সরকারি সেবা প্রদানে পদ্ধতিগত ক্রটির কারণেই অধিকাংশ দুর্নীতি সংঘটিত হচ্ছে। একই কারণেই বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সেবা প্রদানে দীর্ঘসূত্রিতা হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনে এমন মন্তব্য উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার রাষ্ট্রপতির কাছে কমিশন সরকারি সেবাদান প্রতিষ্ঠানসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি খাতের দুর্নীতির উত্স ও প্রতিকার সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে ভূমি ব্যবস্থাপনা, পাসপোর্ট প্রদান সহজীকরণ, স্বাস্থ্য, আয়কর, হিসাবরক্ষণ অফিসসমূহ, বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, সরকারি নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তি, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, আইন-শৃঙ্খলা, মন্ত্রণালয়ের কার্য উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুর্নীতি-অনিয়ম এবং জনহয়রানির সম্ভাব্য উত্সসমূহ চিহ্নিত করে দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধের জন্য শতাধিক সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমি রেজিস্ট্রেশন, ভূমি অধিগ্রহণ, নামজারি, ভূমি-কর, ভূমি রেকর্ড, খাস জমি, পরিত্যক্ত ও অর্পিত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি এবং দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। এসব থেকে মুক্তির জন্য ১৯০৮ সালের ভূমি রেজিস্ট্রেশন আইনের সংশোধন করাসহ ভূমি সংক্রান্ত দপ্তরসমূহকে একই ছাতার নিচে আনার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। পাসপোর্ট সেবার দুর্নীতির ব্যাপারে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দালালের দৌরাত্ম্য, যাচাই কার্যক্রমে পুলিশ কর্তৃক ঘুষ গ্রহণ, জনশক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতির সুযোগ নিচ্ছে। এ থেকে মুক্তির উপায় পাসপোর্টের আবেদনপত্র, ছবি সত্যয়ন, পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রথা বিলুপ্ত করা এবং পাসপোর্টের মেয়াদ ১০ বছর করা। এছাড়া অধিদপ্তরে ‘ওয়ানস্টপ-সার্ভিস’ চালু করা।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, চিকিত্সা সেবায় অনিয়মের ব্যাপারে দুদকে নিয়মিত অভিযোগ আসছে। চিকিত্সা কেন্দে চিকিত্সকদের অনুপস্থিতি, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়, ক্রয়কৃত পণ্যের দাম বহুগুণ বেশি দেখানো, দামি কোম্পানির যন্ত্রপাতি বলে নিম্নমানের কোম্পানির মালামাল ক্রয়, ওষুধ ক্রয় ও সরবরাহ, যন্ত্রপাতি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার না করে বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালগুলোকে অনৈতিক ব্যবসা করার সুযোগ সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, আয়কর বিভাগের দুর্নীতি-অনিয়মের ব্যাপারে বলা হয়েছে আয়কর বিভাগে করদাতার তথ্য, রিটার্নের তথ্য, কর আদায়ের তথ্য সংক্রান্ত সকল রেজিস্টার ম্যানুয়ালি সংরক্ষণ করা হয়, ফলে রেজিস্টার কারসাজির মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে বিমান ক্রয় ও বিমান লিজ খাতে দুর্নীতি হচ্ছে বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান, বিমানের অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্টস, বড় অঙ্কের ক্রয় এবং লিজের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়ে থাকে। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং খাতসহ আরো ৭টি খাতে দুর্নীতি হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সরকারি সংস্থার কর্মে নিয়োগে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ কমিশনে প্রায়শ এসে থাকে। নিয়োগ দুর্নীতি প্রতিরোধে সংবিধানের ১৩৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আরো সরকারি কর্ম কমিশন প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। প্র্রতিবেদনে আইন-শৃঙ্খলা সেবার দুর্নীতি নিয়ে বলা হয়েছে, সেবাপ্রার্থী নাগরিকগণ থানা থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার সেবা পাচ্ছেন না মর্মে অহরহ অভিযোগ পাওয়া যায়। হয়রানি, আচরণগত, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অভিযোগও পাওয়া যায়।
