ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে টানা চার সপ্তাহ এডওয়ার্ড স্নোডেনকে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর শেরেমেটিয়েভো বিমানবন্দরে কাটাতে হতে পারে। এ সময়টা তার কেমন যাবে, কীভাবে তিনি দিনগুলো পার করবেন তা এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে মোহাম্মদ আল বাহিশের ঘটনা যারা জানেন তাদের কাছে এটা পরিস্কার খুব আনন্দে দিনগুলো কাটবে না মার্কিন সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেয়া স্নোডেনের।
ইরাকে জন্ম নেয়া ফিলিস্তিন শরণার্থী মোহাম্মদ আল বাহিশ অবশ্য মস্কোর শেরেমেটিয়েভো বিমানবন্দরে নয়, তার চেয়ে দুই হাজার মাইল দূরের কাজাখস্তানের আলমাটি বিমানবন্দরে দুবির্ষহ চার চারটি মাস কাটিয়েছেন।
বাহিশ যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ইন্টেরিয়র ডিজইনার হিসেবে কাজ করতেন তখন কাজাখস্তানের মেয়ে ওলেসিয়া গ্রিশেঙ্কোর সঙ্গে পরিচয় হয়। এর পর প্রেম। বান্ধবীকে বিয়ে করে কাজাখস্তানে সংসার পেতে সুখে শান্তিতে বাস করতে তার কাজাখস্তানে আসা।
কিন্তু ভাগ্যদেবী যে বরাবরাই তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবা-মা হারান বাহিশ। নেই কোন ভাই বা বোন।
এদিকে ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় বাহিশ ঢুকতে পারছিলেন না কাজাখস্তানে। এমনকি অন্য কোন দেশে যাওয়ার মতোও তার ছিল না ভিসা। ইসরাইল তাকে ফিলিস্তিনে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়নি। অন্যদিকে জাতিসংঘও বলেছে যেহেতু বাহিশের ইরাকে কোন জীবিত নিকটাত্মীয় নেই, তাই তার ইরাকে যাওয়া নিরাপদ নয়।
এর মধ্যে বাহিশ তার কাছে শরণার্থী হিসেব যে নথি ছিল তা হারিয়ে ফেলেছেন। মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে তার কাজাখস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিসার। ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কয়েকবার তুরস্ক আসা- যাওয়া করেছেন তিনি।
এমন নয় আলমাটি বিমানবন্দরটি খুব বড় কিংবা খুব আধুনিক। ছোট এই বিমান বন্দরে যাত্রীদের বিনোদনের জন্যও সব ব্যবস্থা নেই। এই বিমানবন্দরের ভেতরে একটি ছোট্ট গুমোট ঘরে বাহিশ চার মাস কাটিয়েছেন। অ্যরাইভাল হলের ভেতরে জানালাবিহনী দুই মিটার দৈর্ঘ্য ও তিন মিটার প্রস্থের এই ছোট ঘরে আসবাবপত্র বলতে একটি বাঙ্ক বেড, একটি ছিন্নভিন্ন পুরনো সোফা, দেয়ালের সঙ্গে লাগানো একটি টেবিল। তার ওপর রয়েছে একটি কোরআন শরীফ। সারাক্ষণ সেখানটা থাকতো সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।
ভিসার মেয়াদ না থাকায় তিনি বিমানবন্দরে পারতেন না ডিউটি ফ্রি কোন পণ্য কিনতে। আবার বেশি দাম বলে বিমানবন্দরের ক্যাফেতেও যেতে পারতেন না। তার এমন অবস্থা হয়েছে, না পারতেন বিমানবন্দরে যাত্রীদের জন্য রক্ষিত এলাকায় যেতে, আবার না পারতেন বিমানবন্দরের স্টাফদের জন্য নির্ধারিত এলাকায় যেতে।
প্রতিদিন ভোরে বাহিশের ঘুম ভাঙত বিমাবন্দরে একঘেয়ে সুরে বিভিন্ন ফ্লাইটের সময়সূচি ঘোষণাকারী মহিলার কথা শুনে। লাউডস্পিকারে তার কণ্ঠ শুনতে একসময় বিরক্তি ধরে যায় বাহিশের।
কাজাখস্তানের জাতীয় বিমান এয়ার আস্তানার যাত্রীদের জন্য যে খাবার সরবরাহ করা হতো তার থেকে একটু খাবার আলাদা করে দেয়া হতো তাকে। ছোট একটি বাক্সে করে দিনে তিনবার খাবার দেয়া হতো তাকে। বাহিশ বলেন, পুরো জুন মাসটাতে আমি শুধু গরুর মাংস ও মাশরুম খেয়েছি। আমি চাই আমার যেন আর কখনো গরুর মাংস খেতে না হয়।
ওই ছোট্ট রুম থেকে বের হলে বাহিশের ওপর কড়া নজরদারি থাকতো নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের। যেখানেই তিনি যান তার সঙ্গে লেগে থাকে হয় পুলিশ না হয় বিমানবন্দরে সিকিউরিটির লোকজন। লাগেজ ডিপার্টমেন্টের স্টাফদের জন্য নির্ধারিত গোসলের জায়গায় তিনি গোসল করতেন। একটু সতেজ বাতাস খেতে তাকে রানওয়ের দিকের বারান্দায় যেতে হতো। বাইরের দুনিয়ায় সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিমানবন্দরে অনিয়মিত ওয়াইফাই সুবিধার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। যখনই ওয়াইফাই সংযোগ পেতেন ব্যবহার করতেন স্কাইপে। কথা বলতেন নরওয়েতে থাকা একমাত্র নিকটাত্মীয় কাজিন ইয়াসিরের সঙ্গে। বাহিশ বলেন, ইয়াসির ছাড়া আমার আর কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। আমি তুরস্ক গিয়েছিলাম যেন তারা কাজাখস্তানের ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তারা তা করেনি। ফিরতি ফ্লাইটে করে তারা আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে কাজাখস্তানে। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ায় কাজাখ কর্তৃপক্ষও আমাকে গ্রহণ করতে চায়নি। এরা আমাকে ফেরত পাঠায় ইস্তাম্বুল।
এভাবে বাহিশ চারবার ইস্তাম্বুল-আলমাটি বিমানবন্দরে ঘুরেছেন। মূলত বাহিশ কাজাখস্তান বিমানবন্দরের ট্রানজিট এলাকায় থাকছেন। যেটি আইনত কাজখস্তান সরকারের এলাকা নয়। গত মাসে কাজাখ কর্তৃপক্ষ তার আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখান করে দিয়েছে।
বাহিশ বলেন, এই মুহূর্তে আমার মাথায় সারাক্ষণ শুধু একটি চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে- কীভাবে আমি এই জেল থেকে বের হবো। আমি কতদিন সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখি না। আর ভাল লাগে না এই জেলজীবন।
