বিশ্বব্যাপী তাঁর চিত্রকর্মের কদর। ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তী শিল্প-সংস্কৃতির জগতের অগ্রপথিক। তাঁকে বলা হয় ‘ভারতের পিকাসো’। তিনি শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পীই নন; কবি, ভাস্কর, বাড়ির নকশাকার হিসেবেও ছিল তাঁর খ্যাতি। আর এসবের বাইরে আরও একটি পরিচয় তাঁকে উজ্জ্বল করে রেখেছিল—চিত্রনির্মাতা। মকবুল ফিদা হুসেনের শিল্পকর্ম সময়কে জয় করেছে, আর সেই সময়ের নিয়ম মেনেই ২০১১ সালের ৯ জুন লন্ডনে তাঁর ৯৫ বছরের নশ্বর জীবনের যতি পড়ে। সমকালীন শিল্পীদের থেকে তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র, কারণ তিনি রং-তুলি-ক্যানভাসের ভেতরে নিজেকে আটকে রাখেননি। তাঁর প্রতিভার বর্ণচ্ছটায় আলোকিত হয়ে উঠেছিল শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যম।
ভারতের আধুনিক শিল্পকলার সেরা শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের জন্ম ১৯১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। পরাধীন ভারতের তত্কালীন বোম্বে প্রেসিডেন্সি এলাকার পান্ধারপুরে। অখ্যাত পান্ধারপুরের সেই শিশুটিই হয়ে ওঠে ভারতের সবচেয়ে দামি শিল্পী। বাবা ছিলেন তদানীন্তন ইন্দর রাজ্যের (বর্তমানে মধ্য প্রদেশ) কাপড়ের কলের কর্মী। ছেলেবেলা থেকেই ফিদা যা দেখতেন, তা-ই এঁকে ফেলতেন। ছেলের আগ্রহ দেখে বাবা তাঁকে ভর্তি করলেন এক আর্ট স্কুলে। তবে সেখানে মকবুল ফিদা হুসেনের মন টিকেনি। উনিশ শ’ সাইত্রিশে বাবা চলে এলেন মুম্বাইয়ে, শুরু করলেন ঘি’র ব্যবসা। তিনি চাইলেন ছেলেও ব্যবসা দেখুক। কিন্তু ফিদা রাজি হলেন না। ভর্তি হলেন জে জে আর্ট স্কুলে। এ স্কুলই পাল্টে দিল মকবুল ফিদা হুসেনকে। এখান থেকেই শুরু হলো তাঁর শিল্পী জীবন। তাঁর জন্য সহজলোভ্য ছিল না ছবি আঁকার সরঞ্জাম। এ সবের জোগাড়ের জন্য তিনি সিনেমার পোস্টার এঁকেছেন, লিখেছেন সাইনবোর্ড পর্যন্ত। অনেক দিন পর্যন্ত শহরের গ্রান্ট রোডের একটি গ্যারেজ ছিল তাঁর স্টুডিও। শত প্রতিকূলতাতেও থেমে থাকেননি ফিদা। থামিয়ে দেননি ছবি আঁকা। শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন ২০১১ সালের ৯ জুন লন্ডনে সমাপ্তি টানলেন তাঁর অসাধারণ আর বর্ণিল জীবনের। নিজস্ব মহিমায় ভাস্বর শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন সফল হয়েছিলেন, স্বতন্ত্র এবং নিজস্ব একটি জীবনধারা গড়ে তুলতে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত লম্বা তুলি হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, যেমনটা ফরাসি শিল্পী মাতিস তার লম্বা লাঠির ডগা দিয়ে, শিল্প জগতে রাজত্ব করতেন, বা স্প্যানিশ পরাবাস্তব শিল্পের ক্ষ্যাপা রাজা শিল্পী সালভাদর দালিও তাঁর জাদুর কাঠির মতো লম্বা তুলি নিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন সারা বিশ্বময়।
