পেট্রোবাংলার অদক্ষতা, গ্যাস সম্পদ সংরক্ষণে সরকারের সুদূরপ্রসারী নীতির অভাব, বিদেশি কোম্পানিসমূহের মাত্রাতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে গ্যাস ও তেলের ওপর ভাসমান ব-দ্বীপ বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদ দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞবৃন্দ মতামত ব্যক্ত করেছেন। অনতিবিলম্বে গভীর অধ্যয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে গ্যাস সম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই আমাদের বিপুল গ্যাস সম্পদ শুকিয়ে যাবে।
গ্যাস সম্পদের অদক্ষ ব্যবস্থাপনার ফলে ভয়াবহ জাতীয় সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। ইতিমধ্যে রাজধানী নগরীসহ দেশের অনেক শহর ও জনপদে গ্যাসের চুলাসহ গ্যাসের নানাবিধ ব্যবহার নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত ১৭ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় রিপোর্ট করা হয়েছে যে, তিলোত্তমা ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট, পল্লবী, মিরপুর-১০, মিরপুর ১-২, শেওড়াপাড়া, কাফরুল, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলীসহ একাধিক এলাকায় চরম গ্যাস সংকটের কারণে ঠাণ্ডা ও পচা-বাসি খাবার-দাবার দিয়ে ইফতার ও সাহরি পালন করা হচ্ছে। রন্ধন কর্মের বাইরে শিল্প কারখানার উত্পাদন কার্যও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে গ্যাসের অভাবে। দ্বিতীয়ত গ্যাসের অপর্যাপ্ততার কারণে জাতীয় বিদ্যুত্ গ্রিডের বিদ্যুত্ উত্পাদনও ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। গত ২৬ জুন ইংরেজি পত্রিকা ‘নিউ এজ’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমেরিকান কোম্পানি শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডে ফাটল ধরার কারণে গত ২৩ জুন থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে ভাড়াভিত্তিক বৈদ্যুতিক কেন্দ্র চালু রাখতে পিডিবিকে ১২ কোটি টাকা ব্যয় করে অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় করতে হয়। ফলে মাত্র ১১ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে পিডিবির ক্ষতি হয় ১২ কোটি টাকা। এ পরিসংখ্যান থেকে অনুমান করা যায়, আমাদের গ্যাস সম্পদ নিঃশেষিত হলে শুধু বিদ্যুত্ খাতেই আমাদের যে ক্ষতি হবে তা জাতীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে ছাড়বে।
গ্যাস সরবরাহে অপর্যাপ্ততার কারণে পিডিবিকে হয়তো বৈদ্যুতিক ইউনিট বন্ধ করে দিতে হবে অথবা অন্য কোন বৈদ্যুতিক কেন্দ্রে মাত্রাতিরিক্ত বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে হবে অথবা প্রচুর আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে বিদ্যুত্ ক্রয় করতে হবে। এ বিকল্পসমূহের প্রত্যেকটিই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমূহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিদ্যুত্ উত্পাদন ছাড়াও বিভিন্ন কল-কারখানার উত্পাদনে ও গৃহস্থালী কাজকর্মে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হবে।
উপরিউক্ত অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের গ্যাস সম্পদের উত্তোলন, সরবরাহ, সংরক্ষণ ও মজুতকরণে সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার উজাড় করে দেয়া হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শোষক কোম্পানির নাগালে। এ বিষয়ে কোন আলোচনা-পর্যালোচনা, অধ্যয়ন-গবেষণা ছাড়াই খামখেয়ালিভাবে গ্যাসফিল্ডগুলোতে বিদেশিদের অনুপ্রবেশ মেনে নেয়া হয়েছে। তেল-গ্যাস রক্ষা আন্দোলনকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিছক সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে বিবেচিত করে তাদের যৌক্তিক দাবি ও বক্তব্যসমূহকে অবহেলা করা হচ্ছে। এখানে আমাদের গ্যাসফিল্ডগুলোতে কি ঘটছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী তুলে ধরলে তেল-গ্যাসসহ অন্যান্য খনিজ খাতে আমাদের জাতীয় নীতি কত ভঙ্গুর, অদক্ষ, অপরিণামদর্শিতার ভয়াবহ চিত্র সহজেই অবলোকন করা যায়। বাখরাবাদ গ্যাসফিল্ডের গ্যাস উত্পাদন ক্ষমতা ছিল প্রতিদিন ২৫০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট। কিন্তু বর্তমানে এটি মাত্র ২৮ এমএম সিএফ ডি (মিলিয়নস অব কিউবিক ফিট পার ডে) পরিমাণ গ্যাস উত্পাদন করতে পারে। আশঙ্কা হচ্ছে অনতিবিলম্বে আরো কম গ্যাস উত্পাদন করতে সক্ষম হবে এবং এক পর্যায়ে এখানকার গ্যাস নিঃশেষ হয়ে যাবে। সাংগু গ্যাসফিল্ডের ১৫০ এম এম সিএফডি পরিমাণ উত্পাদন ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে বর্তমানে তা মাত্র ৬ এমএম সিএফডিতে এসে দাঁড়িয়েছে। হয়তোবা শিগগিরই আমাদের ‘সাংগু গ্যাসফিল্ড পরিত্যক্ত’ জাতীয় দুঃসংবাদ শুনতে হতে পারে।
বাখরাবাদ ও সাংগুর গ্যাসফিল্ডের গ্যাস নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার এ করুণ চিত্র আমাদের মিডিয়াতে তেমন ঘটা করে ফুটে ওঠেনি। অথচ এ ভয়াবহ ঘটনায় চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্য রেডিও, টিভি, পত্র-পত্রিকা, সেমিনার-সিম্পেজিয়ামে দুর্দান্ত আলাপ-আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল। আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংলাপ ইত্যাদি নিয়ে যত আলাপ-আলোচনা, আন্দোলন-সংগ্রাম হচ্ছে, তার চেয়েও দশগুণ কর্ম-তত্পরতা দেখানো দরকার ছিল জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণের খাতে। দেশের সম্পদই যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে রাজনীতি, নির্বাচন, সরকার ব্যবস্থা আমাদের কি কাজে আসবে?
শক্তি বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েট অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মন্তব্য করেন যে, আমাদের দুর্ভাগ্য কোন রকম গবেষণা ছাড়াই পেট্রোবাংলা গ্যাস সম্পদের ব্যবস্থাপনা করে আসছে। তিনি সাংগু ও বাখরাবাদের গ্যাস-ধ্বংসের মূল কারণ হিসেবে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস-উত্তোলনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তার মতে, বাখরাবাদ ও সাংগু গ্যাস ক্ষেত্র থেকে প্রত্যাশিত গ্যাস উত্তোলন আর সম্ভব হবে না, কারণ, এখান থেকে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের অন্যান্য গ্যাস-ক্ষেত্র থেকে এমন নির্বিচারে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলন বন্ধ না করলে আস্তে আস্তে আমাদের গ্যাস সম্ভার ধ্বংস হয়ে যাবে।
আমরা কত হতভাগ্য, অসচেতন, মূর্খ একটা জাতি যে, এমন ভয়ংকর বাঁচা-মরার বিষয়টি নিয়ে কোথাও টুঁ-শব্দটি পর্যন্ত হলো না। এমনকি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান হোসেন মনসুর শেভরনের মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলনের কারণে গ্যাস ফিল্ডের কোন ক্ষতি হবে না বলে দায়িত্বহীন, গবেষণাহীন মন্তব্য করে জাতীয় আশংকাকে আরো অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন।
গত ২৪ জুন প্রকাশিত ইংরেজি জাতীয় দৈনিক “ঢাকা ট্রিবিউনের” খবর থেকে জানা যায়, আমেরিকান কোম্পানি শেভরন তিনটি গ্যাস ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ১১৬ এমএম সিএফডি পরিমাণ গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত উত্তোলন করছে। গ্যাস উত্পাদনের ভাগাভাগি চুক্তি (Production sharing contract-PSC) অনুযায়ী, শেভরনের ১০৬০ এমএম সিএফডি পরিমাণ গ্যাস উত্তোলনের কথা। কিন্তু ২০ জুন পর্যন্ত উত্তোলনের উপাত্ত থেকে জানা যায়, কোম্পানিটি ১১৬৭ এমএম সিএফডি পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করেছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের মোট গ্যাস উত্পাদনের (২২৫০ এমএম সিএফডি) অর্ধেকই উত্তোলন করে থাকে শেভরন। শক্তি বিশেষজ্ঞগণ আশংকা প্রকাশ করেছেন যে, এভাবে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস-উত্তোলন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে আমাদের গ্যাস দ্রুত হ্রাস পাবে এবং সাংগু ও বাখরাবাদের গ্যাস ফিল্ডের ন্যায় অন্যান্য গ্যাস-ক্ষেত্রগুলো নি:শেষিত হয়ে যাবে।
রাষ্ট্রপরিচালিত তেল, গ্যাস এবং খনিজ কর্পোরেশন পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, জালালাবাদ গ্যাস-ক্ষেত্রের উত্পাদন ক্ষমতা ২৩০ এমএম সিএফডি। কিন্তু শেভরন এ ক্ষেত্র থেকে ২৪২.৪ এমএম সিএফডি পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করছে। মৌলভীবাজার গ্যাস ক্ষেত্রের ৬০ এমএমসিএফডি গ্যাস উত্পাদনের ক্ষমতা থাকলেও শেভরন সেখান থেকে ৮৫.৮ এমএম সিএফডি পরিমাণ গ্যাস আহরণ করছে। একইভাবে বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডের ৭৭০ এমএম সিএফডি পরিমাণ উত্পাদন ক্ষমতায় তোয়াক্কা না করে সেখান থেকে ৮৪৭.৫ এমএম সিএফডি পরিমাণ গ্যাস মাত্রাতিরিক্ত উত্তোলন করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান শেভরনের অতিরিক্ত উত্তোলনে তেল সম্পদের কোন ক্ষতি হবে না বলে মন্তব্য করে শেভরনের পক্ষে, বাংলাদেশের গণমানুষের স্বার্থের বিপক্ষে তার মন্তব্য দিয়েছেন। তবে গত ২৩ জুন দেশের সর্বত্র গ্যাস সরবরাহের মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লি: এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমীনুর রহমান শেভরনের অতি-উত্তোলনকে দায়ী করেছেন। অতি-উত্তোলনের ফলে সহজেই অনুমান করা যায় এমন অতি-উত্তোলনের কারণে ভবিষ্যতে আরো গ্যাস সরবরাহে বিপর্যয় ঘটবে। অতি-উত্তোলন ছাড়াও ভুল খননকার্যের জন্যও গ্যাস উত্পাদনে বিপর্যয় ঘটবে। গত ১৯ জুলাই পত্রিকায় প্রকাশ, রাশিয়ান কোম্পানি গাজপ্রমের ভুল কূপ-খননের কারণে তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস উত্পাদনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন গ্যাস সম্পদ নি:শেষিত যাওয়ার অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় অন্বেষণ করা। অনতিবিলম্বে শক্তি বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক গ্যাস বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের জাতীয় গবেষণা কমিটি গঠন করে নিবিড় অধ্যয়ন করা সময়ের দাবী। দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় সম্পদের উত্পাদন, বিতরণ, সংরক্ষণে অভিন্ন জাতীয় ঐক্য তৈরি করা। সরকার “ষড়যন্ত্রতত্ত্ব্ব” পরিহার করে তৈল-গ্যাস-জাতীয় সম্পদ রক্ষাকারী আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো পর্যালোচনা করে জাতীয় সম্পদ নীতিতে তা অন্তর্ভুক্ত করলে দেশের এক স্মরণীয় অধ্যায় রচিত হবে। আমাদের বিজ্ঞান বিভাগের তরুণ গ্রাজুয়েটদেরকে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় হতে তৈল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও ট্রেনিং এর জন্য বৃত্তি চালু করা দরকার। আস্তে আস্তে গ্যাস ও তেল উত্তোলনে আমাদের নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে আমাদের কর্মী, বিজ্ঞানী, উত্তোলন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টিতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। এ দায়িত্ব সরকারের, বিরোধী দলের। এ দায়িত্ব নাগরিকদের প্রত্যেকের এবং সকলের।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
mramin 68 @yahoo.com
