো যায় না। ইউরোপ ও আমেরিকায় সকল ১০০ তলার সমান বিল্ডিং প্রি-ইঞ্জিনিয়ারড পদ্ধতিতে স্টিল বিল্ডিং। দ্রুত বানানো যায়, ভূমিকম্পন রোধকের ক্ষমতা রিক্টার স্কেলে ৮.০০ এবং ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কম থাকায় এই বিল্ডিংগুলো ফ্যাক্টরি ও কমার্শিয়াল সেক্টরে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আমার কোম্পানির দায়িত্ব বর্তমানে এই নতুন পদ্ধতিতে বিল্ডিংগুলো তৈরি ও ব্যবহার করে সকল মানুষের সচেতনতা বাড়িয়ে দেওয়া’, কথাগুলো বলছিলেন অ্যাসিথেটিক আর্কিটেকচার ডেভেলপমেন্টস লি.-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহিনুর রহমান।
তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে যশোর জেলা শহরে। শৈশব থেকেই গণিতশাস্ত্রে ও বিজ্ঞানে আগ্রহ থাকার কারণে প্রকৌশলী হওয়ার তীব্র ইচ্ছা পোষণ করতেন। সেখান থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ভালোভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে পুরকৌশল বিভাগে বিএসসি পাস করার পর মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে ২ বছর নতুন পদ্ধতিতে প্রি-ইঞ্জিনিয়ারড স্টিল বিল্ডিংয়ের উপর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে নিজেই দেশের জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য দেশীয় কারখানা স্থাপন করে বর্তমান ব্যবসা শুরু করেন।
