ডিসিদের তিন দিনের সম্মেলন আজ শুরু

আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৩, ২৩:০১
আজ ঢাকায় শুরু হচ্ছে তিনদিনের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন। এটি হবে ডিসিদের সঙ্গে বর্তমান সরকারের শেষ আনুষ্ঠানিক বৈঠক। বিগত সাড়ে চার বছরে চারবার ডিসিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক মন্ত্রীদের সঙ্গে। এসব বৈঠকে তাদের কাজের ক্ষেত্রে অন্তত ২৫০টি বাধা চিহ্নিত করে তা দূর করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি। আজকের সম্মেলন উপলক্ষে গতকাল সোমবার মন্ত্রী পরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঞা সাংবাদিকদের কাছে সম্মেলনের উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলেন। তিনি সম্মেলনের বিস্তারিত কর্মসূচিও জানান। এ সরকারের শুরু থেকে সর্বশেষ ২০১২ সালে উল্লেখিত সমস্যার মধ্যে তিনটি বিষয়ের ওপর ডিসিরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এ তিনটি বিষয়ের একটিও সমাধানে সরকার কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে ডিসিদের মধ্যে ক্ষোভ আছে, আছে হতাশাও। তবে চাকরির শৃঙ্খলার স্বার্থে তারা ক্ষোভ-হতাশার প্রকাশ সেভাবে ঘটাতে চান না বলেই সরকার হয়তো তাদের সুপারিশগুলো উপেক্ষা করছে বলে মনে করেন অনেক ডিসি। প্রথমত, বিচার বিভাগ আলাদা হয়ে যাওয়ার পর দৃশ্যমান আইন-শৃংখলা রক্ষার অনেক কাজই ডিসিদের ওপর ন্যস্ত। সেজন্য ১৯২টি আইনের তফসিল বাস্তবায়নের কাজ ডিসিদের ওপর রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এসব কাজের বাস্তবায়ন করে থাকেন। কিন্তু বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কোন অপরাধী যদি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনেও অপরাধ করে তা অস্বীকার করে, সেক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন না। এই আইনটি সংশোধন করে ম্যাজিস্ট্রেটদের সংক্ষিপ্ত বিচারিক ক্ষমতা দেয়ার সুপারিশ করে আসছেন তারা। এখন যা করতে হয় তা হচ্ছে, প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে দোষ স্বীকার না করলেও অনেকটা গায়ের জোরে চালাতে হয় মোবাইল কোর্ট-এমন কথা বলছেন ডিসিরা। যদিও গায়ের জোরে আইন বাস্তবায়ন আইনেরই গুরুতর লঙ্ঘন বলে স্বীকার করছেন ডিসিরাই। কিন্তু দেশ ও সরকারের স্বার্থ রক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে এমনটাই করতে হয়-যা তারা নিজেরাও করতে চান না। দ্বিতীয়ত, আইন-শৃংখলা রক্ষার ক্ষেত্রে পুলিশের কাজ তদারকির ভার ডিসিদের ওপর দেয়ার দাবিও রয়েছে। তবে এ দুটি সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ ও পুলিশের পাল্টা যুক্তি থাকায় এ নিয়ে সরকার এগোতে চায় কম। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে ডিসিদের কোনও ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। সম্পূর্ণ রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে শিক্ষাঙ্গন। বিশেষ করে বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ সরকারি দলের নেতাদের হাতে। এ অবস্থায় প্রায় সর্বত্রই নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা ধরনের অভিযোগ উঠছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শিক্ষা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে ডিসিদের সুপারিশ ছিল, শিক্ষকদের পাঠদানের যোগ্যতার ক্ষেত্রে ডিসিদের দিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন নেয়া হোক। কিন্তু সে আদেশও দেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। উল্টো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব কাজ স্থানীয় এমপির নির্দেশমতো চলবে এমন আদেশই দেয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচন হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডিসিদের এ বৈঠক হবে খু্বই গুরুত্বপূর্ণ ও তাত্পর্যপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তার অভাব থাকায় আগামী সাধারণ নির্বাচনে ডিসিরাই থাকবেন রিটার্নিং কর্মকর্তা-এমন আভাস ইতিমধ্যেই ইসি থেকে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া সংবিধান অনুযায়ী যদি নির্বাচন হয় আর বিএনপির বর্তমান অবস্থান বজায় থাকে-সেক্ষেত্রে নির্বাচন অনুষ্ঠানে ডিসিদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান ডিসিদের অনেকেই তখন মাঠে থাকবেন। দেখা যাচ্ছে, গত বছর ডিসি সম্মেলনে উত্থাপিত ৫৩৩টি সুপারিশের মধ্যে ৪৮৬টি বাস্তবায়িত হয়েছে। মন্ত্রী পরিষদ বিভাগসূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন এ ডিসি সম্মেলন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েই অনুষ্ঠিত হবে ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তিনদিনে আলাদাভাবে মোট ২০টি অধিবেশন হবে। প্রতিটি অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সচিব উপস্থিত থেকে তাদের সমস্যার কথা শুনবেন এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দেবেন। ডিসিদের করা সুপারিশগুলোর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সুপারিশের উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, মোবাইল কোর্টের অধীনে ফেনসিডিল সেবন, বহন ও বিক্রির অপরাধে বিচার করার সুযোগ নেই। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। এ সংক্রান্ত অপরাধ বিচার করার বিধান রেখে আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেন যশোরের জেলা প্রশাসক মুস্তাফিজুর রহমান। যথাসময়ে পুলিশ ফোর্স না পাওয়ায় মোবাইল কোর্ট কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে বলে উল্লেখ করে আলাদা পুলিশ ইউনিট অথবা মোবাইল কোর্ট পুলিশ গঠন করার সুপারিশ করেছেন চট্টগ্রাম, যশোর ও শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক। এছাড়া মোবাইল কোর্ট আইনের আওতায় বিধিমালা প্রণীত না হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে এর কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে বলে ডিসিদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত মোট ২৪৩টি সমস্যা চিহ্নিত করেন ডিসিরা। এসব সমস্যার ওপর সবচেয়ে বেশি (৩৩টি) প্রস্তাব এসেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত। আর একটি করে প্রস্তাব আসে শ্রম ও কর্মসংস্থান, পররাষ্ট্র, বস্ত্র ও পাট, ধর্ম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সম্পর্কিত চারটি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে, কোনো এনজিও অবৈধ কাজে জড়িত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার জেলা প্রশাসকদের নেই। জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে জেলা পুলিশ, জেলা বিশেষ শাখা, আনসার ইত্যাদি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে দায়িত্ব পালন করতে হয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিবেদন পান না জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ৩৩টি প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তারা একনাগাড়ে মাঠ প্রশাসনে কর্মরত থাকায় সচিবালয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও কাজের মান উন্নয়নে সচিবালয় ও মাঠ প্রশাসনের কাজ সম্পর্কে সম্যক ধারণা ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।