ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার তিন বত্সর যাবত্ স্থগিত হইয়া থাকা শান্তি আলোচনা অচিরেই শুরু হইতে পারে বলিয়া শুনিতে পাওয়া যাইতেছে। মূলত গত সপ্তাহে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সহিত যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন সেক্রেটারি জন কেরির বৈঠকের পর হইতেই মূলধারার মিডিয়াতে এই সম্ভাবনা লইয়া কথাবার্তা শুরু হইয়াছে। শান্তি আলোচনার পুনঃসূচনা হইবে কিনা তাহার এখন অবধি কোন নিশ্চয়তা নাই। কিন্তু আলোচনা হইলে ফল আসিবে কি? উভয় পক্ষের মধ্যে যেই মাত্রাতে মতদ্বৈততা বিরাজ করিতেছে তাহা আগে হইতে কমাইয়া না লইয়া আসিয়া কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করিয়া কোন ফল পাওয়া যাইবে তাহা লইয়া সন্দেহ করা যাইতেই পারে। অবশ্য, কোন কথা না হওয়া অপেক্ষা যাহা হউক কিছু একটা কথা হওয়া ভালো— একমাত্র এই ধরনের ভাবনাতে আস্থা থাকিলেই শান্তি আলোচনার বিষয়ে আশাবাদী হওয়া সম্ভব হইতে পারে।
জেরুজালেম, দুই-রাষ্ট্র ভিত্তিক এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলির দিকে তাকাইলেই ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মতদ্বৈততার মাত্রা স্পষ্ট হইয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েল জেরুজালেম ভাগের বিরুদ্ধে। ইসরায়েল এই স্থলকে ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের ধর্মস্থান এবং ইসরায়েলের রাজধানী রূপে দেখিতে চায়। পক্ষান্তরে, ফিলিস্তিন জেরুজালেমকে মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান হিসাবে গণ্য করে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে তাহার রাজধানী হিসাবে পাইতে চায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র মানিয়া লইবার কথা বলিলেও তাহার দল ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টি এবং কোয়ালিশন সরকারের অন্যান্য ডানপন্থী শরীকেরা ‘‘দুই রাষ্ট্র’’ সমাধানে বিশ্বাসী নয়। তাহারা পশ্চিম তীর হইতে অবৈধ বসত সরাইবারও বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিন ১৯৬৭ সালের পূর্বেকার সীমানাকে ধরিয়া গোটা পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেম লইয়া রাষ্ট্র গড়িতে চায়। বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হইয়া থাকা ফিলিস্তিনীদের ফিরাইয়া আনার ব্যাপারে ইসরায়েলের আপত্তি আছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ইহার মধ্যে ফিলিস্তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি ইসরায়েল রাষ্ট্র গড়িয়া উঠিবার আশঙ্কা করে। এইদিকে, ফিলিস্তিন সরকারি কথাবার্তাতে শরণার্থীদিগকে ফিরাইয়া আনিবার উপরে গুরুত্ব দেয়।
প্রশ্ন হইতেছে, জন কেরির দূতিয়ালিতে এইসব মতভেদ কমিয়াছে কি? সেই রকম কোন আলামত পাওয়া যাইতেছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, সমস্যার সমাধানে অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে যথাযথ মাত্রায় চেষ্টা-চরিত্র না করিয়াই শান্তি আলোচনায় উদ্যোগী হওয়ার মধ্যে মূল কার্যসিদ্ধি না হইবার সমূহ সম্ভাবনা না থাকিলেও সংশ্লিষ্ট দুই কর্তৃপক্ষ অর্থাত্ ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল প্রশাসন এমনকি প্রধান মধ্যস্থতাকারী যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনেরও কিছুটা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির ব্যাপারটিই মুখ্য হইয়া উঠিয়াছে। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কথাই ধরা যাক। মার্কিন ও তাহার মিত্রদের আর্থিক অনুদান নির্ভর এই কর্তৃপক্ষ কখনোই খুব একটা স্বাধীন অবস্থান লইতে পারে না। ইহাছাড়াও অর্থনীতিবিদেরা সামনের দিনগুলিতে ফিলিস্তিনের অর্থনীতি ভয়াবহ হইয়া উঠিবে বলিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন। এইদিকে, এখন অবধি মার্কিন প্রশাসনের আশীর্বাদ ধন্য হইলেও, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) হইতে বড় আঘাত পাইয়াছে ইসরায়েল। গত ১৬ তারিখে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে, অবৈধ ভূমি দখলে রাখা অবস্থাতে ইইউ-এর কাছ হইতে কোন সাহায্য-সহযোগিতা পাইবে না ইসরায়েল। মনে করা যাইতে পারে যে, এইসব কারণ ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল কর্তৃপক্ষকে নিজ-নিজ দেশে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের দিকে ঠেলিয়া দিতে পারে। এমতাবস্থায় আলোচনা-সমালোচনা অন্যদিকে ফিরাইবার জন্য শান্তি আলোচনার বিষয়টিকে পুনঃজাগ্রত করাটা একটি উত্তম কৌশল বটে। এইদিকে, মিশর, সিরিয়া, ইরাকসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়িয়া মার্কিন নীতি একের পর এক মার খাইতেছে। এমন বাস্তবতায় শান্তি আলোচনা পুনঃসূচনায় মুরুব্বীর ভূমিকা পালন করিতে পারাটা মুখরক্ষাকারী হইবে বৈকি। কিন্তু সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আগাইয়া আনিবে কিনা তাহাই হইতেছে প্রশ্ন।
