সাম্প্রতিককালে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদ হার কমালেও ঋণের সুদ হার কমায়নি। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা ধরে রাখতে ঋণের সুদ কমানো যাচ্ছে না। ঋণের উচ্চ সুদের কারণে উত্পাদনশীল খাত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনিতেই গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় শিল্পখাত ধুকে ধুকে চলছে। ঋণ নিয়ে অনেকে শিল্প-কারখানা গড়লেও জ্বালানি সংকটে কারখানা চালু করতে পারেননি। অথচ উচ্চ সুদসহ ব্যাংকের ঋণের কিস্তি ঠিকই শোধ করতে হচ্ছে।
জানা গেছে, ব্যাংকের পরিচালন আয়ের মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পরিচালন ব্যয় থাকা উচিত। উন্নত বিশ্বে এ হার সাধারণত ৩০ শতাংশের মধ্যে থাকে। অথচ ২০১২ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর পরিচালন আয়ের ৪৪ শতাংশই (গড়) চলে গেছে পরিচালন ব্যয়ে। ২০১১ সালে এ হার ছিল ৪০ শতাংশ। অর্থাত্ পরিচালন ব্যয় ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে।
ব্যাংকের পরিচালন আয়-ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১২ সালে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১১ শতাংশ। অথচ পরিচালন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ হারে। এ কারণে মুনাফা ধরে রাখতে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ কমানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নিচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংকাররা বলেন, এমনিতেই ঋণ প্রদানের হার কম, তার ওপর ঋণের সুদ হারও কমানো হলে অনেক ব্যাংকের মুনাফায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। ফলে ব্যাংক মালিকদের সন্তুষ্ট রাখতে ঋণের উচ্চ সুদ হার অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উচ্চ সুদের কারণে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়ে পড়ছে। জ্বালানি সংকটের সঙ্গে উচ্চ সুদ পরিস্থিতিকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছে যে বিদ্যমান শিল্প বিনিয়োগকারীরা বড়ই বিপাকে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগকারীরাও ভয়ে এমুখো হয়নি। যা সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জানা যায়, অতিরিক্ত তারল্যের কারণে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদ হার কমাচ্ছে। কিন্তু ঋণের সুদ হার কমানোর কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অনেকক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় খরচ করে থাকে। আর এসবের মাসুল গুনতে হয় শিল্প উদ্যোক্তাদের। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তেমন কোনো নজরদারির সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু নৈতিকভাবে উদ্বুব্ধ করতে পারে।
তবে বাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই ঋণের সুদ হার সামনে কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করেন এবিবির চেয়ারম্যান ও এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরুল আমীন।
সাম্প্রতিক সময় দেশের বেশিরভাগ ব্যাংকেরই মুনাফা কমেছে। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে তারা ঋণের সুদ হার বেশি রাখতে চাইবে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নজরদারি রাখতে হবে বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় ঋণের সুদও কমতে বাধ্য। তবে ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে যে ক্ষতিতে পড়েছে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য ঋণের সুদহার নাও কমাতে পারে। তাই ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংককে নৈতিক পরামর্শ অব্যাহত রাখতে হবে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বিশ্বের কোথাও এত বেশি সুদ নেই। আবার এটাও সত্য যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছে করলেই ব্যাংকগুলোর ওপর সুদ হার কমানোর নির্দেশনা আরোপ করতে পারে না।
