পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে দল সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয়ে আওয়ামী লীগের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাড়ে চার বছর আগে নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের পর গত সাড়ে চার বছরে এমন কি হলো যার জন্য মানুষ আওয়ামী লীগের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে—সেটা খুঁজে দেখার আগ্রহ আওয়ামী লীগের মধ্যে হয়েছে বলে পত্র-পত্রিকায় খবর বের হচ্ছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ভবিষ্যত্ করণীয় নির্ধারণ করা ভালো লক্ষণ। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের আনুষ্ঠানিক সভায় সবকিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কি সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেটা জানার অপেক্ষায় আছে আওয়ামী লীগের অগণিত কর্মী-সমর্থক-শুভানুধ্যায়ী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকদিনের বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরেই দলের নেতাদের সঙ্গে বসে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে পরাজয় নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বিদেশে থাকতেই গত ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আশা করা হয়েছিল, গাজীপুরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মেয়র পদে জয়ী হবেন। গাজীপুর আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি এবং প্রার্থী হিসেবেও অ্যাডভোকেট আজমতউল্লা খান ছিলেন সব বিবেচনাতেই যোগ্যতম। ১৫ জুন অনুষ্ঠিত চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে দলের প্রার্থীদের পরাজয়ের পর গাজীপুরে আটঘাট বেঁধেই আওয়ামী লীগ মাঠে নেমেছিল বলে খবর প্রচার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বিরোধের কারণে নির্বাচনী প্রচারযুদ্ধে সমন্বিত ও সংহতভাবে নামা সম্ভব হয়নি বলে এখন জানা যাচ্ছে। তাছাড়া দলের বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীরের ভূমিকাও ছিল সন্দেহজনক। তিনি প্রার্থী থাকলেই ভালো হতো বলে নির্বাচনের পরে আজমতউল্লা খান তার প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করেছেন। ফল যা হবার তাই হয়েছে। গাজীপুরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এক লাখেরও বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন। স্বভাবতই এই নির্বাচনী ফলাফলে আওয়ামী লীগ হতচকিত হয়েছে, বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ গত সাড়ে চার বছর যেভাবে দেশ শাসন করেছে, তা মানুষের কাছে ভালো লাগেনি। মানুষ আওয়ামী লীগের অনেক কিছুকেই বাড়াবাড়ি বলে মনে করেছে। মানুষের ভালো লাগা মন্দ লাগাকে তোয়াক্কা না করে সরকার খেয়ালখুশি মতো চলায় ক্ষুব্ধ মানুষ সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে একটি ‘শিক্ষা’ দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি তার মেয়াদকালে ভালো কাজ বেশি করেছে, নাকি খারাপ কাজ বেশি করেছে? কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ ভালো কাজই বেশি করেছে। খারাপ কাজের পরিমাণ কম হলেও মানুষ মনে রেখেছে সেটাই। কারণ ভালো কাজ করবে বলেই মানুষ আওয়ামী লীগকে বেশি করে ভোট দিয়েছে, ক্ষমতায় বসিয়েছে। বিএনপি-জামায়াত শাসনকালে দেশে যেভাবে অন্যায়-অনিয়ম-অপশাসন চলছিল তার কোনোটারই পুনরাবৃত্তি মানুষ দেখতে চায়নি। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে বিএনপির গায়ে যেসব কলংক লেগেছিল সেসব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার। আবার কথায় কথায় বিএনপি-জামায়াত শাসনের সমালোচনা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের সামনে নিজেদের সাফল্যের প্রমাণ বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়ে সরকার বিএনপি-জামায়াত আমলের ব্যর্থতার কথা বারবার বলে মানুষকে বিরক্ত করেছে।
বিএনপি-জামায়াত আমলে তৈরি অসহনীয় বিদ্যুত্ সমস্যা সমাধানে বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেয়ায় এবং বিদ্যুত্ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় মানুষ খুশি। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের কিছু উদ্যোগ মানুষের প্রশংসা পেয়েছে। শিক্ষা বছরের শুরুতেই লাখ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দেয়া, পাবলিক পরীক্ষাগুলো নির্দিষ্ট সময়সূচি ধরে অনুষ্ঠান এবং যথাসময়ে ফলাফল ঘোষণা করে শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারাটা নিঃসন্দেহে সরকারের সাফল্য। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর সার, বীজ, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। দেশে খাদ্য উত্পাদন বেড়ে চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও সরকার ভালো করেছে। বিশেষ করে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো চালু করায় গ্রামাঞ্চলের বঞ্চিত-অবহেলিত নারীরা স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার যে সুযোগ পেয়েছে তা অতুলনীয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের যে স্বপ্ন সরকার দেখিয়েছিল, সেক্ষেত্রেও সরকারের সাফল্য আছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে খুনিদের দণ্ডাদেশ কার্যকর করা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করাও সরকারের সফলতারই পরিচয় বহন করে। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে এবং এক্ষেত্রে যথেষ্ট সাফল্যও আছে।
কিন্তু সরকারের এসব সাফল্য চাপা পড়ে গেছে এমন কিছু কাজে যেগুলো তাদের করার কথা ছিল না। সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি বন্ধের অঙ্গীকার থাকলেও ক্ষমতায় বসে সরকার ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তপনা বন্ধ করতে পারেনি। তাদের চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-দখলদারিতে মানুষ অতিষ্ঠ। দুর্নীতি বন্ধের ঘোষণা থাকলেও দুর্নীতি বন্ধ তো দূরের কথা, কমাতেও পারেনি। স্বজনপ্রীতি-দলীয়করণের ধারা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো চেষ্টা দেখা যায়নি। দিনবদলের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় আসার পর আশা করা হয়েছিল সরকার দেশ শাসনে গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি অনুসরণ করবে, উত্সাহিত করবে। বিরুদ্ধমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। বিরোধী দলকে আস্থায় আনার চেষ্টা করবে সরকার। সমালোচকদের প্রতি বিরাগ না হয়ে সরকার সহনশীলতার পরিচয় দেবে, সমঝোতার পথে হাঁটবে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সরকারের মনোভাবে গণতান্ত্রিকতার লেশমাত্র লক্ষ্য করা যায়নি। একজন অধম হলে আরেকজনের উত্তম হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে উত্তম হওয়ার প্রতিযোগিতা নেই, আছে অধম হওয়ার প্রতিযোগিতা। দেশ থেকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার যখন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কাজ সম্পন্ন করে রায় বাস্তবায়ন করে, তখন মানুষ খুশি হলেও সেটি স্থায়ী হয় না যখন দেখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দেন। ঝালকাঠির কলেজ ছাত্র লিমনকে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়ার পরও তাকে নিয়ে র্যাব যে কাণ্ডকারখানা করেছে তা মানুষকে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। অসহায়-নিরপরাধ গরিব কলেজ ছাত্র লিমনের পাশে দাঁড়ানো যেখানে সরকারের নৈতিক দায়িত্ব ছিল, সেখানে সরকার বরং দাঁড়িয়েছে তার বিরুদ্ধে। ‘দোষী’ কয়েকজন র্যাব সদস্যকে বাঁচাতে গিয়ে এবং নির্দোষ লিমনকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসাতে গিয়ে সরকার যে কতটা নিন্দিত ও সমালোচিত হয়েছে, সেটা সময় থাকতে বুঝতে না পারার চরম খেসারত সিটি নির্বাচনে দিতে হলো কি না, সেটাও ভেবে দেখা দরকার। র্যাবের হাতে গুলিবিদ্ধ তরুণ লিমনের একটি পা কেটে বাদ দিতে হয়েছে। তারপরও প্রায় আড়াই বছর তাকে নিয়ে র্যাব টানাহেঁচড়া করেছে। সংবাদপত্রে অসহায় লিমন এবং তার মা-বাবার করুণ আর্তি যারা পাঠ করেছেন তারা কি সরকারের জন্য শুভ কামনা করেছেন, নাকি সরকারকে অভিশম্পাত দিয়েছেন? সিটি নির্বাচনে ভরাডুবির পর সম্ভবত সরকারের সুমতি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার লিমনের বিরুদ্ধে দায়ের করা র্যাবের দুইটি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বিলম্বিত বোধোদয় সরকারকে কতটুকু মার্জনা দেবে, সেটা বোঝার জন্য এখন অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
সরকার নারী উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করেছে। নারীর ক্ষমতায়নে সরকার যে আন্তরিক তার প্রমাণও রাখা হচ্ছে। সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী আছেন নারী। সর্বশেষ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত করা হয়েছেন একজন নারীকে, অভিজ্ঞতায় এবং বয়সে তুলনামূলকভাবে নবীন হলেও। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ৮০ লক্ষাধিক গ্রামীণ নারী যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত সেই গ্রামীণ ব্যাংক এবং তার প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পেছনে লাগতে গেল কেন সরকার? ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক তো সরকারের কোনো নির্বাচনী ইস্যু ছিল না। তারপরও এই একটি নন-ইস্যু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার দুর্বুদ্ধি সরকারের মাথায় চাপলো কেন? কার উর্বর মস্তিষ্ক থেকে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে লাগার বিষয়টি এসেছে? বাংলাদেশে ড. ইউনূসকে নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। তাকে কেউ কেউ অপছন্দ করতে পারেন, তার গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার নিয়েও প্রশ্ন ও বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু দেশের বাইরে যে ড. ইউনূসের বিরাট প্রভাব- প্রতিপত্তি ও সুনাম-সম্মান রয়েছে, এটা কি সরকারের কোনো পর্যায়ের কারো জানা ছিল না? তাকে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ থেকে সরানোর পর দুনিয়াজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ার পরও সরকার কেন বুঝতে পারলো না যে, এই যুদ্ধে জিততে গেলে সরকারকে লাভের চেয়ে ক্ষতি গুনতে হবে বেশি? সর্বশেষ পরিস্থিতি কি দাঁড়িয়েছে? পাঁচ সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হওয়ার পর এটা ধারণা করা হচ্ছে পরবর্তী নির্বাচনের ফলাফলও এরকমই হবে। বিএনপির নেতৃত্বেই পরবর্তী সরকার গঠিত হবে। হাওয়া বুঝে এখন বিএনপি ছাড়াও আরো অনেকেই গিয়ে ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাত্ করছেন, গ্রামীণ ব্যাংক রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ড. ইউনূসও রাজনীবিদদের মতো শক্ত ভাষায় সরকারবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। ড. ইউনূস ইস্যুতে সরকারের প্রাপ্তির চেয়ে হারানোর পরিমাণই বেশি।
সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সরকারের কোনো হাত ছিল না। ভবনের মালিক সোহেল রানা স্থানীয় যুবলীগের একজন নেতা— এটুকুই আওয়ামী লীগের দায়। রানার রাজনীতি শুরু আবার বিএনপির ছাত্রদল দিয়ে। বিএনপি-জামায়াতের গত শাসনামালে রানার বাবা বিএনপির রাজনীতি করে ধনবান হয়েছেন। এখন রানা যুবলীগ হওয়ায় ক্ষমতার হালুয়া-রুটি তার ভাগেও বিপুলভাবেই জুটেছে। টাকা বানানোর নেশায় মত্ত রানা ভবন নির্মাণেও দুই নম্বরি করেছে। সহযোগিতা পেয়েছে প্রশাসনের দুই নম্বরি ব্যক্তিদের। আর ফল হয়েছে ভবন ধস। এক হাজারের বেশি পোশাক শ্রমিকের করুণ মৃত্যু এবং আরও অনেকের গুরুতর আহত হওয়া। এই দুর্ঘটনার দায় রানাকেই বহন করতে হবে। তার রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন একজন অপরাধী হিসেবে তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার না করে প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে ‘এই রানা সেই রানা নয়’ ইত্যাদি বলায় মানুষ খুশি হয়নি। রানাকে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু শুরুতে তার রাজনৈতিক পরিচয় ঢাকার জন্য লুকোচুরি করতে গিয়ে সরকারের সুনামহানি হয়েছে। রানা প্লাজার উদ্ধার কাজে সরকারের সাফল্য কি রানা নাটকে একটুও ম্লান হয়নি? আওয়ামী লীগ যখন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে তখন এই বিষয়গুলো কি বিবেচনায় আসবে? দেখা যাচ্ছে ক্ষমতার সাড়ে চার বছরে সরকার ভাল কাজের পাশাপাশি এমন অনেক কাজ করেছে যেগুলো এই সরকারের কাছে মানুষ আশা করেনি। এটাও দেখা গেছে যে, সরকার মিত্রদের সঙ্গে যেমন সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারেনি তেমনি নতুন নতুন শত্রুও তৈরি করেছে। এখন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিস্থিতি কতটা নিজেদের অনুকূলে আনতে পারবে সে ব্যাপারে অনেকের মনেই বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ই-মেইল : [email protected]
