আমেরিকার গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও শাসন ব্যবস্থা নিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা মুখে যাই বলুক না কেন তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের উচ্চ শিক্ষার প্রসঙ্গ এলে তাদের পছন্দের শীর্ষে থাকে সেই আমেরিকাই। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জি জিনপিংয়ের একমাত্র কন্যা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। জিনপিংয়ের মেয়ে জি মিনাগজে ২০১০ সালে হার্ভার্ডে ভর্তি হন অন্য নামে সাধারণ ছাত্রী হিসেবে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কে কিয়াংয়ের মেয়েও আমেরিকায় পড়াশোনা করেন। শুধু জিনপিং বা লি কে কিয়াংই নয়, চীনের অনেক নেতাই সন্তান ও নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেন বিশ্বের এক নম্বর ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকায়।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির নয় জন সদস্যের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ জনের সন্তান কিংবা নাতি-নাতনি আমেরিকায় পড়াশোনা করছেন কিংবা করেছেন। যদিও কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ বিশেষ সভায় এই নেতারাই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ব্যবস্থাসহ নানা প্রসঙ্গে একপ্রকার ধুয়ে ফেলেন অর্থনীতিতেও এক নম্বর আমেরিকাকে।
মুখে যাই বলুক চীনা নেতাদের পরিবারের সদস্যদের আমেরিকায় পাঠিয়ে পড়াশোনা করানোর অর্থ আমেরিকার শিক্ষা ব্যবস্থার উপর তাদের সমীহ রয়েছে। আমেরিকায় প্রতিবছর যত বিদেশি শিক্ষার্থী পড়তে আসে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হলো চীনারা। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে এক লাখ ৫৭ হাজার ৫৫৮ জন চীনা শিক্ষার্থী পড়তে যায় আমেরিকায়। যা আগামী ১৫ বছরে চার গুণ হবে বলে জানিয়েছে আমেরিকার ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন।
১৯৪৯ সালে ক্ষমতায় আসা চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সন্তানরা দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন না।
চীনের নেতারা দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা চীনের সরকারের ভেতর ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে এধরনের খবর প্রায়ই পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রধান সংবাদ হিসেবে আসে। কিন্তু চীনের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ছেলে-মেয়ে কিংবা নাতি-নাতনিদের দেশের বাইরে রেখে পড়াশোনা করানো এবং এর জন্য বিপুল অর্থ খরচ কী এই ইঙ্গিত দেয় না যে, ওই সংবাদগুলো একেবারে আজগুবি নয়।
হার্ভার্ডের টিউশন ফি এবং চার বছরের থাকা খাওয়ার ফি কয়েক লাখ ডলার। চীনের নেতাদের ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের ব্যয় নির্বাহ কে করে এই প্রশ্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে করেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।
কমিউনিস্ট পার্টির সর্বশেষ তিন শীর্ষ নেতার দুই জনেরই নাতি-নাতনি হার্ভার্ডে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৮৯ সালের জুনে তিয়ানানমেন স্কোয়ারে বিক্ষোভকারীদের উপর হামলার প্রতিবাদ করায় ঝাও জিয়াংকে গৃহবন্দী করা হয়। তার উত্তরাধিকারী জিয়াং জেমিন হার্ভার্ডে পড়াশোনা করেন।
ক্ষমতা থেকে উত্খাতের আগে বো জিলাইয়ের বার্ষিক বেতন ছিল ২০ হাজার ডলার। অথচ তার ছেলে লন্ডনের হ্যারো স্কুলে পড়েন যেখানে বার্ষিক খরচ ৪৮ হাজার ডলার। পরে বো জিলাইয়ের পুত্র বো গুয়াগুয়া হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। চীনের নেতা লি ইউআনচাওয়ের এক ছেলে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। চীনের আরেক নেতা ঝিয়া কিংলিনের এক নাতনি পড়াশোনা করে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। গত দেড় দশক ধরে চীনা নেতারা চাইছেন তাদের উত্তরাধিকারীদের পশ্চিমা বিশ্বের সর্বাধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে। তারপর দেশের দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দিতে চান তারা। এই প্রয়াসের অংশ হিসেবে তারা আগে শুধু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সন্তান কিংবা নাতি-নাতনিকে পাঠাতেন। ধীরে ধীরে তারা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ এবং ইউনিভার্সিটি অব টোকিওতে পাঠাচ্ছেন তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের। ১৯৯৮ সালে নিউ ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচির আওতায় চীন হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। ওই চুক্তির আওতায় প্রতিবছর হার্ভার্ড ২০ জন করে চীনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে আমন্ত্রণ জানায় আমেরিকাতে। এ ক্ষেত্রে চীনের ইচ্ছামতোই ওই ২০ জনের জন্য কোর্স ঠিক করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। এরকমই একটি কোর্সে পড়তেন বো এর ছেলে। কোর্সের মধ্যে রয়েছে নেতৃত্ব, কৌশল এবং গণব্যবস্থাপনা। কখনও কখনও পৃথিবীখ্যাত অধ্যাপক রজার পর্টার এবং জোসেপ নিয়ের মতো শিক্ষকরা এখানে লেকচার দিয়ে থাকেন।
গত কয়েকবছরে চীন দেশীয় শিক্ষার মানোন্নয়নে যা যা করা প্রয়োজন সবই করছে। একই সঙ্গে সরকার দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহীদেরও সমানতালে উত্সাহ দিচ্ছে। দেশের বাইরে পড়াশোনা শেষ করে দেশের হাল ধরার জন্য তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে সরকার। ২০০৮ সালের শেষ দিকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বিদেশ থেকে তাদের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের দেশে ফিরিয়ে আনতে একটি কর্মসূচি চালু করে যার নাম ‘এক হাজার মেধাবী’। দেশে ফিরে আসলে কখনো কখনো তাদের এক লাখ ডলার পর্যন্ত অর্থ দেয়া হয়।
২০০৯ সালে উচ্চ শিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরেছে ১ লাখ ১৫ হাজার তরুণ। যা ২০০৭ সালের তুলনায় ৩ গুণ বেশি। প্রতিবছর হাইস্কুল, আন্ডারগ্রাজুয়েট, গ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি নিতে দুই লাখ ৪০ হাজারের মতো শিক্ষার্থী যায় দেশের বাইরে। তবে আমেরিকায় পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের দেশে ফেরার হার খুবই কম। ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী রয়ে গেছে আমেরিকায়।
