পাঠ্যক্রমে ‘জাতীয় ইতিহাস’ অন্তর্ভুক্তি প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৩, ২১:১৯
সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের ‘সঠিক ইতিহাস’ জানাইতে সরকার উদ্যোগী হইয়াছেন। শিক্ষার সকল স্তরে ‘জাতীয় ইতিহাস’ নামে একটি নূতন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করিবার সুপারিশ করিয়াছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এই জাতীয় ইতিহাসের সময়কাল হইবে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন হইতে শুরু করিয়া ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগের শাসনামল পর্যন্ত। বৈঠকে স্নাতক পর্যায়সহ শিক্ষার সকল স্তরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রাধান্য দিয়া নূতন বিষয় চালু করিবার যে সুপারিশ করা হইয়াছে, তাহার সহিত মন্ত্রণালয় সহমত পোষণ করিয়াছে। ইহার সহিত সরকারি কলেজসমূহে ইতিহাস বিষয়ে নূতন সহকারী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ সৃষ্টির সুপারিশও করা হইয়াছে। ঘটনাপ্রবাহের মধ্যদিয়া মনোযোগের বিষয়টি হইল মুক্তিযুদ্ধের ‘সঠিক ইতিহাস’। অর্থাত্ চার দশক পূর্বে যে গৌরবময় ঘটনায় আমরা স্বাধীন হইয়াছিলাম, তাহার ‘সঠিক ইতিহাস’ লইয়া এই ৪২ বত্সরের ব্যবধানেই ‘সন্দেহ’ ও খুঁত ঢুকিয়া পড়িয়াছে। ইতিহাস শাস্ত্রের জনক হিরোডোটাস ইহার উদ্দেশ্য লইয়া বলিয়াছিলেন, ‘যা সত্যিকার অর্থে ছিল বা ঘটিয়াছিল’ তাহার সম্পর্কে অনুসন্ধান করা। বাংলায় ‘ইতিহাস’ শব্দের অর্থ হইল—পূর্বে ঠিক যাহা ঘটিয়াছিল, তাহার অবিকল বর্ণনা। মুশকিলটা এইখানেই। ইতিহাস সকল সময়ই বিজয়ীর গুণকীর্তন করিয়া থাকে। তাহার কারণও স্পষ্ট—ইতিহাস লিখিয়া থাকেন বিজেতারই দল। তাই সর্বার্থেই বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ‘সঠিক’ বিশেষণখানি এত সহজেই সঠিকরূপে পরিগণ্য করা যায় না। নানা সময় অভিযোগ শুনিয়াছি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতি ও অতিরঞ্জন লইয়া। অর্থাত্ নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিতরে ক্ষমতাধারীরা একবার নাকি এই ইতিহাসের বিকৃতি ঘটান, আবার অন্যপক্ষ তাহার অতিরঞ্জন ঘটান। আমাদের গৌরবময় ইতিহাসকে এইভাবে নিজেদের মতো করিয়া কুক্ষিগত করিবার এই মানসিকতা ইতিহাসের সংজ্ঞার সহিত সাযুজ্যপূর্ণ নহে। ইতিহাস হইল ‘এরিয়াল ভিউ’য়ের মতো। অর্থাত্ পাখির চোখে দেখা, যাহা পুরা অঞ্চলের দিগ্বলয় একসঙ্গে চোখের সীমানায় লইয়া আসিতে পারে। এখানে পাখি হইল সময়। সমকালীন সময়ের বৃত্তের ভিতরে দাঁড়াইয়া আমরা ওই সময়টির ইতিহাসকে অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে অনুধাবন করিতে পারি না। যেইহেতু মানুষের সাফল্য ও ব্যর্থতার বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধানই ইতিহাসের চর্চিত বিষয়, তাই তাহা মানব সভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ। ইতিহাস হইতে শিক্ষা লইবার প্রবাদটিও তাই আমাদের নিকট অতি মূল্যমান, কারণ তাহা ভুল হইতে শিক্ষা লইবার উদাহরণটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া দেয়; নিজেদের পরিমার্জিত, সংশোধিত হইবার বাণী শোনায় কানে কানে, নচেত্ তাহার পরিণামও স্মরণ করাইয়া দেয়। সুতরাং ইতিহাসকে সঠিকরূপে বিনির্মাণ করিবার গুরুত্ব সীমাহীন নিশ্চয়ই। প্রাচীন বা মধ্যযুগের ইতিহাস নানা সীমাবদ্ধতায় অনেকাংশেই ঝাপসা ছিল বিধায় ঐতিহাসিকরা বহুলাংশেই কল্পনার আশ্রয় লইতেন। কিন্তু মাত্র ৪২ বত্সর পূর্বের ইতিহাসকে বিকৃত বা অতিরঞ্জিত করিবার সুযোগ নাই এই আধুনিক সময়ের কারণেই। হয়তো সাময়িকভাবে তাহার ওপর বিভ্রান্তির কুজ্ঝটিকা ছড়াইয়া দেওয়া যায়, কিন্তু মহাকালের আরশীতে তাহা মিলাইতে সময় লাগে না। কেননা, এই সময়ের ঘটনার পরম্পরা লিপিবদ্ধ রহিয়াছে ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে ও মাধ্যমে, ঐতিহাসিকরা তাহা মুছিয়া দিবেন কী করিয়া? সুতরাং ইতিহাসের বিকৃত বা অতিরঞ্জন লইয়া আশঙ্কিত হইবার কিছু নাই। বরং যাহারা এই কর্মের সহিত যুক্ত থাকিবেন, তাহারাই নিক্ষিপ্ত হইবেন ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে। এক্ষণে সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের ‘জাতীয় ইতিহাস’ পাঠ্যক্রম চালু করিবার পরিকল্পনাখানি নিঃসন্দেহে সকরের সাধুবাদ পাইবে।