কিছু কিছু মানুষ থাকেন তাদেরকে চাইলেও গণ্ডির মাঝে আবদ্ধ করা যায় না। সবকিছু ছাপিয়ে যাওয়ার প্রয়াস থাকে তাদের মধ্যে। আফতাব আহমেদ এমনই একজন যিনি সবকিছুতেই নিজের ইচ্ছেতে সম্পৃক্ত হয়েছেন, জানতে চেয়েছেন সেই বিষয়ের অনেক ভেতরকার দিকগুলোও। তিনি যখন আমেরিকা থেকে পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরেন, স্বভাবতই জ্ঞানগুলো হয়ে যায় আমাদের পাঠ্যবইকেন্দ্রিক। আফতাব আহমেদ সেই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠেছিলেন বেশ ভালোভাবেই। দেশে ফিরে প্রথমে কিছুদিন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও পরে চলে আসেন র্যাংগস গ্রুপের মিতসুবিশি মোটর বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে। তখন তিনি সব কাজে সিদ্ধান্তে পরামর্শ নিতেন সবার থেকে। সেটা হতেও পারে একজন কমবয়েসী কর্মকর্তার সাথে, যার হয়তো এই বিষয়ে জ্ঞান আছে। আর এই জড়তা দূর করে সবার সাথে সহজে মিশে যেতে পারেন বলেই আফতাব আহমেদ একজন দক্ষ ব্যবস্থাপকও বটে।
প্রজন্মের এই আইকন বেশ কয়েক বছর মিতসুবিশি মটরসের সাথে কাজ করেন। সেই সময়ে দেশের বাইরে থেকে ব্র্যান্ড নিউ গাড়িগুলো আসত সিংহভাগই সরকারি দপ্তরে। তিনি এই গণ্ডিটা ভাঙতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ব্র্যান্ড নিউ গাড়িগুলো তুলনামূলক কম দামে গ্রাহকদের হাতে তুলে দেন সরাসরি। আর এই যাত্রা অব্যাহত থাকার ফলেই কিন্তু আমাদের দেশে অনেক নামীদামি ব্র্যান্ডের গাড়ির অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। আফতাব আহমেদের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে র্যাংগস গ্রুপই তাকে দায়িত্ব দেয় তাদের রিয়েল এস্টেট সেক্টরে। র্যাংগস প্রপার্টিজ তখন উদীয়মান অবস্থায়, সেই সময়ে কোম্পানিটির পরিচালনায় সুনিপুণ দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। বেশ কয়েক বছর তিনি সেখানে চিফ অপারেটিং অফিসার পদে আসীন ছিলেন।
তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এই ব্যক্তিত্ব এরপর কিছুদিন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শপিং কমপ্লেক্স যমুনা ফিউচার পার্কের পরিচালক সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং পদে সুযোগ পান। অতঃপর সেখান থেকে যোগ দেন বর্তমান কর্মস্থল শান্তা প্রপার্টিজে, নান্দনিক নির্মাণশৈলী দিয়ে যারা ইতোমধ্যেই পৌঁছেছেন শীর্ষদের কাতারে। প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে আমাদের দেশে কাজ করে আসা এই প্রতিষ্ঠানে চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। নতুন করে যাত্রা শুরু তারপর। আর সে যাত্রায় সফল তিনি।
আফতাব আহমেদের কাছে প্রশ্ন ছিল, বাইরের দেশের মোহে কেউ আর ফিরে আসে না, তিনি কেন এসেছিলেন? উত্তরে আশার সঞ্চার করেছেন তিনি নতুন প্রজন্মের মাঝে। তিনি বলেন, ‘সেই সময়ই মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে কাজের সুযোগ অনেক বেশি, সামাজিক মূল্যায়ন আর আন্তরিকতাও বেশি। আর সবকিছুর চেয়ে বড় হলো, বাইরের দেশে যতই থাকেন না কেন, সেটা তো আর নিজের দেশ না। সেখানে কেউ তো আর এত আপন করে নিবে না। তেমনটার সুযোগও নেই। আমাদের দেশে সীমাবদ্ধতা থাকলেও স্বাধীনভাবে অনেক কিছু করার সুযোগও তো রয়েছে। নতুন দেশ হিসেবে আমাদের অগ্রগতি রীতিমতো ঈর্ষণীয় অনেকের কাছে।’ এই সুযোগের কথা ভেবেই তিনি চলে এসেছিলেন, আর সেই সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল বলেই মনে করেন তিনি।
এই সময়ের সফল এই ব্যবস্থাপকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, নিজের কাজ কীভাবে গুছিয়ে নেন তিনি? তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোও বা কীভাবে সাহায্য করে তাকে? আফতাব আহমেদ বলেন, ‘শেখার চেষ্টাটা থাকা দরকার সবার আগে। নতুন ধরনের কাজ এলে সেটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নিতে হবে। এই বিষয়ে অভিজ্ঞদের সাথে কথা বলতে হবে। আর এই জানার প্রয়াসে কোনো জড়তা থাকা যাবে না। তিনি মনে করেন, আগ্রহ থাকা দরকার যেকোনো বিষয়ে, প্রশ্ন করতে জানতে হবে, শুনতেও হবে অন্যের থেকে। আর এভাবেই কিন্তু আন্তঃযোগাযোগ তৈরি হয়। মনে রাখা দরকার, বই পড়েও শেখা যায়, আরও বেশি শেখা যায় মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে। একজনের জীবনের গল্প যতটা প্রাণবন্ত, বইয়ের থিওরি ততটাই নির্জীব।’ প্রসঙ্গত আফতাব আহমেদ বলেন, ‘তবে পড়াশোনাটা সবার আগে, এটার উপর ভিত্তি করেই বাকিটা তৈরি হবে। মানুষের নানারকম স্বপ্ন থাকে, সেটা বাস্তবায়ন করতে হলেও তো পড়াশোনার দরকার। এর কোনো বিকল্প নেই, এটিরই প্রাধান্য দিতে হবে সবার আগে।’
আফতাব আহমেদ মনে করেন, এই সময়ে এসে যোগাযোগ দক্ষতাটা বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া উচিত সবার। এর জন্য প্রথম দরকার নিজের সংকোচ কাটানো সবার সামনে। দ্বিতীয়ত কোনো কাজের আগে মনস্থির করে নিতে হবে সেইভাবে। আর একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, কে কোন ধরনের সেটা বোঝার চেষ্টা করতে হবে, তার সাথে যোগাযোগটা তৈরিও করতে হবে সেইভাবে। কেউ বুঝতে বেশি সময় নেবে, কেউ কম, কিন্তু নিজেকে শান্ত থেকে সেটা করতে হবে।
আফতাব আহমেদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম নতুন প্রজন্মর কাজ তার কেমন লাগে? তিনি মনে করেন, এটাই স্বাভাবিক যে এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্ম থেকে আলাদা হবে চিন্তাভাবনায়। আর পরবর্তী প্রজন্ম সবসময়ই একটু এগিয়ে থাকে এই যাত্রায়। তারা সময়কে ধরতে পারে, সেইভাবে কাজ করতে পারে। রিয়েল এস্টেট সেক্টরের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘বিশ বছর আগে জমি পেলেই বাড়ি হতো, দশ বছর আগে হয়তো মানুষ ভাবতে শিখেছে আর এখন তো সেই ভাবনাটা স্থপতিরা করে থাকেন। এই যে পরিবর্তন, এই যে বিবর্তন, সেটা ইতিবাচক। নতুন নতুন ভাবনাকে সাদরে গ্রহণ করলেই কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে সেটা আকর্ষণীয় হয়। আর সফল কিছু করতে গেলে তাদের সম্পৃক্ততা তো লাগবেই।’
আফতাব আহমেদ মনে করেন, নতুন প্রজন্মের সামনে অফুরন্ত সুযোগ, সেটা কাজে লাগাতে হবে। দিনকে দিন আমরা এগিয়ে যাচ্ছি বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সেই মাফিক যোগ্য লোক যোগ্য জায়গাতে নেই। কাজেই গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হয়ে কর্মমুখি শিক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে। কারিগরী শিক্ষাতেও জোর দেওয়া উচিত। শুধুই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিজনেস গ্র্যাজুয়েটরাই দেশ চালাবে তা নয়, দেশ গড়তে একজন সাধারণ দিনমজুরের দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেককে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেই পথ ধরে এগোতে হবে। আর বাংলাদেশ যে পথ ধরে এগোচ্ছে, অগুনতি সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে বিভিন্ন পেশায়।
বিনয়ী এই মানুষটা শৈশব থেকেই বড় হয়েছেন ব্যবসায়ী ঘরানার এক পরিবেশে। বাবা কন্সট্রাকশন ব্যবসাতে জড়িত ছিলেন, মাও সময় দিতেন ব্যবসাতে। দুই ভাই-বোনের মাঝে তিনি ছিলেন বড়। পারিবারিক স্নেহ আদর শাসনেই পুরান ঢাকার কায়েট টুলিতে তার বেড়ে ওঠা। এরপর অবশ্যি ধানমন্ডির দিকে চলে আসেন। ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি আর শাহীন কলেজ থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ এবং সাউথ ইস্ট মিসৌরী স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করেন তিনি। পারিবারিক জীবনে বাবা মা ছোট বোন আর স্ত্রী হাসিনা আক্তারকে নিয়ে বেশ সুখেই আছেন তিনি।
আফতাব আহমেদ স্বপ্ন দেখেন, দেশের সাধারণ মানুষের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় এই রিয়েল এস্টেট সেক্টর নিয়েই কাজ করবেন তিনি। এর মাধ্যমেই হয়তো অনেকে উপকৃতও হবে। আর তার সব কাজে কর্মে তিনি স্বকীয়তার ছোঁয়া রাখতে চান। আর আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বা মূল্যবোধের উপরে তো আর কিছু হতে পারে না। এই বিবেকবোধ থেকেই কাজ করতে চান তিনি, ঠিক যেমন একদিন ফিরে এসেছিলেন দেশে। একজন আফতাব আহমেদ কেবল একজন ব্যবস্থাপক বা সংগঠকই নন, দেশের অগণিত মেধাবীদের কাছে আদর্শ হয়ে থাকবেন সব সময়। দেশেই অফুরন্ত সম্ভাবনাকে গ্রহণ করে নিজের ভাবনায় এগিয়ে নিয়ে যাবেন আমাদেরকেও। আফতাব আহমেদ সেই আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে চলুক, এই শুভকামনা প্রজন্মের পক্ষ থেকে।
