‘অসম্মানের জীবন থেকে কারাবাস অনেক ভাল’

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৩, ২৩:৩৬
‘জীবনটাকে সুন্দরভাবেই সাজাতে চেয়েছিলাম। সে সুযোগও এসেছে খুব সহজে। যা অনেকের জীবনে কল্পনাতীত। কিন্তু একটা ছোট লোভের কারণে তা ধুলিসাত্ হতে শুরু করে। মাত্র দেড় লাখ টাকার জন্য হারাতে হয় ৮০ হাজার টাকার চাকরি। এরপর শুরু হয় দ্রুত জীবন পতনে ইতিহাস। গ্রাস করে হতাশা আর হতাশা। ডুবে যাই নেশার জগতে। তারপর বুঝতে পারি, আমি অন্ধকার জগতে তলিয়ে যাচ্ছি। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে পুলিশের হাতে ধরা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শত চেষ্টা করেও তা পারছিলাম না। শেষটায় বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশই আমাকে গ্রেফতার করে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ায় সত্যি আমি খুশি হয়েছি। ঝড় শেষে যেমন আকাশ শান্ত হয়, আমিও তেমনি শান্ত হব। যে অসম্মানের জীবন এতদিন বয়ে বেড়াচ্ছিলাম তা থেকে কারাবাস অনেক ভালো। যেদিন মুক্তি পাব, সেদিন থেকে নতুন মানুষ হিসেবে বের হব। আর প্রযুক্তিগত যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি- তা সত্ পথে ব্যবহার করার চেষ্টা করব। যদি আমাকে কেউ সুযোগ করে দেয়।’ কথাগুলো মো:সেলিমের। ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির অভি-যোগে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত ২৩ জুলাই যে চারজনকে গ্রেফতার করে, সেলিম তার অন্যতম। ডিবি পুলিশ তাদের তিন দিনের রিমান্ড নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করা মোঃ সেলিম। বাড়ি রংপুর কোতয়ালি এলাকায়। তিনি তার জীবন কাহিনী বলতে গিয়ে জানান, তিনি নিজের একান্ত চেষ্টায় কম্পিউটার বিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে সাইটেক নামে এক কম্পিউটার কোম্পানিতে হার্ডওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগদান করেন। এরপরই বিয়ে করেন। ২০০০ সালে ঐ প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দিয়ে যোগদান করেন টেক্সাস ইলেক্ট্রনিক্সের এটিএম ডিপার্টমেন্টে। মাসে বেতন পেতেন ৮০ হাজার টাকা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। পরে ঐ প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘আমরা টেকনোলজি”। এসময় সেলিম বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম সার্ভিস রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখাশুনা করতেন। তবে এ কাজ করার সময়ই তার অধঃপতনের শুরু। লোভের বশে ডাচ বাংলা ব্যাংকের তথ্য চুরি করে জাল ক্রেডিট কার্ড বানিয়ে দেড় লাখ টাকা উত্তোলন করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে চাকরি হারান। কিছুদিন পর আবারও ঐ ব্যাংকের বুথ থেকে একইভাবে টাকা চুরি করার সময় ধরা পড়েন। কয়েকমাস জেলবাসের পর মুক্তি মেলে। এরপর ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এডিএন নামে একটি কোম্পানিতে এটিএম মেশিন রিপেয়ার সেকশনে পার্টটাইম চাকরি নেন। কিন্তু কিছুদিন পর এডিএন কোম্পানি বিক্রি হয়ে গেলে তিনি আবারও বেকার হয়ে পড়েন। সেলিম জানান, বেকার হয়ে পড়ার পর তিনি নেশায় আসক্ত হন। প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ বোতল ফেনসিডিল লাগতো। আর নেশার টাকার জন্য ঘরের জিনিস পত্রও বিক্রি করতে শুরু করে। স্ত্রী সন্তানদেরও ফেলে দেন অভাবের মধ্যে। স্ত্রী বার বার তাকে ডিভোর্সও দিতে চেয়েছেন। সেলিম জানান, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে তিনি যে টাকা চুরি করেছেন, তার সবটাই খরচ করেছেন নেশার জন্য। টাকা ফুরিয়ে যাওয়ায় বাকিতে কিনেছেন প্রায় আড়াই লাখ টাকার ফেনসিডিল। কারণ ফেনসিডিল ব্যবসায়ীরা তাকে খুব বিশ্বাস করতো। তাদের টাকা কখনও তিনি বাকি রাখেননি। গত ২৩ জুলাই ডিবি এডিসি মশিউর রহমান ও সিনিয়র এসি মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি টিম রাজধানীর উত্তরা, মতিঝিল এলাকা থেকে সেলিম ও তার সহযোগী আরিফ হোসেন খান, মঞ্জুরুল হক ও আসাদুল ইসলামকে গ্রেফতার করেন। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন গোপন ক্যামেরা, কম্পিউটার, কার্ড রিডার, ম্যাগনেটিক ব্ল্যাংক স্টিপ কার্ড। আজ রিমান্ড শেষে গ্রেফতারকৃতদের আদালতে পাঠানো হবে।