রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকট, ঋণ কেলেংকারিসহ নানা কারণে দেশের বিনিয়োগে মন্দাভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। দেশে মোট বিনিয়োগের সিংহ ভাগ আসে ব্যাংকিং খাত থেকে। গ্রাহকের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। ফলে ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে অলস টাকার পরিমাণ ৭২ হাজার কোটি টাকার গিয়ে ঠেকেছে। তাই ব্যাংকগুলো আমানত নিরুত্সাহিত করতে আমানতে সুদের হার কমিয়ে দিয়েছে। কিছুদিন আগেও যেখানে ব্যাংকগুলো আমানত টানতে ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদ গুনেছে, সেখানে আমানতের বিপরীতে এখন সুদের হার ৯ থেকে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশে কমিয়ে এনেছে। অনেকক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদী আমানতের (এফডিআর) নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেও গ্রাহকদের নোটিস করা হচ্ছে সুদ হার কমানোর। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনতে এর বিকল্প ছিল না বলে জানান ব্যাংকাররা। আর এ অবস্থাকে বিনিয়োগ মন্দার সবচেয়ে বড় লক্ষণ হিসেবেও তারা উল্লেখ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকগুলো যদি ঋণ বিতরণ করতে না পারে, তাহলে আমানত নিয়ে কি করবে। বর্তমান বিনিয়োগ না থাকায় ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার কমাচ্ছে। আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় ঋণের সুদও কমতে বাধ্য। তবে ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে যে ক্ষতিতে পড়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য ঋণের সুদহার নাও কমাতে পারে। তাই ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। নতুন যেসব ঋণ দেয়া হচ্ছে, তার গুণগত মানও ভালো হতে হবে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি যেহেতু কম এজন্য সার্বিকভাবে সুদের হারও কম হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকাংশ ব্যাংকই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েই আমানতের সুদ হার কমাচ্ছে। যা ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন শাখায় টানানো হয়েছে ও ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরাও এ অবস্থার কথা জানিয়েছেন। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলো নিজস্ব নীতিমালার আলোকে আমানত ও সুদহার নির্ধারণ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমানতের সুদহার নির্ধারণে এমন অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছিল যে, মাত্র কয়েক মাস আগে ঘোষণার চেয়ে বেশি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করায় ১৭ ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীকে সতর্ক করে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। আর সে প্রতিযোগিতা থামাতে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি কয়েক দফায় মিটিংও করেছিল। কিন্তু কোন কিছুতেই কোন ফল হয়নি সে সময়। অথচ গত দুই মাস ধরে পাল্টে গেছে সে চিত্র। এখন কত কম সুদে আমানত রাখা যায় সে চেষ্টা করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।
ব্যাংকাররা বলছেন, বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে উত্পাদনশীল খাতে ব্যাংক বিনিয়োগ করে থাকে। কিন্তু চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গ্যাস-বিদ্যুত্ সঙ্কটে আশঙ্কাজনকভাবে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ কয়েকটি ব্যাংকের বড় বড় জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশের পর ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন, ব্যাংকের মুনাফা কমে যাওয়া ব্যাংকগুলো ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতের প্রবৃদ্ধি স্তিমিত হয়ে পড়েছে। আর এ অবস্থাকে ব্যাংকিং খাতের ক্রান্তিকাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০১০ সালের শেয়ারবাজারে বড় ধস এবং ব্যাংকগুলোর বেপরোয়াভাবে ঋণ বিতরণের ফলে ২০১১ সাল থেকেই ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট প্রকট হয়ে উঠে। ফলে ২০১২ সালের শুরুতে সাড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করতে থাকে ব্যাংকগুলো। এ বছরের শুরুতেও এ ধারা অব্যাহত ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়া ও বিনিয়োগে মন্দার কারণে ব্যাংগুলো ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে ব্যাংকের শাখাগুলো। ফলে প্রায় সকল ব্যাংকেই বিপুল পরিমাণে অলস টাকা পড়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ৭২ হাজার কোটি টাকার উপরে অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। বর্তমানে সিংহভাগ ব্যাংকের স্বল্প মেয়াদি আমানতের সুদ হার ১২ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে নেমে এসেছে। দুই মাস আগেও যা ছিল ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। ঢালাওভাবে আমানতের সুদ হার কমালেও ঋণের সুদ হারে এর প্রভাব পড়ছে না বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই। অবশ্য চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ঋণের সুদ হারও কমে আসতে বাধ্য বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এবিবি-র চেয়ারম্যান ও এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আমীন বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের ৭২ হাজার কোটি অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে। তবে এর মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকা বিল ও বন্ডের মাধ্যমে দেয়া আছে। এজন্য আমরা ব্যাংকাররা বলছি বর্তমানে ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। দেশের অর্থনীতির আকার অনুযায়ী এটাও অনেক বেশি। বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ বেকার পড়ে থাকায় ব্যাংকগুলো তাদের ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে। তিনি বলেন, গত মাস পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধি যেখানে ২০ শতাংশ ছিল সেখানে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। আমদানি কমে যাওয়াসহ নানাবিধ কারণে ব্যাংকিং খাতে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাই ব্যাংকগুলো খুব বিপদে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার কমালেও ঋণের সুদের হার কমাচ্ছে না বলে যে অভিযোগ রয়েছে সে বিষয়ে তিনি বলেন, ঋণের সুদের হারও কমছে। আর এটা তো রাতারাতি বোঝা যাবে না।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলো নিজস্ব নীতিমালার আলোকে ঋণ ও আমানতে সুদ হার নির্ধারণ করতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর প্রতি কোন হস্তক্ষেপ করে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক নীতি অনুযায়ী সুদহার নির্ধারণ করে থাকে। তিনি বলেন, এখন পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকগুলো আমানতে সুদের হার কমিয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে শিগগিরই ঋণের সুদের হারও কমে আসবে।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম এহসানুল হক বলেন, ব্যাংকগুলোর তারল্য সহায়তা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যে অর্থ দেয় তার সুদের হার সাত শতাংশ। অন্যদিকে কলমানি মার্কেটেও সুদের হারও সাত থেকে আট শতাংশ। এ অবস্থায় নতুন করে আমানতের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে স্থায়ী আমানতের সুদহার একই অবস্থানে রেখেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। তবে এসব ব্যাংকগুলোর অন্যান্য দিক থেকে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সবদিক বিবেচনায় বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত খাতের বেসিক ব্যাংক। এসব ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে যোগ্য ও সত্ লোক নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে সরকার খেয়াল না রাখায় এ অবস্থার তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে সবসময় থাকেন বাণিজ্য সচিব, কিন্তু কি এমন পরিস্থিতির তৈরি হলো যে, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হলো। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এমডি, ডিএমডিসহ অন্য বড় পদগুলোতে সচেতনভাবে নিয়োগ দিলে ব্যাংকগুলো অনেক ভালভাবে চলবে বলে তিনি মনে করেন।
