ছুটির ফাঁকে নিজেকে চেনা

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০১৩, ১৬:৫৪
শহরের তরুণদের বেশির ভাগই দেশের অন্য জেলা থেকে আগত, যারা পড়াশোনা বা জীবিকার প্রয়োজনে রাজধানী শহরে এসে ঘাঁটি গাড়ে। কিন্তু তাদের মন পড়ে থাকে শেকড়ে। আত্মীয় প্রাণের পরশহীন কারাগারের এই শহর ছেড়ে ছুটির টিকেট হাতে সবাই ফিরতে শুরু করে আশীর্বাদ ও স্নেহের কাছে। ঈদ আনন্দের এই শুভক্ষণে নিজেকে বদলে ফেলার সুযোগ কমবেশি সবার কাছেই আসে। নিছক আড্ডা কিংবা বন্ধুদের সাথে অযথা হাসি নয়, অবসরের আগামী দিনগুলোতে নিজের কর্মপন্থা নিবারণ করার পাশাপাশি নিজের ত্রুটিগুলোকে শোধরে নেওয়ার ইচ্ছাটা এখনই জমা করা যেতে পারে প্রতিশ্রুতির বুক পকেটে। তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের ভাবনায়, আসছে দিনগুলোতে নিজেকে বদলে ফেলার কর্মপন্থা নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন তাহের মানিক ঈদে সবাই ঘরে ফেরে। যে তরুণ দামি চাকরি করে সে যেমন ফেরে তার বাবা-মা, পরিজনের কাছে উচ্ছল হাসি নিয়ে, তেমনি শহরের পথে পথে ঘুরে ফেরা, চাকরি না পাওয়া ছেলেটিও ফেরে মা-বাবার দীর্ঘশ্বাসের অশ্রুতে। সবাই ঘরে ফেরে, সাধ ও সাধ্যের মাঝে নিজেকে রাঙিয়ে নেয় উত্সবের রঙে। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও লঞ্চ টার্মিনালে মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে নিদ্বির্ধায় নাম লেখায় সবাই বাড়ি ফেরার প্রতিযোগিতায়। এত হুলস্থূলের মাঝে যখন ইঞ্জিনের ধস্ ধস্ শব্দ নিয়ে রেলগাড়ি চলতে শুরু করে, তখন দিনের আলোয় ফেলে আসা শহরে যেন আর ফিরতে ইচ্ছে হয় না কিংবা রাতে যখন কামরা ভরা ঘুম আচ্ছন্ন করে রাখে সকল যাত্রীকে তখনও যেন চোখ জেগে থাকে জাম আর জামরুলের ছায়াঘেরা বাড়িতে ফিরবে বলে। কখন থামবে ট্রেন স্বপ্নের সেই স্টেশনে—যেখানে কত না পরিচিত মুখ। যাত্রীদের ব্যস্ততা, কুলি হাঁকাহাাঁকির মাঝেও নিশ্চয় কেউ একজন কাঁধে রাখবে হাত স্নেহ অথবা ভালোবাসায়। কত না আনন্দ এই ঘরে ফেরায়। হয়তো মনের আকুতি পাবে পূর্ণতা, কলসীর জলে ডুব-সাঁতার দিয়ে। বন্ধুদের সাথে হাট থেকে মাঝরাতে বাড়ি ফিরতে শোনা যাবে লক্ষ্মী পেঁচার ডাক, মেঠো ইঁদুর জোছনায় কুড়াবে খড় আরও কত কিছু। মায়ের আঁচলের গন্ধ, বাবার গম্ভীর নির্জন দ্বীর্ঘশ্বাসের মাঝে মনে পড়ে যাবে শৈশবের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা, অনুভূতিতে উঁকি দেবে প্রেম আর অপ্রেমের কাব্য। বাড়ি ফেরার এই অবসরে নিজেকে নিয়ে ভাবনার বড় একটি সুযোগ তৈরি হয়, কমবেশি সবার মাঝে। প্রত্যেক তরুণের মাঝেই থাকে স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন কখনও সফল হয় আবার কখনোবা হয় ব্যর্থ। বছরজুড়ে স্বপ্নপূরণ আর ব্যর্থতার হিসেব নিকেশটাও করা যেতে পারে এই সময়ে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণরা এই সময়টায় তাদের আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ কোর্সগুলো নিয়েও ভাবতে পারেন। ছুটির পর যদি পরীক্ষা থাকে তাহলে পরীক্ষার মানসিক প্রস্তুতিও এই সময়ে নিতে পারেন। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর প্রস্তুতি নিতে নিতেই হয়তো বসতে হতে পারে পরীক্ষার টেবিলে। ছুটিতে শুধু ক্লাসমেটদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় নয়; পড়াশোনার বিষয় নিয়েও আলোচনা করে নিতে পারেন। অবসরে নিজের আত্মসমালোচনা করে নিতে ভুলবেন না। নিজের ভুলগুলো, ত্রুটিগুলো শুধরে নিন। বছরের পুরোটা সময় যদি ডায়েরি লিখে থাকেন তাহলে সেই ডায়েরি নিয়ে বসে ঠিক করে নিন আপনার কী কী ভুল হয়েছিল। নিজের দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য সম্বন্ধে আবারও সচেতন হওয়ার সুযোগ বোধ হয় মেলে ছুটির অবসরেই। শুধু ঈদ কিংবা পূজা-পার্বণের ছুটি নয়, বছরের বিভিন্ন ছুটিতে নিজের আত্ম-সমালোচনা করাটা জরুরি। এতে নিজের আত্মবিশ্বাস অনেকবেশি বাড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কর্মক্ষেত্রে বরাবরই সবাই একে অন্যের সমালোচনা করে। এতে পারস্পরিক দূরত্ব তৈরি হয়। বন্ধুমহলে কিংবা কর্মক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবতে পারেন ছুটির ফাঁকে। তারুণ্যের অষ্টপ্রহরের ভাবনায় ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নিয়ে ভাবার সুযোগ খুব কমই থাকে। কিন্তু এটা কখনোই সচেতন কোনো তরুণের কাছে কাম্য নয়। ব্যক্তি থেকে পরিবারের, আর পরিবার থেকে সমাজ—সবক্ষেত্রেই দরকার দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা। যেমন বাড়ি ফিরে যদি দেখেন গ্রামের অতি পুরোনো স্কুলঘরটি ভেঙে পড়ছে তাহলে তার মেরামতের উদ্যোগ নেওয়াটা একজন তরুণ হিসেবে আপনার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। বাড়ি ফিরেই বন্ধুদের সাথে যখন-তখন আড্ডা দেওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে। এটা সত্যি যে অনেকদিন পর বন্ধুদের দেখা পেলে উচ্ছ্বাসের বাঁধ ভেঙে যায়। শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের প্রথম ভালোলাগা হয়তো মফস্বলের বন্ধুদের ঘিরেই থাকে, তাই তাদের সাথে আড্ডা দেওয়াটা বেশ লোভনীয় বটে। আড্ডার ফাঁকে বন্ধুদের বিভিন্ন কর্মস্থলের কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা জেনে নিতে পারেন, এতে করে আপনার ভাবনায় যুক্ত হবে অনেক কিছু। ছুটিতে নিজেকে শুধরে নেওয়াটা খুব দরকার। যদি কোনো বদভ্যাস থাকে, যেমন—সিগারেট আসক্তি, তাহলে সেই অভ্যাস পরিত্যাগ করতে পারেন ছুটিতে, নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়ার মাধ্যমে। ফিউচার প্ল্যানিং কিংবা ভবিষ্যত্ কর্মপরিকল্পনা ছুটির ফাঁকে করে নিতে ভুলে যাবেন না। তারুণ্যের অহর্নিশ স্বপ্নের বুননে ভবিষ্যতের সুতা থাকা জরুরি। যদি কোনো বিষয়ে ব্যর্থতা থাকে তাহলে সেখানে কী করে সফলতা আনা যায়, সেই বিষয়টি ভাবতে হবে। আর কোন কোন ক্ষেত্রে সফলতা আপনার হাতের মুঠোয় আসতে পারে, সে বিষয়েও ভাবেন। ছুটির ফাঁকে ভেবে নিন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ খোলার পর কী কী কোর্সের নোট করে নেবেন। পরীক্ষার কথাটাও বারবার মনে রাখাটা জরুরি। ছাত্রজীবনে পড়াশোনা করে পাশাপাশি যদি কেউ চাকরি বা ব্যবসা করে থাকেন, তাহলে ছুটির পর তারও একটি কর্মপন্থা করে নিতে পারেন।